Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

নতুন রাজা-রানী

প্রকাশের সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইমরান মাহমুদ

ঐ নতুনের কেতন ওড়ে। নিউ ইয়র্কের ফ্ল্যাশিং মিডোসে এবার যেন তাই ঘটল। পুরনোকে বিদায় দিয়ে উড়ল নতুন ঝা-া। নতুন রাজা-রানীর দেখা পেল বছরের শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম ইউএস ওপেন। তাও আবার একেবারে আনকোড়া দুজনের হাতে!
গত বছর ইউএস ওপেনের আগে হতাশায় ভুগতে থাকা কারবার দেখা করেন স্টেফির সঙ্গে। অনুশীলনও করেন তার ‘আদর্শের’ সঙ্গে। এরপরই যেন ভোজবাজির মতো সব পাল্টে গেল। গত বছরও আলোচনার বাইরে থাকা এক খেলোয়াড় বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতলেন। বছর শেষে ইউএস ওপেনও।
২০ বছর আগে সর্বশেষ জার্মান হিসেবে ইউএস ওপেন জিতেছিলেন স্টেফি গ্রাফ। এবার দেখল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ক্যারোলিন প্লিসকোভাকে ৬-৩, ৪-৬, ৬-৪ গেমে হারিয়ে দ্বিতীয় জার্মান হিসেবে কারবার জিতলেন ইউএস ওপেন। প্লিসকোভার আগে ইউএস ওপেনে মেয়েদের এককে ফাইনালে ওঠা সর্বশেষ চেক খেলোয়াড় ছিলেন হেলেনা সুকোভা। ২৩ বছর আগের ওই ফাইনালের মতোই চেক প্রজাতন্ত্রের খেলোয়াড়কে দর্শক বানিয়ে জিতলেন জার্মান প্রতিযোগী। ফাইনালে ওঠার পরই কারবার নিশ্চিত করেছেন মেয়েদের এককের শীর্ষ স্থানটা সেরেনা উইলিয়ামসের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছেন। ফলে র‌্যাঙ্কিং-শ্রেষ্ঠত্বের রাজত্বটা ১৮৬ সপ্তাহেই থেমে গেছে সেরেনার। আর এক সপ্তাহ শীর্ষে থাকলেই গ্রাফকে পেরিয়ে রেকর্ডটি নিজের করে নিতেন আমেরিকান তারকা। কারবারের এ কথাটি তাই না বললেও চলত, ‘এক বছরে দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের অনুভূতি অসাধারণ। আমার ক্যারিয়ারের সেরা বছর।’ তবে গ্রাফের মতো কিংবদন্তির সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে কারবার চান নিজের আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে, ‘আমার পক্ষে স্টেফি হওয়া সম্ভব নয়। আমার জন্য ভালো হচ্ছে নিজের তৈরি করা পথে হাঁটা।’
কারবার ফাইনালে নেমেছিলেন একটি সুখবর নিয়ে। সেমিফাইনালে সেরেনার বিদায়ের পরই র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত হয়ে গেছে। মেয়েদের টেনিসে মনিকা সেলেসের (১৯৯৬) পর তিনিই বাঁ-হাতি খেলোয়াড় হিসেবে উঠলেন র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। তবে ফাইনালে হেরে গেলে সে আনন্দটা একটু তেতো ঠেকত কারবারের কাছে। তা অবশ্য হতে দেননি, প্লিসকোভাকে হারিয়ে আনন্দটা উপভোগ করছেন কানায় কানায়, ‘বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড় হওয়া এবং গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা, ছোটবেলা থেকেই এ স্বপ্ন দেখেছি।’
তিন বছর বয়সেই প্রথম র‌্যাকেট ওঠে তার হাতে। তারপর একটু একটু করে স্বপ্নটাকে তাড়া করা। তবে সেটি পূরণ হতে একটু দেরি হলো এই যা, ২৮ বছর বয়সটা যে মেয়েদের টেনিসে প্রথম শিরোপা জেতার জন্য একটু বেশিই। গত বছরই ইউএস ওপেনজয়ী ফ্লাভিয়া পেনেত্তা সবচেয়ে বেশি বয়সে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতার রেকর্ড করেই অবসর নিয়েছেন!
ইউএস ওপেন জয়ের পর পাল্লা ভারী ছিল তার দিকে। তা যতই ক্যারোলিনা পিলিস্কোভা হারিয়ে আসুন না কেন সেরেনা উইলিয়ামসকে। শেষ পর্যন্ত ইউএস ওপেনের জয়ের হাসি থাকল অ্যাঞ্জেলিক কারবারের ঠোঁটেই। সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছিলেন তাকে তো কিছুটা বাড়তি সম্মান জানানোই উচিত।
একই বছরে দুটো গ্র্যান্ড স্ল্যাম, সঙ্গে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান। ফাইনালের পর ট্রফি আর ৩৫ লাখ ডলার প্রাইজমানির চেক হাতে নিয়ে কারবার ছিলেন দারুণ উচ্ছ্বসিত। একদিন বাদেই আনুষ্ঠানিকভাবে যখন র‌্যাঙ্কিং প্রকাশিত হলো, তিনি গড়লেন সবচেয়ে বেশি বয়সে প্রথমবার এক নম্বর হওয়ার কীর্তিও! কারবারের তো আসলেই সুসময় চলছে। দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা জেতার পর জার্মান তারকা ‘ক্যারিয়ারের সেরা বছর’ ঘোষণা করলেন ২০১৬-কে। তা বলবেনই না বা কেন। এই বছরটা যে দুহাত ভরে দিয়েছে তাকে। বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন থেকে জেতেন প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা। উঠেছিলেন আবার উইম্বলডনের ফাইনালে, সেখানে সেরেনা উইলিয়ামসের কাছে শিরোপা হারালেও ভুল করেননি ইউএস ওপেনে। এক বছরে তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল ও দুটি শিরোপা জেতার পর তাই কারবারের ঘোষণা, ‘এক বছরে দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়। আমার ক্যারিয়ারের সেরা বছর।’
শুরুতে, শেষেও! অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর বছর শেষের ইউএস ওপেনও কারবার-ই দেখালেন কারবার!
এদিকে, ছেলেদের এককেও নিউ ইয়র্ক পেয়েছে নতুন রাজা। রাজ্যাভিষেক হয়েছে আরেক নতুনের। তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে উঠে তিনটিতেই শিরোপা। গত ৪৬ বছরে এত বয়সে কেউ ইউএস ওপেনের পুরুষ এককে চ্যাম্পিয়ন হয়নি। ৩০ পেরিয়েই ইউএস ওপেন জেতার কীর্তি নিকট অতীতে কেবল একজনেরই আছে। সেটিও ১৪ বছর আগে জিতেছিলেন পিট সাম্প্রাস। শুধু তো বয়স বা অতীত রেকর্ড নয়, স্তানিলাস ভাভরিঙ্কার আসল প্রতিপক্ষ ছিলেন নোভাক জোকোভিচ। এই সময়ে টেনিসে যার যাত্রা একরকম অপ্রতিরোধ্য। সব কিছুই জয় করলেন। চার ঘণ্টার স্নায়ুক্ষরা লড়াইয়ে ভাভরিঙ্কা জিতেছেন ৬-৭ (১/৭), ৬-৪, ৭-৫, ৬-৩ গেমে। ৩১ বছর বয়সে জিতলেন নিজের প্রথম ইউএস ওপেন। গত তিন বছরে তিনটি ফাইনালে উঠে তিনবারই শিরোপা জিতলেন এই সুইস। এর আগে অস্ট্রেলিয়ান ও ফরাসি ওপেন জিতেছিলেন ৩১ বছর বয়সী এই খেলোয়াড়। ১৯৭০ সালে ৩৫ বছর বয়সে এই ট্রফি জিতেছিলেন কেন রোজওয়াল। এরপর ভাভরিঙ্কাই সবচেয়ে বেশি বয়সে জিতলেন।
ফাইনালে উঠলেই যেন শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলছেন ভাভরিঙ্কা। সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে টানা ১১টি ফাইনাল জিতলেন তিনি। পাশাপাশি ‘জোকার’ জোকোভিচের তাই বছরের তৃতীয় আর ক্যারিয়ারের ১৩তম একক জেতা হলো না। জোকোভিচের বিপক্ষে খেলা মানে শুধু নৈপুণ্য নয়, শারীরিক সক্ষমতারও চূড়ান্ত পরীক্ষা। ভাভরিঙ্কা জিতলেন সবই। উল্টো জোকোভিচকেই দুবার মেডিকেল টাইমআউট নিতে হয়েছে চতুর্থ সেটে, যেটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ভাভরিঙ্কার শরীরের ওপর দিয়েও কম ধকল যায়নি। ম্যাচ শেষে ২০১৪ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও গত বছর ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতা এই ‘বুড়ো’ তারকা বলেছিলেন, ‘বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড়টির বিপক্ষে জিততে হলে আপনাকে সবটুকু দিয়েই জিততে হবে। কষ্ট আপনাকে সইতে হবে, কষ্টটাকে উপভোগ করতে হবে। কারণ, এই গ্র্যান্ড স্ল্যামই আমার খেলা শারীরিক ও মানসিকভাবে সবচেয়ে কষ্টকর টুর্নামেন্ট।’
বছর দুয়েক আগে ভাভরিঙ্কা যখন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছিলেন, সেটিকে ‘ফ্লুক’ মনে করেছিলেন অনেকেই। ২৯ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের পর সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটু দেরিতে হলেও এরপর ভাভরিঙ্কা সৌরভ ছড়িয়েই যাচ্ছেন। গত বছর ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছেন, নিউ ইয়র্ক থেকে জিতলেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম। সেই আনন্দ আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছে জোকারকে হারিয়ে মুকুট মাথায় তোলায়। রয় এমারসনকে ছাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল জোকোভিচের সামনে। ভাভরিঙ্কার সঙ্গে জিতলেই ক্যারিয়ারের ১৩তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম হাতে উঠত এই সার্বের। তাহলে সামনে থাকতেন শুধু পিট সাম্প্রাস, রাফায়েল নাদাল ও রজার ফেদেরার।
মুখোমুখি লড়াইয়ে জোকোভিচ অনেক এগিয়ে থাকতে পারেন, তবে গ্র্যান্ড স্ল্যামের সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে অন্য কথা। গত বছর জোকোভিচকে হারিয়েই ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছিলেন ভাভরিঙ্কা। জোকোভিচের ক্যারিয়ার স্ল্যামও তখন হয়নি ওই ফাইনালের হারে। এর আগে গ্র্যান্ড স্ল্যামে দুজনের চারটি ম্যাচই নিষ্পত্তি হয়েছে পঞ্চম সেটে। এর মধ্যে ভাভরিঙ্কা অবশ্য একবারই জিতেছেন। ২০১৪ সালে নিজের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের পথে জোকোভিচকে হারিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে। এ বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছেন। উইম্বলডনে তৃতীয় রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার দুঃখটা ইউএস ওপেনের ফাইনালে হেরে বাড়ল দ্বিগুণ হয়ে।
এক নজরে নতুন রাজা-রানী
অ্যাঞ্জেলিক কারবার নাম স্টানিলাস ভাভরিঙ্কা
জার্মানি দেশ সুইজারল্যান্ড
১৮ জানু, ১৯৮৮ জন্ম ২৮ মার্চ ১৯৮৫
ব্রিমেন জন্মন্থান ল’সান
১ নম্বর র‌্যাঙ্কিং ৩ নম্বর
২৮ বছর বয়স ৩১ বছর
৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা ৬ ফুট
২০০৩ অভিষেক ২০০২
বাঁ-হাতি ধরন ডান হাতি
টরবেন বেল্টজ কোচ রিচার্ড ক্র্যাজিসেক
২১টি শিরোপা ১৫টি
২টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ৩টি
২০১৬ (একক, রৌপ্য) অলিম্পিক ২০০৮ (দ্বৈত, স্বর্ণ)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।