Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ০৩ আষাঢ় ১৪২৮, ০৫ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

জীবন বাঁচানোই বেশি দরকার

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ৮ মে, ২০২১, ১২:০২ এএম

করোনায় অনুন্নত, উন্নয়নশীল এমনকি উন্নত দেশের অর্থনীতিও বিপর্যন্ত অবস্থায় আছে। এর মধ্যে কোনো কোনো দেশে করোনার দ্বিতীয় কোথাও তৃতীয় ঢেউ চলছে। মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন বড় চ্যলেঞ্জ। কারণ, এ প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষার কোনো ঔষধ আজও আবিষ্কার হয়নি। প্রতিষেধক হিসেবে যেসব টিকার ব্যবহার চলছে তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া টিকা প্রাপ্তিতেও সমস্যা-সংকট দেখা যাচ্ছে। করোনার সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময় আমরা বসবাস করছি। গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিল তখনও বৈশি^ক নানা প্রতিকূলতার মুখে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছিল। ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটটি ছিল দেশের ৪৯তম বাজেট, আওয়ামী লীগ সরকারের ২১তম বাজেট। বাজেটের শিরোনাম ছিল অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যত পথ পরিক্রমা। গত আগস্ট মাসের দিকে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এতে আমাদের কৃষি, রেমিট্যান্স ও সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ভূমিকা পালন করলেও এ বছর মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। জীবন ও জীবিকা নিয়ে সবাই শংকার মধ্যে আছে। চলছে সরকার ঘোষিত লকডাউন। এরই মধ্যে আগামী জুনে আসছে নতুন বাজেট। বাজেটের খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যা হবে বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট। এ সরকারের ২২তম বাজেট। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ধারণা দিয়েছিল, অর্থনীতি যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পরিস্থিতি ও রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠলে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (এসক্যাপ) পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭.২ শতাংশ। যেখানে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর প্রবৃদ্ধির চিত্র কী হবে তার চেয়ে বড় চিন্তা হলো মানুষের জীবন ও জীবিকার হাল কী হয় সেটা নিয়ে। তাই আসন্ন বাজেটে জীবন রক্ষার জন্য যা যা করণীয় তার প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিকে আবার অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। তাই এবারের বাজেট প্রণয়ন অনেক গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কোভিডকে মাথায় রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক চাহিদা, দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে মাথায় রেখে এই বিশেষ সময়ে বিশেষ বাজেট তৈরি করা দরকার।


চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল গতানুগতিক। সাধারণ মানুষের উন্নয়নে এ বাজেট তেমন কিছু ছিল না। তাই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে জীবন রক্ষা ও ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে আনুষ্ঠানিক উত্তরণের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি কৃষি, ছোট বড় শিল্পখাত, প্রবাসী রেমিট্যান্স, রপ্তানি খাত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সেবা খাতকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। চলতি বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। চলমান বাজেটের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবাসী আয় হয়েছে ১৬.৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭.৫৯ শতাংশ। বিগত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৫.৫২ শতাংশ। আসন্ন বাজেটে প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারাকে রক্ষা করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ^জুড়ে কোভিডের ধাক্কায় জনশক্তি রপ্তানির অবস্থা ভালো নয়। বাজেটে জনশক্তি রপ্তানি তথা বিদেশে কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া আবশ্যক। শ্রমিকদের বিদেশে যাওয়া সহজ করা, তাদের মজুরি বৃদ্ধি ও দালালদের খপ্পর থেকে মুক্ত রাখা দরকার।

আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষি থেকে আমাদের শিল্পের কাঁচামাল আসে। কৃষি উৎপাদন মানসম্মত ও টেকসই হলে খাদ্য চাহিদা পূরণসহ জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের চাহিদা পূরণ করা যায়। গত বছর করোনাকালীন সময়ে অর্থনীতিতে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কৃষিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। কৃষি ঋণে সুদের হার কমাতে হবে। গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের কৃষিতে ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুসংহত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা শক্তিগুলোকে সুসংহত করা উচিত। বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতির দাম কমানোসহ কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।

আমাদের অভ্যন্তরিন শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতকে সুসংহত করা দরকার। এছাড়া আমাদের কর্পোরেট টেক্সের হার অনেক বেশি। এ বিষয়ে ভাবা উচিত। রপ্তানি খাতে তৈরি পেশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। এ খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিরাট সুযোগ রয়েছে। একটি বিরাট জনশক্তি এখাতে কর্মে নিয়োজিত। এখাতে কীভাবে বৈচিত্র্য আনা যায়, বাজেটে সে বিষয়ে নির্দেশনা থাকা চাই। এখাতের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা ও বেশি বেশি অর্ডার পাওয়ার জন্য বিদেশি বায়ারদের সাথে কীভাবে সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায় সে দিকে নজর দেয়া উচিত। প্রয়োজনে এখাতের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত। রপ্তানি বৃদ্ধি ও রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন, বাজারজাতকরণসহ ভ্যাট-ট্যাক্সের ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টি বাজেটে থাকা চাই।

এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথায় আসা যাক। করোনা মহামারির কারণে স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, সমস্যাগুলো ষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানুষের জীবন রক্ষা, সুখী ও সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন জাতি গঠনে জন্য এখাতের উন্নয়ন অনস্বীকার্য। প্রতি অর্থবছরেই এ খাতের বরাদ্দ বাড়লেও শতকরা হিসাবে ৫ শতাংশের কাছাকাছিই থাকে। চলতি বাজেটে ৫ শতাংশের কিছু বেশি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সংগতিপূর্ণ নয়। তাছাড়া নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাও দুর্নীতির কারণে এ খাতের বেহাল দশা। তাই আসন্ন বাজেটে এখাতের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। অব্যবস্থাপনা দূর করা উচিত, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যায়ের অংশ বাড়ানো উচিত। হাসপাতালগুলোতে বেড সংখ্যা, আইসিইউ বাড়ানো, সরঞ্জামাদীর দাম ও ভ্যাট কমানো এবং ডাক্তার ও নার্সদের সুযোগ সুবিধার বিষয়টিও বাজেটে থাকা উচিত।

কোভিডের আঘাতে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ (পিপিআরসি) ও ব্রাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। এ বছর মার্চ পর্যন্ত এর মধ্যে শহরে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ৪৪ শতাংশ। করোনা যদি আরও চলমান থাকে তাহলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। তাই বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য নগদ অর্থ বরাদ্দ রাখা উচিত। দারিদ্র্য নিরসনে প্রতিবছর বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় বরাদ্দ থাকে, কিন্তু এ বরাদ্দে ব্যাপক অপচয় হয়। এ অপচয় বন্ধ করলে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা আরও বাড়ানো যায়। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দ্রুত পুনরুজ্জীবীত করতে হলে দরিদ্র, কর্মহীন হয়ে পড়া এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত জনগণকে সুরক্ষা দিতে বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি ও বাজারে মুদ্রাসরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রান্তিক মানুষের হাতে সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দিতে হবে। এতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে, অর্থনীতির স্বাস্থ্য বাড়বে। আসন্ন বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। বিলাসী ব্যয় নিরুৎসাহিত করতে হবে। আমাদের রাজস্ব আহরণ ভীষণভাবে অধোগতিতে। কিন্তু খরচ প্রচন্ড পরিমাণে বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) আয়কর, ভ্যাট, শুল্কখাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশের বেশি হলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। ঘাটতি পূরণে বাকি তিন মাস রাজস্ব আদায় করতে হবে আরও এক লাখ ৫৩ হাজার ১৯১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য যে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে তিল লাখ ৩০ হাজার কেটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা একে অবাস্তব বলেছিলেন। আসন্ন বাজেটে যৌক্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত, যা আদায়যোগ্য। আসন্ন বাজেটে আয়ের উৎস বাড়াতে হলে করের আওতা বাড়াতে হবে। করের হার বাড়ানো যাবে না। রাজস্ব বোর্ডের কর আদায়ের ব্যবস্থাকে আরোও আধুনিকায়ন করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অহেতুক প্রকল্প রাখা যাবে না। বছরের পর বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে খরচ বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: করোনাভাইরাস

১৭ জুন, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন