Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৬ বৈশাখ ১৪২৮, ০৬ রমজান ১৪৪২ হিজরী

করোনার ধাক্কা মেগাপ্রকল্পে

এক সপ্তাহে মেট্রোরেলের ৪৮ জন আক্রান্ত : উদ্বেগ জানিয়ে জাইকার চিঠি

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৯ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০৫ এএম

করোনার ধাক্কা লেগেছে সরকারের মেগাপ্রকল্পে। এ ধাক্কায় আবার থমকে যেতে পারে মেগাপ্রকল্পের গতি। গত বছর করোনার প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে সবেমাত্র মেগা প্রকল্পগুলোতে গতি ফিরেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দেয়া অনেকটাই কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক প্রকল্পই এ ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গত এক সপ্তাহে মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৪৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অন্যান্য প্রকল্পে কর্মরতদেরও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। করোনার ধাক্কা সামলাতে ইতোমধ্যে ‘সাইট লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে। এদিকে, করোনা সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় দাতা সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স¤প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সচিবকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছেন জাইকার আবাসিক প্রতিনিধি হাইকায়া ইউহো। পাশাপাশি আরও ৯ জন সিনিয়র সচিব/সচিব ও তিনটি সংস্থার প্রধানকে চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে জাইকার আবাসিক প্রতিনিধি হাইকায়া ইউহো বলেন, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোয় নিয়োজিত জনবলের মধ্যে দ্রæত করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমি এ চিঠিতে অনুরোধ করছি। আলাপকালে মেগা প্রকল্পের কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, করোনার কারণে গতবছরের শুরুতে দেওয়া লকডাউনে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজের গতি কমেছিল। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। এখনও পর্যন্ত কাজ চলছে। পরিস্থিতির যেভাবে অবনতি হচ্ছে তাতে আগামীতে কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্রে জানা গেছে, গতবছরের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফাস্ট ট্র্যাক মনিটরিং টাস্কফোর্সের সভায় প্রকল্পগুলোর কাজের গতি স্বাভাবিক রাখার যে নির্দেশনা ছিল তা এখনও বহাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এসব প্রকল্প মনিটরিং করছেন। সরকার চায় প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হোক।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে- পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত সিংগেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এবং বিআরটি প্রকল্প।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক গতকাল বৃহস্পতিবার অনলাইন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত এক সপ্তাহে মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৪৮ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মোট ৫১৮ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এমএএন সিদ্দিক বলেন, করোনা সংক্রমণ বাড়লেও প্রকল্পের কাজ সকাল ও বিকাল, দুটি শিফটে ‘পুরোদমে’ চলছে। চলতি বছর ডিসেম্বরে প্রকল্পটি চালু করার লক্ষ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, সবকিছুই এখন নির্ভর করছে দেশের ও বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির ওপর।

অন্যদিকে, দেশে আশঙ্কাজনক হারে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে চিঠি দিয়েছে জাইকা। জানা গেছে, বর্তমানে জাইকার অর্থায়নে দেশে বেশকিছু মেগাপ্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় তিনটি মেট্রোরেল নির্মাণ, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, ওয়েস্টার্ন ব্রিজ ই¤প্রুভমেন্ট প্রকল্প, ফুড ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্প, আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্নেন্স প্রকল্প প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। জাইকার চিঠিতে বলা হয়, গত বছর লকডাউন ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়া বেশিরভাগ বিদেশি বিশেষজ্ঞ বর্তমানে ফিরে এসেছেন। এতে বিভিন্ন প্রকল্পে গতি ফিরে এসেছে অথবা পূর্ণগতিতে বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। এটি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক অবস্থা। তবে গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে কর্মরত জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মী, পরামর্শক ও ঠিকাদারদের জনবল আশঙ্কাজনক হারে করোনাক্রান্ত হচ্ছেন। শুধু এক সপ্তাহে প্রায় ১০০ করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির এ হার উদ্বেগজনক।

হাইকায়া ইউহো চিঠিতে বলেন, এ অবস্থায় আমরা পুনরায় জোর দিয়ে বলতে চাই, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোয় স্থানীয় ও বিদেশি কর্মীসহ সব শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। এজন্য সব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে মনে করিয়ে দিতে চাই, প্রকল্প এলাকায় করোনা ছড়িয়ে পরা রোধে ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা দরকার। পাশাপাশি আমরা প্রত্যাশা করছি, সব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঠিকাদারদের সঙ্গে করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাতে হাত রেখে কাজ করবে। এক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যয়িত অতিরিক্ত অর্থ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত সংরক্ষিত তহবিল থেকে নির্বাহ করা হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা সব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোকে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে চাই বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা হোক।

দেশে মেগা প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্মা সেতু প্রকল্প। ইতোমধ্যে করেনোর ধাক্কা এড়াতে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা লকডাউন করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে গত সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে এ লকডাউন। কর্মরত শ্রমিক কিংবা প্রকৌশলী কারোরই প্রকল্প এলাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। বাইরে থেকেও কেউ ভেতরে যেতে পারছেন না। যারা নতুন করে কাজে যোগ দেবেন, তাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকার পর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হতে হবে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় এখন থেকে এভাবেই সেতুর কাজ চালানোর কথা জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের ডিসেম্বরে। এখন চলছে স্প্যানের ওপর সড়ক আর ভেতরে রেলপথ নির্মাণকাজ। কম-বেশি আড়াই হাজার শ্রমিক-প্রকৌশলী বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় কর্মরত রয়েছেন। তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রকল্প এলাকায় আরোপ করা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের বলেন, সংক্রমণ এড়াতে পুরো প্রকল্প এলাকা দু-তিনদিন আগে লকডাউন করে দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর প্রকল্প এলাকার নিরাপত্তায় শুরু থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়োজিত। স¤প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর চীনের উহানে। গত বছর এ শহরেই প্রথম বিস্তার লাভ করে করোনাভাইরাস। এ কারণে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর আগেই তার বিরূপ প্রভাব পড়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে। চীনে ছুটি কাটাতে গিয়ে আটকা পড়েন অনেক শ্রমিক-প্রকৌশলী। আর দেশে ভাইরাসটির প্রকোপ শুরুর পর শ্রমিক ও নির্মাণ উপকরণের অপ্রতুলতার কারণে কাজের গতি কমে যায়। তবে এবার এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব নির্মাণকাজে পড়েনি বলে দাবি করছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রথমে চীনে পরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই আমরা সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করেছি। এ কারণে গত বছরের মার্চের পর থেকে সেতুর নির্মাণকাজের গতি কিছুটা কমে এলেও তা একদিনের জন্যও বন্ধ ছিল না। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে এখন পর্যন্ত আমাদের কাজে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, আমরা আশা করছি সময়মতোই সেতুর কাজ শেষ করতে পারব। এদিকে, গতবছরের করোনার সময় পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের কাজ কিছুটা বাধার মুখে পড়লেও এবার বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ফখরুদ্দিন এ চৌধুরী। তিনি বলেন, পুরো প্রকল্প এলাকা স্বাস্থ্যবিধির আওতায় এসেছে। এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। ২০২৪ সালের জুনে শেষ হবে বলে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: করোনা


আরও
আরও পড়ুন