Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে

প্রকাশের সময় : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মোবায়েদুর রহমান : ঘন অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের মারাত্মক সুড়ঙ্গপথে নিক্ষিপ্ত হয়েছে জাতীয় সংহতি। জাতি হিসাবে ঐক্যের পরিবর্তে দেশের সব সেক্টরে বিভক্তি দেশকে দ্রুত রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। সমাজের বিবেকবান মানুষরা আজ গভীর উৎকণ্ঠার সাথে প্রশ্ন করছেন, জাতি হিসাবে কেন এই বিভক্তি? কেন সেই বিভক্তি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে? রাজনৈতিক বিভাজন থেকে শুরু হয়েছিল যে বিভক্তি সেই বিভক্তি আজ প্রোথিত হয়েছে খেলাধুলা, সংস্কৃতি এমন কি বিয়ের আসরেও। গত বুধবার সমাজের এ ভয়াবহ বিভক্তি দেখে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন দেশের বৃহত্তম দুটি দলের অন্যতম দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সামগ্রিক জাতীয় অগ্রগতি এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে তিনি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল এই বিভক্তির কথা বলেছেন বলে আজকের এই রাজনৈতিক ভাষ্যের অবতারণা নয়। বরং রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি অর্থনৈতিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও সুতীব্র বিভাজন দেখে চিন্তশীল মানুষের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এখন দাড়ি-টুপি এবং কল্বিদার পাঞ্জাবি পরা মানুষ দেখলেই একটি মহল তাৎক্ষণিকভাবে তকমা এঁটে দেন ইসলামী জঙ্গি বলে। মুসলিম জাহানের ঐক্যের কথা বললেই সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর তাৎক্ষণিকভাবে লেভেল এঁটে দেওয়া হয় সউদী-মার্কিন পাকিস্তানি দালাল বলে। ইসলামী রাজনীতির কথা বললে তাকে চিহ্নিত করা হয় রাজাকার আলবদর ও আল শামস হিসাবে। এছাড়া কোনো শিক্ষিত আধুনিক ব্যক্তি যদি সুস্থ রাজনীতির কথা বলেন, যদি বলেন ভারত নির্ভরতা কমাতে, যদি বলেন ভারতের সাথে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে রাজনীতি করার কথা, তাহলে তার পিঠে ছাপ মারা হয় ভারতবিরোধী ও মৌলবাদী হিসাবে। অবস্থা এমন ভয়াবহ পর্যায় গিয়েছে যে, এখন আর রাজনীতি নিরপেক্ষ সমাজ সচেতন মানুষও যুক্তিনির্ভর সুস্থ কথা বলতে সাহস পান না।
বিভাজন : আগে ও পরে
এই বিভাজন স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে এবং অব্যবহিত পরেও ছিল। তখন অবশ্য তার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বঞ্চনা নিরসনে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন প্রথমে স্বাধিকার এবং শেষ পর্যায়ে সশস্ত্র সংগ্রামে পর্যবসিত হয়। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন যখন প্রথম ৬ দফার মাধ্যমে সুস্পষ্ট অবয়ব গ্রহণ করে তখন থেকেই এই আন্দোলন বেগবান হয় এবং দ্রুত জনসমর্থন অর্জন করতে থাকে। পক্ষান্তরে যারা ৬ দফা সমর্থন করেনি তারা কোণঠাসা হতে থাকে। সেই সময় থেকেই ৬ দফা বিরোধীদের ইসলামাবাদের দালাল হিসাবে চিহ্নিত করা হতে থাকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র প্রতিনিধিত্বের ন্যায্য দাবিদার হয়ে পড়েন। এরপর যখন ২৫ শে মার্চ থেকে স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয় তখন পাকিস্তানের সমর্থকরা ইসলামাবাদের দালাল এবং স্বাধীনতার সমর্থকরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেন। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অপারেশন গ্রামে-গঞ্জে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং সারা দেশই তখন স্বাধীনতার পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির পাল্লা তখন অস্বাভাবিক ভারী ছিল।
জাতীয় ঐক্য ও শেখ মুজিব
’৭০ সালের নির্বাচন থেকেই শেখ মুজিব জাতীয় নেতা থেকে মহান নেতায় পরিণত হন। স্বাধীনতার পর কিছু মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সমর্থক কিছু রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নিধন করে। জাতির স্থপতি হিসাবে শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তানের সমর্থক বাংলাদেশীদের নির্মূল করার কাজ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে বিরাজমান বিভাজন দিনের পর দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। তাই তিনি একদিকে দালাল আইনে যারা দোষী প্রমাণিত হয়নি তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। একই সাথে তিনি জেনারেল অ্যামনেস্টি বা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। অন্যদিকে মুসলিম জাহানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে (ওআইসি) যোগদান করেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং ৯৩০০০ পাকিস্তানি সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মুক্তি দেওয়ার জন্য ভারতের সাথে ঐকমত্যে পৌঁছান। এছাড়া তিনি এমন একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন যেটি তার মতো বিশাল মাপের নেতার পক্ষেই নেওয়া সম্ভব ছিল। সেটা হলো তিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক ১৯৫ জন পাকসেনার বিচারের দাবি পরিত্যাগ করেন এবং তাদেরকে পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। তিনি পাক প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোর সাথে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন যার ফলে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশের পক্ষে ওআইসি সম্মেলনে যোগদান সম্ভব হয়।
শেখ মুজিবের উদারতা মুহূর্তে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়
শেখ মুজিবের এই দুইটি সিদ্ধান্ত মুহূর্তে সমগ্র রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং বিহারীদের মধ্যে যে প্রচ- ভয়, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল সেটি মুহূর্তে দূরীভূত হয়। দেশে সব মত ও পথের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে বসবাস শুরু করে। ফলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সূচনা হয় এবং সঙ্কীর্ণ বিভাজনের পরিধি হ্রাস পেতে থাকে। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শেখ মুজিব সূচিত জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া আরো এগিয়ে নেন। তিনি দালাল আইন বাতিল করেন। বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে অর্থাৎ ৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ইসলামপন্থী দলগুলো রাজনীতি করার অধিকার বঞ্চিত হয়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধানের এই অংশটি বিলুপ্ত করলে বাম ডান মধ্যপন্থী এবং ইসলামী ও কমিউনিস্টসহ সমস্ত রাজনৈতিক দল রাজনীতি করার অধিকার লাভ করে। পরবর্তীতে প্রায় ৩৫ বছর বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে স্বভাবসুলভ রাজনৈতিক পার্থক্য বিরাজ করলেও পারিবারিক সামাজিক ও গোষ্ঠিগতভাবে গভীর সম্প্রীতি বিরাজ করে। দেশে বেশ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং জনগণ ভয় ও ত্রাসের ঊর্ধ্বে উঠে ভোট দান করে এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন ঘটে।
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে সু-বাতাস বইতে শুরু করে তার প্রভাব সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে যায়। খেলোয়াড়দের মধ্যে দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এমন কি অনেক বিএনপি পরিবারের সাথে আওয়ামী পরিবারের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিয়ে হওয়ার মধুর ঘটনা এখনও অনেকের মুখে মুখে ছড়িয়ে বেড়ায়।
কিন্তু এখন একি অবস্থা?
দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আমার মনে আছে, ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র রাজনীতি ছিল তুঙ্গে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাত্র রাজনীতি জাতীয় রাজনীতিকে ডমিনেট এবং ডিক্টেট করত। তখন পূর্ব পাকিস্তানে যে ৪টি ছাত্র সংগঠন ছিল প্রধান সেগুলির নাম হলো, তৎকালীন মুসলিম লীগপন্থী জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন, মরহুম আবুল হাশিমের দর্শনে উদ্বুদ্ধ পাকিস্তান ছাত্র শক্তি, ন্যাপপন্থী অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়ন এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ যখন আমতলায় মিটিং করতো তখন অন্য সংগঠনের নেতারা ২০/২৫ হাত দূরে অবস্থিত মধুর ক্যান্টিনে চা সিঙ্গাড়া খেত। অনুরূপভাবে অন্য কোনো সংগঠন আমতলায় মিটিং করলে বাদ বাকি ছাত্র সংগঠনের নেতারা মধুর ক্যান্টিনে চা সিঙ্গাড়া খেত।
কোথায় গেল সেই সব দিন?
এখন এক সংগঠনের নেতাকর্মীরা রয়েছে অভঃবৎ ঃযব নষড়ড়ফ ড়ভ ড়ঃযবৎ ষবধফবৎং ধহফ ড়ৎমধহরুধঃরড়হং. অতীতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুম, অপহরণ, খুন, ক্রস ফায়ার এগুলো অকল্পনীয় ছিল। অথচ আজ এগুলি রাজনীতির কণ্ঠলগ্ন সহচর হয়ে গেছে। এছাড়া মিছিল মিটিং এ হামলা, হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেফতার, বছরের পর বছর ধরে নেতাকর্মীদের পলাতক জীবন যাপন এমন কি ঘরোয়া সভা সেমিনার ও মানববন্ধনও পন্ড করে দেওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন রাজনীতির এই ভাইরাস গ্রাম-গঞ্জেও সংক্রমিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি আওয়ামী লীগ, ভারতপন্থী বনাম ভারতবিরোধী, সেক্যুলার বনাম ইসলামপন্থী ইত্যাদি বিভাজন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে। এখন উকিলদের মধ্যে বিভাজন, ডাক্তারদের মধ্যে বিভাজন, দলিল লেখকদের মধ্যে বিভাজন, পেশাজীবীদের মধ্যে বিভাজন, দোকানদারদের মধ্যে বিভাজন, বাস মালিকদের মধ্যে বিভাজন, শ্রমিক, ছাত্র, সাংবাদিক, শিক্ষক, কার কথা বলব আর কার কথা বলব না, সর্বত্রই বিভাজন।
অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না
অথচ আমাদের সমাজ দেহে বিভাজনের এই বিষাক্ত ভাইরাস অনুপ্রবেশ করার কথা ছিল না। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ৫০ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৫০। আজ যার বয়স ৫০, তিনি স্বাধীনতার সময় ছিলেন মাত্র ৭ বছর বয়সী। আজ যার বয়স ৪৪, স্বাধীনতার উষালগ্নে তার জন্মই হয়নি। অথচ আজ ঢালাওভাবে সমাজের একটি অংশকে মৌলবাদী, রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী, আল-বদর, রাষ্ট্রদ্রোহী ইত্যাদি কত কিনা বলা হচ্ছে। আজ ১৫ থেকে ৪৪ পর্যন্ত যাদের বয়স তাদের সংখ্যা ৭ থেকে ৮ কোটি। স্বাধীনতার সময় তারা এই পৃথিবীর আলো হাওয়াই দেখেনি। তারা কীভাবে রাজাকার আলবদর বা স্বাধীনতা বিরোধী হয়?
কিন্তু তারপরও তার জন্য জোরেশোরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আমরা জানি না এভাবে একটি জাতির অর্ধাংশকে ভিত্তিহীন অপবাদে কলঙ্কিত করার কাফ্ফারা কীভাবে আমাদেরকে দিতে হবে? কবে দিতে হবে?



 

Show all comments
  • Rasel ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১:১৪ পিএম says : 0
    Ata e amader boro problem
    Total Reply(0) Reply
  • মানিক ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১:৩২ পিএম says : 0
    সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই বিষাক্ত ভাইরাস দূর করতে হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন