Inqilab Logo

শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ০১ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় নিরাপত্তার পূর্বশর্ত মানুষের চিন্তার নিরাপত্তা

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক | প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০২১, ৯:১৯ পিএম

জাতীয় নিরাপত্তা বলতে অনেক কিছুকেই বোঝায়। জাতীয় নিরাপত্তা মানে কোনোমতেই শুধুমাত্র যুদ্ধ করা বা না করার প্রসঙ্গ নয়। কয়েকটি উদাহরণ দিই। এক. সুন্দরবন থেকে দশ বা বিশ কিলোমিটার উত্তরে রামপাল নামক স্থানে, ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগে, বাংলাদেশের খরচে, কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কারণে, সুন্দরবনের কী ক্ষতি হতে পারে এবং সুন্দরবনের ক্ষতি হলে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হতে পারে, এটা জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক। দুই. পৃথিবীব্যাপী আলাপ-আলোচনা চলছে জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে বেশ কিছু ভূখন্ড ডুবে যাবে, ডুবে গেলে অনেক জনপদ ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এটাও জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার জেলার সমুদ্রসীমা থেকে পশ্চিম দিকে অল্প দূরত্বে ছোট্ট একটি দ্বীপ আছে, যেটির নাম সোনাদিয়া। সোনাদিয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর বা ইংরেজি পরিভাষায় ডিপ সি পোর্ট নির্মাণ করার আলোচনা অনেকদিন চলেছিল। পরে সেটি বাতিল হয়। চীন এই সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর বানানোর কাজে বাংলাদেশকে বিস্তৃতভাবে সাহায্য করতে প্রস্তাব দিয়েছিল। চীনের এই প্রস্তাব গ্রহণ করা বা না করা বাংলাদেশের এখতিয়ার ছিল এবং বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশর সরকার নিজের বুদ্ধিতে অথবা তাদের বন্ধুদের বুদ্ধিতে, চীনের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এই ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করা বা না করার উভয় প্রসঙ্গই জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক। তিন. মাত্র দুইটি দেশ বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়া যথা ভারত ও মিয়ানমার। ভারতের সঙ্গে যাবতীয় তৎপরতা অর্থাৎ ঘঁষা-মাজা, গলা-গলি, ওঠা-বসা, লেনদেন, লুকোচুরি খেলা ইত্যাদি চলছে, কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে বলতে গেলে কিছুই চলেনি। বাংলাদেশের সরকার, তৎপরতা চালালে বা তৎপরতা না চালালে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কী হতে পারে বা কী হতে পারে না, এই নিয়ে সচেতন থাকার বিষয়টিও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম আঙ্গিক। চার. বাংলাদেশের সীমান্ত যদি কেউ লংঘন করে বা বাংলাদেশের ভূখন্ডের সার্বভৌমত্ব যদি কেউ লংঘন করে, সেই লংঘনকারীকে কী রকম উত্তর দেওয়া উচিত ঐ আলোচনা বা সচেতনতা, জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক। পাঁচ. মুসলিম বিশ্বের অঘোষিত নেতা বা নেতৃস্থানীয় দেশ সৌদি আরব। সৌদি আরবের নেতৃত্বে অনেকগুলো দেশের একটি সামরিক জোট হয়েছিল এখন থেকে চার-পাঁচ বছর আগে। বলা হয়েছিল, এটা সন্ত্রাসবিরোধী জোট। বলা হয়েছিল, এটার সামরিক অধিনায়ক সৌদি আরব থেকে হবে না। বলা হয়েছিল, এই কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য জোটের সকল সদস্যই বাস্তব স্বশরীরে সামরিক অবদান রাখবে। এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে কি হবে না, এই সচেতনতা বা এই আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক। ছয়. প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ট্রানজিট ফ্যাসিলিটি চেয়েছিল এবং বাংলাদেশ সরকার সেটা অবলীলায় দিয়ে দিয়েছিল। এইরূপ ট্রানজিট দেওয়ার কাজটি ভালো কি মন্দ, এইরূপ ট্রানজিট দেওয়ার কাজটি বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তাগণের জন্য বা বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের জন্য বা বাংলাদেশের সামরিক প্রস্তুতির জন্য বা আঞ্চলিক সামরিক সংকটে বাংলাদেশের ভূমিকার জন্য উপকারী হবে না অপকারী হবে, এই সচেতনতা বা আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম আঙ্গিক। সাত. পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে, আলোচনা চালানো একটি অভিনন্দনযোগ্য কাজ। তবে আলোচনার পর বা আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে বা কতটুকু ছাড় দেওয়া হবে না বা কোন কোন বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে, এই সচেতনতা বা এই আলোচনা অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক। আট. আরও অনেক উদাহরণ প্রদানযোগ্য। নিবন্ধের কলেবর সীমিত রাখার নিমিত্তে, আর উদাহরণ না দিয়ে, আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাচ্ছি।

এই নিবন্ধের সচেতন জ্ঞানী-গুণী পাঠকের সমীপে আমার বিনীত নিবেদন, আপনারা মেহেরবানী করে উত্তর-পূর্ব ভারত, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ এবং এতদসংলগ্ন মিয়ানমার দেখা যায় এইরকম একটি মানচিত্র সামনে নিয়ে, আলোচ্য বিষয়গুলোকে নিয়ে চিন্তা করুন। আরাকান নামক প্রদেশকে রাখাইন প্রদেশ বানানো হয়েছে। আকিয়াব নামক বন্দর নগরীকে সিতুওয়ে বানানো হয়েছে। আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হচ্ছে। অতএব, আরাকানের পাহাড়ী ভূমিতে ও জঙ্গলে যদি বাংলাদেশের কোনো বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী বা ভারতের মনিপুর, নাগাল্যান্ড ইত্যাদির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আশ্রয় নিতে চায়, তাহলে তারা নিতেই পারে। ভারতের বিরুদ্ধে মিয়ানমার কাউকে আশ্রয় দিবে না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাউকে আশ্রয় দিতেও পারে। বিপরীত বক্তব্যটিও প্রণিধাযোগ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের আশ্রয়স্থল বা ক্যাম্প বানাতেও পারে। আমরা এই ধরনের সকল কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে। আমরা সচেতন থাকতে চাই। আরাকানের মাটির নিচে গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আছে এবং আরাকানের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের পানির নিচে গ্যাস ও তেল আছে। মিয়ানমার সরকার সেগুলো উত্তোলনের বন্দোবস্ত করছে। তাছাড়া আরাকানের সমুদ্রতটে চীনের ব্যবহারের জন্য এবং ভারতের ব্যবহারের জন্য বন্দর নির্মিত হচ্ছে। ওই সকল বন্দর থেকে তেল গ্যাস ও মালামাল চীন ও ভারতে যাওয়ার জন্য আলাদা পাইপ লাইন ও আলাদা সড়ক নির্মিত হচ্ছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে, মিয়ানমার সরকার চায় আরাকানে যেন কোনো অশান্ত পরিবেশ না থাকে। যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকানে থাকে এবং যদি কোনোদিন রোহিঙ্গারা সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয় তাহলে তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে সহায়তা পেতে পারে। এইরূপ সহায়তার ভবিষ্যৎ আশঙ্কা নির্মূল করার জন্য মিয়ানমার যাবতীয় বন্দোবস্ত গ্রহণ করছে। আমরা মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চাই না। মিয়ানমার তাদের জনগোষ্ঠীকে আমাদের দেশে পাঠিয়ে আমাদের বিপাকে ফেলেছে। মিয়ানমারকে এই কাজ করতে দেওয়া যায় না। আমরা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বাগতম জানিয়েছি এবং জানাতেই থাকবো। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা চিরদিনের জন্য বাংলাদেশে রাখতে পারবো না। জাতিসংঘ অথবা বহুজাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে ও সংশ্লিষ্টতায় মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করতে স্বসম্মানে ও নাগরিক অধিকারসহ। এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অতি প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সমস্যার যেই আঙ্গিকগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো হলো এক. রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আশ্রয় দেওয়া, দুই. মিয়ানমারের অমানবিক হিংস্র কর্মকান্ড তথা মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর প্রতিবাদ করা, তিন. নিজস্ব তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে, রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে স্বসম্মানে ফেরত পাঠানো, চার. বাংলাদেশের ক‚টনীতির অনানুষ্ঠানিক সমীক্ষা করা তথা ব্যর্থতার কারণগুলো অনুসন্ধান করা, পাঁচ. ভারত নামক বহুল-ঘোষিত বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের ভূ-কৌশলগত অবন্ধুপ্রতীম ক‚টনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করা, সাত. মিয়ানমার কর্তৃক বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সীমালংঘনের সমালোচনা করা ইত্যাদি। যেই আঙ্গিকগুলোর আলোচনা এখনও গতি পায়নি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বা জাতীয় নিরাপত্তার উপর, এই সমস্যার কী প্রভাব পড়তে পারে? অন্যভাবে বলতে গেলে, রোহিঙ্গা সমস্যার মানবিক দিক বাদ দিয়ে, সমস্যা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তার দিকটি প্রসঙ্গে আলোচনা।

আমাদের নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ভূখন্ডের প্রসঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা। পাঠকের সামনে যদি এমন কোনো মানচিত্র থাকে, যেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা-মিজোরাম-মনিপুর-নাগাল্যান্ড প্রদেশগুলো এবং মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে এই কলামের এই অংশের বক্তব্যটি বুঝতে সুবিধা হবে। রাখাইন প্রদেশের আগেকার নাম আরাকান। এই প্রদেশের ভূমি যেমন সমতল ও পার্বত্য এলাকার মিশ্রণ, তেমনই বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও একটু উপরে উল্লিখিত ভারতীয় প্রদেশগুলোর ভূমিও এইরূপ সমতল ও পার্বত্য এলাকার মিশ্রণ। প্রত্যেকটি এলাকায় তাদের দেশের সরকার বিরোধী কর্মকান্ড বিদ্যমান। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৪৭ সালে ভারতের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল; যেতে পারেনি। মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ (বর্তমান নাম রাখাইন প্রদেশ) ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল; থাকতে পারেনি। উত্তরপূর্ব ভারতের দক্ষিণাংশের প্রদেশগুলো ভারতের সঙ্গেই থাকতে চায়নি, স্বাধীনতা চেয়েছিল; সম্ভব হয়নি। এই পুরো অঞ্চলটি অশান্ত এবং উপদ্রুত ছিল এবং আংশিকভাবে এখনও আছে। ছোঁয়াচে রোগের মতো, এক এলাকার ঘটনাবলী অন্য এলাকার উপর প্রভাব বিস্তার করে। এখন থেকে প্রায় একশো বছর আগে বৃটিশ ভারতের শাসনকর্তাগণ এবং লন্ডনে অবস্থিত নীতি নির্ধারকগণ এই সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। আমি ইংরেজি ভাষায় লিখিত একটি পুস্তকের নাম লিখছি, ‘দি ফিউচার অফ ইন্ডিয়া’; ১৯৪৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত। লেখকের নাম স্যার রেজিনাল্ড কুপল্যান্ড। আরেকটি ইংরেজি ভাষায় লিখিত পুস্তকের নাম লিখছি, ‘দি নর্থ ইস্ট: রুটস অফ ইনসার্জেন্সি’; কলকাতা মহানগরী থেকে ‘ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক প্রকাশক কর্তৃক ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত; লেখকের নাম: প্রফুল্ল চৌধুরী। এই দুইটি বইয়ের মধ্যে একটি প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে আলোচনা আছে। প্রস্তাবনাটির নাম হলো ‘কুপল্যান্ড প্ল্যান’ বা ক্রাউন কলোনি প্ল্যান। ১৯৩০-এর দশকে আসাম প্রদেশের গভর্নর স্যার রবার্ট রিড এবং স্যার রেজিনাল্ড কুপল্যান্ড কর্তৃক যৌথভাবে একটি প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল। যথা: বৃটিশ কর্তৃক ভারত ত্যাগের সময়, ভারতকে ৪টি মূল অঞ্চলে ভাগ করা হোক। অঞ্চলগুলো নিম্নরূপ: (এক) সিন্ধু নদীর উপত্যকা বা দি ইনডাজ ভ্যালি, (দুই) গঙ্গা নদীর উপত্যকা বা দি গেইঞ্জেস ভ্যালি, (তিন) দক্ষিণাত্য বা দি ডেকান এবং (চার) উত্তর পূর্ব ভারত নামে পরিচিত পার্বত্য এলাকা। রেজিন্যাল্ড কুপল্যান্ড এবং স্যার রবার্ট রিড উভয়ের যৌথ মত ছিল এই যে, যেহেতু এই পার্বত্য এলাকাটি আদতেই ভারতের না এবং বার্মারও না, তাই তাদেরকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়ে লন্ডনের বৃটিশ ক্রাউনের অধীনে রাখা হোক; তার নাম হবে ক্রাউন কলোনি। এই ক্রাউন কলোনির দক্ষিণ অংশ হতো তৎকালীন আরাকান ও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তর অংশ হতো বর্তমানের ত্রিপুরা, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল। এই ক্রাউন কলোনির উত্তর সীমান্ত হতো তৎকালীন ভারত ও চীনের সীমান্তরেখা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমের সীমান্ত হতো বঙ্গোপসাগরের নীল পানি। যাহোক, যেকোনো কারণেই হোক রেজিনাল কুপল্যান্ড এবং রবার্ট রিডের পরিকল্পনা বা প্রস্তাবনা গুরুত্ব পায়নি। অতএব, বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। প্রস্তাবনা গুরুত্ব না পেলেও, এলাকার ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব কোনোমতেই কমেনি বরং দিনের দিন বেড়ে যাচ্ছে।

কোনোমতেই কোনো অবস্থাতেই, আত্মসন্তুষ্টি লাভের কিছুই নেই। গত চার-পাঁচ বছর আগের এবং তৎপরবর্তী বিভিন্ন সময়ের পত্রিকার সংবাদ এবং কলাম যদি কেউ পড়ে থাকেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই রাখাইন অঞ্চলে চীন ও ভারতের, আলাদা আলাদা, আর্থিক ও কৌশলগত বিনিয়োগ সম্বন্ধে অবগত হয়েছেন এবং অবগত হয়েই যাচ্ছেন। চীন এবং ভারত কোনো অবস্থাতেই এমন একটি রাখাইন প্রদেশ চাইবে না, যেই রাখাইন প্রদেশ তাদের বিনিয়োগের প্রতি ও তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি স্বরূপ। হুমকীবিহীন শান্তশিষ্ট রাখাইন চাইলে, রাখাইন প্রদেশকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীবিহীন করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীবিহীন করতে হলে তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে। যথা: এক. সকল রোহিঙ্গা মানুষকে মেরে ফেলতে হবে, অথবা দুই. তাদেরকে বিতাড়িত করে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং তিন. জীবিত সকল রোহিঙ্গা যে যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের মনের মধ্যে এমন ভয় ঢুকাতে হবে যে, তারা যেন ফেরত আসতে না চায় এবং চাইলেও ফেরত এসে যেন দেহ ও মনে বৌদ্ধ-মনা হয়ে যায়। একইসঙ্গে মিয়ানমার রাষ্ট্র তাদের রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন মানুষগুলোকে এবং অন্যান্য মানুষগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে, তাদের গ্রামগুলোকে দুর্গের মতো করে সাজাবে, তাদের রাস্তাঘাটগুলোকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের উপযোগী করবে এবং চীন ভারত ও মিয়ানমারের যৌথ হোক বা স্বতন্ত্র হোক, ভূ-কৌশলগত ও রণকৌশলগত ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে তুলবে। যত পরিবর্তনই হোক না কেন, পাহাড়ের জায়গায় পাহাড় থাকবে এবং জঙ্গলের জায়গায় জঙ্গল থাকবে। পাঠক, বর্তমান রাখাইন প্রদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করুন। রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশ জনশূন্য। সেখান থেকে রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে তাদেরকে ফেরত নেওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে চীন এবং ভারত উভয়েই বাংলাদেশ-বান্ধব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয়। অর্থাৎ এই দুইটি দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তদেশীয় সম্পর্কের সকল ক্ষেত্রে সম্পর্ক যেমনই হোক না কেন, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বা রাখাইন প্রশ্নে উভয় দেশের অবস্থান বাংলাদেশ-বান্ধব কোনোমতেই নয়। এই উদাহরণটি থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে বেশি শক্তিশালী কোনো দেশ যদি মনে করে, তারা স্বার্থের জন্য বাংলাদেশের একটি অংশের উপর দখলদারিত্ব বিস্তার করবে বা প্রাধান্য বিস্তার করবে, তাহলে সেই উদ্দেশ্যে চেষ্টা করতে তারা কোনো অবস্থাতেই কার্পণ্য করবে না।

বাংলাদেশের ভূখন্ডের উপর দিয়ে স্থলপথে বা পানিপথে ভারত নামক রাষ্ট্রের যেই অংশ বাংলাদেশের পশ্চিমে সেই অংশ থেকে, ভারত নামক রাষ্ট্রের যেই অংশ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত, এই উভয় অংশের মধ্যে মালামাল বা দ্রব্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করার জন্য একটি বন্দোবস্ত ভারত দীর্ঘদিন ধরেই চেয়ে আসছিল। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ভারতের যেই অংশটি, সেই অংশটি কার্যত একটি ল্যান্ডলকড ভূখন্ড। বহির্বিশ্ব থেকে মালামাল আমদানি-রপ্তানি করার জন্য তাদেরকে নির্ভর করতে হয় হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ভারতীয় বন্দরগুলোর উপর। এটা সময় সাপেক্ষ ও ব্যয় সাসেক্ষ। কিন্তু যদি চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করা যেত, তাহলে এই উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য মহা উপকারী হতো। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত নামক রাষ্ট্রটি তাঁদের এই আকাক্সক্ষাটি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর প্রচেষ্ঠা শুরু করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর, ভারত এই সমস্যায় সম্পূর্ণ সাফল্য পায়। বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার ভারতের জন্য ট্রানজিট এবং কানেকটিভিটি সহজ করেছে। বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্ত শহর রামগড় এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে সীমান্তশহর সাবরুম এর মধ্যে যেই আন্তর্জাতিক সীমানা, সেটি হলো ফেনী নদী। এখন থেকে কিছুদিন আগে সেই ফেনী নদীর উপরে দীর্ঘ সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। এই সেতুর উপর দিয়ে ভারতের মামাল চট্টগ্রাম মন্দরের উদ্দেশ্যে আসতে পারবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালামাল উত্তর-পূর্ব ভারতে যেতে পারবে। এমনকি দক্ষিণ ভারতের কোনো রাজ্য বা শহর থেকেও মালামাল সড়ক পথে বা রেলপথে যাতায়াত না করে, বরং দক্ষিণ ভারতের কোনো বন্দর থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠালে সেটা অনেক কম খরচে এবং অনেক কম সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে যেতে পারবে। অথবা, পায়রা বন্দর হয়ে বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের মেঘালয় বা আসাম প্রদেশে যেতে পারবে। এখানেই উল্লেখ করতে হবে যে, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার পর, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু লাভবান হলো, সেটার খতিয়ান স্বচ্ছভাবে সরকার করছে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যের জন্য কী সুবিধা পেল, এটার খতিয়ানও জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। এই অনুচ্ছেদের সর্বশেষ বক্তব্য, ট্রানজিটের সুবিধায় সর্বপ্রকার মালামাল চলতে পারবে যথা, গার্মেন্টস, খাদ্যসামগ্রী, ত্রাণসামগ্রী, খনিজসামগ্রী ইত্যাদি। সৈন্যসামন্ত বা গোলাবারুদ চলার উপর কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা শোনা যায়নি। যমুনা নদীর উপর যমুনা ব্রিজ এবং পদ্মা নদীর উপর পদ্মা ব্রিজ বাংলাদেশের জন্য যেমন দারুণ উপকার বয়ে আনবে, তেমনই প্রতিবেশী দেশ ভারত কর্তৃক ট্রানজিট সুবিধা উপভোগ করার ক্ষেত্রেও দারুণ উপকার প্রদান করবে। ফেনী নদীর উপর ব্রিজটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছলে-বলে-কৌশলে, সময় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদেরকে বহিষ্কার করা হবে বলে আশংকা বিশদভাবে ও বিস্তৃতভাবে বদ্ধমূল হয়েছিল। বিশেষত ওই বাঙালি যারা ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়ে ১৯৮২ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। একটু আগেই প্রসিদ্ধ বাংলা শব্দগুলো লিখেছি যথা ছল-বল-কৌশল। এইরূপ ছল-বল ও কৌশল অবলম্বন ও প্রয়োগ করছে বাংলাদেশ সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক এনজিও, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি অংশ। এইরূপ ছল-বল ও কৌশল প্রয়োগের অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি উদাহরণ হলো ভূমি বিরোধ নিষ্পন্ন কমিশন। বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার করার নতুন নতুন পন্থা বা ধান্ধা সন্ধান সবসময় করা হয়েছে। ১৯৮২-৮৩, ১৯৮৭-৮৮ বা ১৯৯২-৯৩ বা ১৯৯৬-৯৭ সালে শান্তিবাহিনী অবশ্যই সরকারের নিকট আবেদন করেছে, দাবি দিয়েছে বাঙালিদেরকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কিছু সরকার এবং এনজিও এই দাবি দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়া হয়েছে: না, প্রত্যাহার হবে না। কিন্তু ১৯৯৭ এর ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এমন একটি ছদ্মবেশী বন্দোবস্ত করা হয়েছে, যেন ক্রমান্বয়ে বাঙালিরা ফেরত আসতে বাধ্য হবে। শান্তি চুক্তির মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য দুইটি ভোটার তালিকার কথা তৎকালীন ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকার করে নিয়েছে। তৎকালীন ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকার করে নিয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রশাসনে ও নেতৃত্বে বাঙালিরা থাকবে না। বাঙালিরা এর প্রতিবাদ করেছে, আমরাও প্রতিবাদ করছি। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মাধ্যমে, মিষ্টি প্রলেপ দিয়ে তিতা ট্যাবলেট খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এখনও হচ্ছে। বৃহত্তর বাংলাদেশের জনগণ, বৃহত্তর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীগণ, পার্বত্য চট্টগ্রামে জান-প্রাণ ও রক্ত-ঘাম দিয়েছেন এমন ব্যক্তিগণ যেহেতু বিষয়টিতে মনোযোগ দেওয়ার সময় পান না সেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিগণ এতিমের মতো, লড়াই করে যাচ্ছেন; বেঁচে থাকার লড়াই।

যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা না থাকে তাহলে, কৌশলগতভাবে সেখানে বাংলাদেশ সরকারের বা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার বা বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিশদ ক্ষতি হতেই পারে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলো থেকে, বসতি স্থাপন করার জন্য অন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বা উপজাতীয় গোষ্ঠীর মানুষ যে আসবে না তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সিতে লিপ্ত গোষ্ঠী বা স¤প্রদায় বা সংগঠনগুলো যে প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাম্প বানাবে না বা আশ্রয় নেবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, সাবেক শান্তি বাহিনী বা তাদের নতুন কোনো রূপের বা নতুন কোনো আকারের সংগঠন যে নতুন করে তৎপরতা শুরু করবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, যেকোনো প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী চলাচলের সময় লজিস্টিক সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভীষণ শূন্যতার সৃষ্টি হবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে মিয়ানমারের আগ্রাসী ছদ্মবেশী সরকার যে সন্ত্রাসী তৎপরতায় উস্কানি দেবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭১ সালের শেষের দিকের মতো, ওই আমলের ভারতীয় মেজর জেনারেল এস এস উবানের মতো অন্য কোনো জেনারেলের নেতৃত্বে যে একটি গেরিলা সামরিক বাহিনী গঠিত হয়ে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার তৎপরতা সৃষ্টি করবে না বা নিদেনপক্ষে চট্টগ্রাম বন্দরকে অচল করার চেষ্টা করবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ১৯৭১ সালে উবানের কৌশলগত যুদ্ধ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, কিন্তু মাটিটা ছিল চট্টগ্রামের ও বাংলাদেশের। এখন মাটি চট্টগ্রামের ও বাংলাদেশের, বন্দর চট্টগ্রামের ও বাংলাদেশের কিন্তু নতুন উবান সাহেব বাংলাদেশের বন্ধু হবে তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি? বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীরা যে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পকে হুমকির সামনে রাখবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কাপ্তাই বাঁধের ষোলোটি পানি নিষ্কাষন গেইট যদি কোনো সময় একসঙ্গে ছেড়ে দেয়, তাহলে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে আট থেকে দশ মাইল ব্যাপী এলাকা প্লাবিত হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর সাময়িকভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এমনকি স্রোতের তোড়ে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। (দ্রষ্টব্য: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের শেষাংশে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে, বাংলাদেশি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা সম্বন্ধে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল উবানের নেতৃত্বাধীন ‘ফ্যানটম’ বাহিনীর তৎপরতা সম্বন্ধে যে সকল পাঠকের সম্যক ধারণা নেই, তাদের জন্য, এই অনুচ্ছেদের শেষাংশ বোঝা একটু কষ্টকর হতেই পারে। তার জন্য আমি দুঃখিত)।

রোহিঙ্গা (মুসলমান) বিহীন রাখাইন প্রদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকদূর অগ্রগতি হয়েছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হবে না। কিন্তু বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামীকাল সৃষ্টি হবে, আগামী মাসেই সৃষ্টি হবে বা আগামী বছরেই সৃষ্টি হবে, আমি এমনটি কোনোমতেই বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে, বুদ্ধিবৃত্তির জগতে, রাজনীতির জগতে, নিরাপত্তার জগতে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। আমরা অবশ্যই চাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিপূর্ণ থাকুক। আমরা অবশ্যই চাই, বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তি¡ক জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ ও গতিশীল জীবন-যাপন করুক। বাংলাদেশ যেমন আমার, তেমনই বাংলাদেশ সকলের। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তি¡ক গোষ্ঠীর আবাল-বৃদ্ধ মানুষের জন্মভূমি ও মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ। সুতরাং বাঙালি এবং পাহাড়ী সকলেই মিলেমিশে পাহাড়ে থাকবে, এটাই লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিয়ে আমি যত না উদ্বিগ্ন, তার থেকে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার নিরাপত্তা নিয়ে। বিবিধ অজুহাতে, উসিলায় এবং মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, আমাদের নৈতিকতাকে প্রায় শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে, আমাদের ধর্মীয় স¤প্রদায়গুলোর মধ্যে কিছু আক্রমণাত্মক গোষ্ঠীকে অনেক বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে, আমাদের অর্থনীতিতে ভিনদেশিদের অবস্থানকে অবাধে বহাল রাখা হয়েছে। বাংলাদেশি মানুষের মননে ও মগজে, ভারতবাদীতার যেই প্রবণতা, আমি সেটা নিয়ে শঙ্কিত। একুশ শতকে স্বশরীরে বা সরেজমিনে সামরিক অভিযান চালিয়ে একটি দেশ আরেকটি দেশকে বিব্রত করবে না, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। কয়েক বছর আগে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল একটি উদাহরণ। অতি সম্প্রতি আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে আজারবাইজানের একটি অঞ্চল নিয়ে যুদ্ধ আরেকটি উদাহরণ। অতএব, ভারত ও চীনের মধ্যে কোনো সংঘাত হলে বাংলাদেশের ভূখন্ডকে যে বিব্রত করা হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আবার বিব্রত করা হবেই হবে, এমন গ্যারন্টিও নেই। একটি দেশের বিরুদ্ধে সরেজমিনে অভিযানের বিকল্প হলো, মস্তিষ্ক দখলের অভিযান। একটি দেশের বুদ্ধিজীবীগণের মস্তিষ্ক, ছাত্র সমাজের মস্তিষ্ক, আলেম-ওলামা সমাজের মস্তিষ্ক, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাগণের মস্তিষ্ক, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাগণের মস্তিষ্ক যদি দখল করা যায়, তাহলে ভৌগোলিক অভিযানের প্রয়োজন পড়ে না। তাই, সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এটা বিশ্লেষণের দাবি রাখে যে, আমাদের মস্তিষ্কগুলো নিরাপদ আছে না কি দখল হয়ে গিয়েছে?
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মানুষের চিন্তার নিরাপত্তা
আরও পড়ুন