Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

কলম্বিয়ার আধা সামরিক বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী লড়াই-২

প্রকাশের সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : তাদের অধিকাংশকেই দোষ স্বীকার ও মার্কিন সরকারের সাথে সহযোগিতা করার জন্য ভালো পুরস্কার দেয়া হয়। পাশাপাশি কলম্বিয়ায় ব্যাপক অপরাধের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও প্রথমবার অপরাধকারী হিসেবে তাদের গণ্য করে সেরূপ আচরণ করা হয়। কলম্বিয়ার কারাগারগুলোতে অপরাধ করার কারণে তাদের প্রত্যাবাসন সম্পর্কে কর্মকর্তারা অবহিত ছিলেন। তারপরও মার্কিন কারাগারে অবস্থানকালে তারা সময়ের ব্যাপারে ছাড় পায়।
সরকার বলে, সালভাটোর মানকুসো যুক্তরাষ্ট্রের একটি জেলা আদালতে বিচারের সম্মুখীন হওয়া এযাবৎকালের সবচেয়ে কুখ্যাত কোকেইন পাচারকারী। কলম্বিয়ার আদালতগুলো ১ হাজারেরও বেশি লোকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার জন্য তাকে দায়ী করেছে।
মামলার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তার ৩০ বছর কারাদ- হয়েছে। তার ব্যাপক সহযোগিতার কারণে সরকারি কৌঁসুলিদের একজন এক সাক্ষাৎকারে ‘তাকে আমার কাছে সবসময়ই একজন ভদ্রলোক বলে মনে হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন। তার ২২ বছরের কম কারাদ-ের সুপারিশ করা হয়। একজন ফেডারেল জজ তাকে ১৫ বছর ১০ মাসের কারাদ- দেন। শেষ পর্যন্ত তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে ১২ বছরের সামান্য কিছু বেশি সময় কাটাতে হবে।
হেনরিকুয়েজ পরিবারের প্রতিনিধি বার্কেলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ল’ ক্লিনিকের পরিচালক রোক্সানা আলথোলজ বলেন, এটা পাগলামি। এ লোকগুলো হচ্ছে খারাপের মধ্যে খারাপ। তারা হচ্ছে মাদক স¤্রাট ও যুদ্ধাপরাধী। কেন তারা কোনো রকম সুবিধা পাবে?
এর আগে ফেডারেল কৌঁসুলিরা মিস আলথোলজের অসন্তোষ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা তাদের দূরে রাখতে যাচ্ছি, তা সে জন্যই হোক। কিন্তু আলথোলজ ও অন্য মানবাধিকার কর্মীরা তা দেখলেন ও সেটা বিষয় হয়ে দাঁড়াল। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মাদক অপরাধের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্র এ লোকগুলোকে মানুষের উপর অত্যাচারের জন্য অভিযুক্ত করতে পারে অথবা কলম্বিয়ান অন্তর্বর্তীকালীন বিচার ব্যবস্থাকে একটি সুযোগ দিতে পারে।
জিরাল্ডো হবেন সর্বশেষ প্রত্যর্পণকৃত আধাসামরিক বাহিনীর দ-প্রাপ্ত লোক।
যুক্তরাষ্ট্রের মার্শালস সার্ভিস বলেছে, তার সাথে দি টাইমস-এর লোকদের সাক্ষাৎ অসম্ভব। কারণ এ জন্য বন্দী, তার আইনজীবী, তার ওয়ার্ডেন, একজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও একজন ফেডারেল জজের অনুমতি লাগবে। এদিকে একজন সাংবাদিক ও একজন ফটোগ্রাফার গত মাসে ভার্জিনিয়ার একটি জেলে জিরাল্ডোর সাথে সাক্ষাৎ করতে সফল হন।
একটি ঢোলা নীল কভারঅল পরা ৬৮ বছর বয়স্ক এল প্যাট্রন তার সেই ভীতিকর চেহারার বদলে ক্ষয়িষ্ণু চেহারা নিয়ে উপস্থিত হন। তার চুল ধূসর, ওজন কমে গেছে, পদক্ষেপ ধীর। তার দিন কাটে পটেটো চিপস ব্যাগ থেকে পার্স বুনে ও অন্য কয়েদীদের কাছে তা বিক্রি করে।
২০০৮ সালের ১২ মে মধ্যরাতের একটু আগে বারানকুইলার একটি জেলে ধাক্কা দিয়ে জিরাল্ডোকে জাগানো হয়। তাকে দ্রুত একটি ছোট স্যুটকেস গুছিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। তারপর তাকে নিয়ে তোলা হয় রাজধানী বোগোটাগামী একটি বিমানে। তাকে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
বোগোটায় পৌঁছার পর হাতকড়া পরিয়ে কোমর ও পায়ে শিকলসহ তাকে আমেরিকার একটি সরকারী বিমানে ওঠানো হয়। অস্বাভাবিক নীরবতার মধ্যে বিমানযাত্রা শেষ হয়। এর মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মাদক পাচারকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যর্পণ না করার তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউরাইব এসব লোকদের যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান বহু বছর ধরে প্রত্যাখ্যান করার পর হঠাৎ করেই আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানানÑআধা সামরিক বাহিনীর নেতাদের কারা চান? তাদের এখনই নিয়ে যান।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট চাইছিলেন যে সেদিন কলম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এবং পরদিন সকালে খোলার আগে তাদের নিয়ে যাওয়া হোক। ইউরাইব বলেন, তারা যদি দ্রুত কাজ না করে তবে সুপ্রিম কোর্ট তাদের প্রত্যর্পণ আটকে দিতে পারে বলে তিনি আশংকা করছিলেন।
কর্মকর্তারা বলেন, আমেরিকানরা দ্রুত কাজ শুরু করে যদিও তা ছিল লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ। তাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল কলম্বিয়ার চারটি স্থান থেকে তাদের সংগ্রহ করে একটি স্থানে জড়ো করা এবং তাদেরকে পরদিন আদালত শুরু হওয়ার আগেই কলম্বিয়া থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া।
তারা বলেন, একপর্যায়ে এই লোকগুলোকে বোগোটা থেকে গুয়ানতানামো হয়ে ফ্লোরিডা, টেক্সাস, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডি.সি.-র আদালতগুলোতে নিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনস্ট্রেশন ৬টি বিমান ব্যবহার করে।
প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র কেন কলম্বিয়ার একজন প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রক্ষার্থে এভাবে অগ্রসর হল যার কিনা নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আমেরিকান ডিভিশনের পরিচালক জোসে মিগুয়েল ভিভানকো বলেন, বুশ প্রশাসনের জোরালো নীতি ছিল মাদক বিরোধী উদ্যোগে সহযোগিতা করা। মানবাধিকার লংঘন, নিষ্ঠুরতা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কোনো কিছুই এই অপরাধীদের একদিনও কলম্বিয়ায় আটকে রাখতে পারত না।
এ অবস্থায় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট যখন রাতারাতি ১৪ জন মাদক অপরাধীকে হস্তান্তর করতে চাইলেন তখন আপনার করার কী ছিল? আপনি শুধু তাদের স্বাগত জানাতে পারেন।
এ হচ্ছে এমন এক অপরাধ কাহিনী যা ভূরাজনীতির মধ্যে জট পাকিয়ে গেছে। কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং এ অঞ্চলের বৃহত্তম সাহায্যগ্রহীতা দেশ। মাদক, গেরিলা যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে তারা পরস্পরের সহযোগী।
গেরিলারা ও আধাসামরিক বাহিনী উভয়েই তাদের কর্মকা- পরিচালনার জন্য নির্ভর করে মাদক, যুদ্ধকর সংগ্রহ ও স্ব স্ব এলাকার মাদক পাচারকারীদের নিরাপত্তা দেয়ার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের উপর। তবে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাদের দৃষ্টি দেয় মাদক-গেরিলাদের উপর, তারপর আধা সামরিক বাহিনীগুলোর উপর।
২০০০ সালের পর আধাসামরিক বাহিনীর সৈন্যরা কমপক্ষে ৭৫টি গণহত্যা চালানোর পর ওয়াশিংটন তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। ২০০১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল এইউসি নামে পরিচিত ইউনাইটেড সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সেস অব কলম্বিয়াকে ফার্কের মতই বিদেশী সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আধা সামরিক বাহিনীর প্রধান নেতাদের মাদক সম্পৃক্ততা থাকায় এবং পরে ২০০২ সালে ইউরাইব প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ায় বামপন্থী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দমন অভিযানের শপথ ঘোষণা করেন। আধা সামরিক নেতারা যাতে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে সে জন্য তাদের রাজি করাতে তিনি তাদের যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়ার হুমকি দেন।
ইউরাইব তার পূর্বসূরীদের মত ছিলেন না। আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে তার কঠোর ভূমিকা তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয় যে কারণে তিনি দু’দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি মাদক লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে তিনি প্রত্যাবাসনকে গ্রহণ করেন। সূত্র নিউইয়র্ক টাইমস। (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন