Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ০৪ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ০৫ শাওয়াল ১৪৪২ হিজরী

অর্থনীতি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ২১ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০১ এএম

১৯৭১ সালে যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ হিসেবে আমাদের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর অবস্থা ছিল নাজুক। ১৯৭২-৭৩ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৭৫ ভাগ (১৯৭২-৭৩)। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.০৮ শতাংশ। ক্রমান্নয়ে বিভিন্ন পট পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে অর্থনীতি আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি কৃষির পাশাপাশি শিল্প ও সেবাখাত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষি এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রমান্নয়ে অগ্রগতি লাভ করছে। স্বাধীনতার পর সমাজতন্ত্রের চাপ ছিল, যেখানে ব্যক্তিখাতের অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আশির দশকের মাঝ থেকে পরবর্তী সময় ব্যক্তি উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতি নজর দেয়া হয়। ফলে ১৯৮৫ সালে সার্বিক বিনিয়োগের ৩৭ শতাংশের মধ্যে ব্যক্তি খাতের অবদান ছিল ৮০ শতাংশ। তবে আমাদের আশে পাশের দেশগুলোর তুলনায় আমাদের প্রবৃদ্ধি ক্রমান্নয়ে ঊর্ধ্বমুখী বলা যায়। ১৯৮০ থেতে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আমাদের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.০৮ শতাংশ। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালে এটা বেড়েছে ৫.০৯ শতাংশ। ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সময় কালে বেড়েছে ৬.০২ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বেড়েছে ৭.০৪ শতাংশ। এশিয়ার ১২ টি দেশের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায়, আমাদের গড় প্রবৃদ্ধির হার ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ আমাদের প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি সন্তোষজনক।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্জনের মধ্যে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ বর্তমানে অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। ১৯৭৪ সাল থেকে যেখানে আমাদের রিজার্ভ ছিল মাত্র ৪২.৫ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২১ সালে ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভের পরিমান ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী যে জনসংখ্যা ছিল ৫০ বছরে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তখন আমাদের কৃষি ও খাদ্যশস্য উৎপাদন সন্তোষজনক ছিল না। বর্তমানে ব্যাপক জনসংখ্যার মঝেও আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদন অভাবনীয় উন্নতি লক্ষ করা যায়। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। বর্তমানে চলমান করোনা মহামারির সময় আমাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে কৃষি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লক্ষ টন। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আমাদের ধান উৎপাদন হয় ৫ কোটি ২৬ লক্ষ টন, যা বিশে^র ৪র্থ সর্বোচ্চ। আমাদের ব্যাপক জনসংখ্যার জন্য সারা বছর আলুর অভ্যন্তরীন চাহিদা ৭০ লাখ টন। সেখানে ২০১৯ সালে উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৫ লাখ টন আলু। বিশে^ আলু উৎপাদনে আমরা ৬ষ্ঠ। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশে^র তৃতীয়। ইলিশ মাছ উৎপদনেও বাংলাদেশ বিশে^র প্রথম। বিশে^র উৎপাদিত মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ বাংলাদেশ উৎপাদিত হচ্ছে যা ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশে^র তৃতীয়। বছরে সবজি উৎপাদিত হয় ১ কোটি ৬০ লাখ টন। হাঁস-মুরগি উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পন্ন। গরু, ছাগল পালন ও ফল উৎপাদনেও আমাদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এফএও’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাগলের গোশত ও দুধ উৎপদানের বাংলাদেশ ক্রমাগত ভালো করছে। বিশেষ করে ছাগলের দুধ উৎপাদন বাংলাদেশ বিশে^ দ্বিতীয়। ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ। এছাড়া আম ও পেয়ারা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ ৮ম অবস্থানে আছে। বছরে আম উৎপাদন হয় ২৪ লাখ টন। পেয়ারা উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৪৭ হাজার টন। আম ও পেয়ারা উৎপাদন প্রতিবেশি দেশ ভারত প্রথম অবস্থানে আছে। দেখা যায়, ৫০ বছরে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে আমাদের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এ সময় আমাদের রপ্তানি খাতেও অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিলো ৫ শতাংশের নিচে। ২০১৭ সালে তা ১৫% এ দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে রপ্তানি কিছুটা ধাক্কা খেলেও অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। ৫০ বছরের ব্যবধানে মুদ্রাস্থীতি ৫.৫ ভাগ, ৮৬ টাকা ডলার প্রতি মূল্য এবং রপ্তানি আয় যেমন বেড়েছে তেমনি আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী রপ্তানি খাত ছিল ২-৩টি পণ্যের উপর নির্ভশীল। বিশেষ করে পাট পাটজাত দ্রব্য, চা ও চামড়া জাতপন্য রপ্তানি হতো। এখন রপ্তানিতে স্থান করে নিয়েছে তৈরি পোশাক খাত, জনশক্তি ও ঔষধ শিল্প। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ বিশে^ দ্বিতীয়। গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ হাজার ৭ শত ৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশে^র মোট পোশাক রপ্তানির ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে চীন প্রথম স্থান দখল করে আছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ১১৮টির দেশে ঔষধ রপ্তানি করছে। ৫০ বছরে আমাদর শিক্ষার হার বেড়েছে, সাক্ষরতার হার বেড়েছে। ২০০৬ সালে গড় আয়ু কাল যেখানে ছিল ৬৪.৪। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় ৭২.৪ (বিবিএস রিপোর্ট)। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২০.৫ এ কমে এলেও করোনার কারণে তা বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়শীল দেশে উত্তরনের যোগ্যতা অর্জন করেছে। গত ২৬ ফেব্রæয়ারি ২০২১ জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশকে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরনের জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করেছে। মাথা পিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এই তিন সূচকের মানদন্ডে জাতিসংঘ একটি দেশের উন্নয়শীল দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকে। বাংলাদেশ উক্ত তিন সূচকেই কাক্সিক্ষত যোগ্যতা অর্জন করেছে। এখন সব কিছু ভালোভাবে চললে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের গ্রæপ থেকে বেরিয়ে আসবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর মাইলফলকে আমাদের অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করলেও এতে তুষ্টির অবকাশ নেই। এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের দীর্ঘ পথ চলা আশানুরূপ না হলেও সন্তোষজনক ছিল। তবে সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি। এগুলো আলোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন। ঠিক কোন কারণে আমরা আমাদের সম্পদের ব্যবহার সঠিকভাবে করতে পারিনি, দেশকে দ্রæত এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে পারিনি। এর মধ্যে বর্তমানে ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এখাতের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, ঋণ আদায়ের হার হ্রাস ও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
দ্রæত সংকট উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত হাতে, ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও এ সমস্যার সমাধান না করলে আগামীদিনের বাংলাদেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাবে তা ভেবে দেখতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অনেক দুর্বলতা রয়েছে। কাক্সিক্ষত মানের ও আশানুরোপভাবে আমরা এখাতের উন্নয়ন ঘটাতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও ঢেলে সাজাতে পারিনি। বর্তমানে চলমান করোনা মাহামারিতে ক্ষতিগ্রস্থ অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারকে প্রণোদনা প্যাকেজ বাড়ানো ও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা উচিত। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠি নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। তাছাড়া করোনার আগে যারা দরিদ্র ছিল ও করোনার কারণে আরো দরিদ্র হয়েছে তাদের জন্য সরকারের যে সমাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও কার্যক্রম আছে তার ব্যপ্তি, পরিধি ও বরাদ্ধ বাড়ানো উচিত।

গত ৫০ বছরে নানা ধরনের পরির্বতনের মধ্যে গেছে বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা, অবকাঠামোর অভাব ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ার পর ও বাংলাদেশের জনগণের টিকে থাকার সক্ষমতা দেশটিকে সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে তার মাঝে যেসব দুর্বলতা যেমন বেকারত্ব বৃদ্ধি, হাতে গনা রপ্তানিরপণ্য, পোশাক শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা, কৃষিকে আধুনিকীকরণের ঘাটতি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এক্ষেত্রে মধ্যসত্ত¡ভাগীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধিসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্রের অবনতি ও সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবের মতো সমস্যাসমূহ দূর করার জন্য কার্যকর প্রদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অর্থনীতি


আরও
আরও পড়ুন