Inqilab Logo

শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৭ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

রমজানের শিক্ষা চর্চা হোক সারা বছর -জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ান

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৪ মে, ২০২১, ৪:২১ পিএম

রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা গুনাহ মুক্ত জীবন গড়া, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার মধ্যেই রয়েছে আমাদের প্রভূত কল্যাণ ও সাফল্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজানের রোজা রাখার পর যারা শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখবেন তারা সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব লাভ করবেন। রমজানের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে তাকওয়া ভিত্তিক জীবন গঠন করতে হবে। আজ জুমা খুৎবা পূর্ব বয়ানে বিভিন্ন মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিবরা এসব কথা বলেন।
ঈদের দিনে জুমার নামাজেও মসজিদগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষীত হয়। মসজিদে জায়গা না হওয়ায় রাস্তার ওপরও মুসল্লিদের জুমার নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। রাজধানীর মহাখালীস্থ মসজিদে গাউছুল আজমেও প্রচুর মুসল্লির সমাগম ঘটে। জুমার নামাজের পরে পেশ ইমাম ও খতিবরা করোনা মহামারি থেকে মুক্তি, ফিলিস্তিনি মুসলমানদের হেফাজত এবং দেশ জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করেন।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মুহাম্মাদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী আজ জুমা বয়ানে বলেন, রমজান তাকওয়া অনুশীলনের মাস। সিয়ামের মাধ্যমে রমজান মাসে যে রকম সিয়ামের সওয়াব অর্জন হয়েছে পুরো বছরটা যেন সে রকম সওয়াব অর্জন করা যায় তার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজার পরে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল। সে কারণে রোজা রেখে কেউ সুযোগ পেলেও আল্লাহ তায়ালার ভয়ে আহার করেনা। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের মানসিকতা ও ভয় যদি সুদ ঘুষ ও জুলুম থেকে বিরত রাখতে পারে তাহলে মনে করা যেতে পারে রমজানের সিয়ামের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয়েছে। নচেৎ মনে করতে হবে রমজানের এক মাসে কিছুই অর্জন হয়নি। বরং তাওবার মাধ্যমে নতুন ভাবে তাকওয়া অর্জনে ব্রত হতে হবে। তাকওয়া ভিত্তিক জীবন গঠন করতে না পারলে বিশ্বের অন্যান্যদের মত আমাদের জন্যও কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করছে।
পেশ ইমাম বলেন, রমজানের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে তাকওয়া ভিত্তিক জীবন গঠন করার কোন বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন!
ঢাকার বাংলা মটরস্থ বাইতুল মোবারক জামে মসজিদের অনারারি খতিব অধ্যাপক মাওলানা ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ আজ জুমার খুৎবাপূর্ব বয়ানে বলেন, মহান আল্লাহর নির্দেশে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন পবিত্র জুমাবারে আমরা এবার ঈদ উদযাপন করছি, যা ঈদের মাহাত্মকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
পবিত্র রমজান মাস আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে। রমজান মাস আমাদের মাঝে এসেছিল তাকওয়ার দীক্ষা নিয়ে, পাপাচার থেকে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার শিক্ষা নিয়ে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য, ইসলামী ও আমলী জিন্দেগী গঠন রমজানের উদ্দেশ্য। রমজানের প্রতিটি শিক্ষাই আদর্শ জীবন গঠন এবং সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য, পরকালীন জীবনে মুক্তি লাভের শ্রেষ্ঠ পাথেয়। রমজান শেষ হলেও রমজানের শিক্ষা যাতে আমাদের মধ্য থেকে বিদায় না নেয়, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা জরুরি। রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়া অবলম্বন করা, গুনাহ মুক্ত জীবন গড়া, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার মধ্যেই রয়েছে আমাদের প্রভূত কল্যাণ ও সাফল্য।
খতিব বলেন, রমজানের পরে শাওয়াল মাসের আগমন। শাওয়াল শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন উঁচু করা, উন্নতকরণ, পাল্লা ভারি হওয়া, বিজয় লাভ করা ইত্যাদি। এ মাসের আমলে উন্নতি লাভ হয়, নেকির পাল্লা ভারি হয় আমলে সাফল্য আসে। অর্থ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে প্রতিটি অর্থের সঙ্গেই শাওয়াল মাসের রয়েছে গভীর সম্পর্ক।
খতিব বলেন, শাওয়াল মাসের একটি বিশেষ আমল হচ্ছে সাদকাতুল ফিতর, যা আমরা ইতোমধ্যেই আদায় করেছি। শাওয়াল মাসে বিয়েশাদী সম্পন্ন করা সুন্নত। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে শাওয়াল মাসে বিবাহ করেন। (মুসলিম, হাদীস নং-৩৩৭৪) তাই আমাদের চেষ্টা করা উচিত বিবাহ যোগ্য ব্যক্তির বিবাহ এই বরকত মাসে আয়োজন করা। শাওয়াল মাসের আরেকটি অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ আমল হচ্ছে ছয় রোজা। এই মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখা সুন্নত। আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যারা রমজানে রোজা পালন করবে এবং শাওয়ালে আরও ছয়টি রোজা রাখবে, তারা যেন পুরো বছরই রোজা পালন করলো। (মুসলিম, হাদীস নং-১১৬৪)
মহান আল্লাহ আমাদে সকল গুনাহ মাফ করুন, রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন, শাওয়ালের সকল ফযিলত ও নিয়ামত দান করুন। মুসলিম বিশে^র উপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ করুন। বিশ^বাসীর জন্য হিদায়েত মঞ্জুর করুণ, করোনাসহ যাবতীয় বিপদাপদ থেকে সকলকে রক্ষা করুন। আমীন!
মিরপুরের বাইতুল আমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদ খতীব মুফতি আবদুল্লাহ ফিরোজী আজ জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, শাওয়াল আরবি চন্দ্র বছরের দশম মাস। এটা আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো উঁচু করা, উন্নতকরণ, পূর্ণতা, পাল্লা ভারি হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া। এসব অর্থের প্রতিটির সঙ্গেই শাওয়ালের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মাসের আমলের দ্বারা উন্নতি লাভ হয়, আমলে পূর্ণতা আসে, নেকির পাল্লা ভারি হয়, গৌরব অর্জন হয় ও সাফল্য আসে, এসবই হলো শাওয়াল মাসের নামের যথার্থতা। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মহৎ শিক্ষাটা শুধু রমজানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বছর ভরে জীবনজুড়ে এর অনুশীলন হতে থাকে, সেজন্যই রাসুল (সা.) বছরের বিভিন্ন সময়ে নিজে নফল রোজা রেখেছেন এবং উম্মতকে রাখতে উৎসাহিত করেছেন। এই নফল রোজাগুলোর অন্যতম হল শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা। এ রোজার ফযিলত প্রসঙ্গে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের সব রোজাগুলো রাখল অতঃপর শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারাবছর ধরেই রোজা রাখল। (সহীহ মুসলিম)। হযরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি সারাবছর রোজা রাখতে পারব?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। কাজেই তুমি সারাবছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজান পরবর্তী শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখো, তাতেই সারাবছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে (তিরমিজী)।
খতিব আরও বলেন, মাহে রমজানের রোজার কমতি পূর্ণ করতেই শাওয়ালের ছয়টি রোজা। এ রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজা আদায়ের তাওফিকের শুকরিয়াও আদায় করা হয়। আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো বান্দার নেক আমল কবুল করেন, তখন তাকে অন্য একটি নেক আমলের তাওফিক দেন। সুতরাং এই রোজাগুলো রাখতে পারা রমজানের রোজা কবুল হওয়ারও লক্ষণ। এ রোজা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নত। মাসের শুরু শেষ কিংবা মাঝামাঝি, সব সময়ই রাখা যায় এই রোজা। এক যোগে অথবা মাঝে ফাঁক রেখে পৃথকভাবেও রাখা যায়। শাওয়াল মাসে শুরু করে শাওয়াল মাসে শেষ করলেই হল। তবে ঈদুল ফিতরের পর শাওয়ালের প্রথম দিকে একসঙ্গে ছয়টি রোজা রাখাই উত্তম। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন আমীন!
ঢাকা উত্তরার মাসজিদ আল মাগফিরাহ এর খতিব মুফতি ওয়াহিদুল আলম জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, রমজানের মূল শিক্ষা ছিল সিয়াম, কিয়াম,তেলাওয়াতে কোরআন ও তাকওয়া অর্জন। যাতে আগামি ১১ মাস এ শিক্ষার উপর আমরা অটল থাকতে পারি। ঈদের পর দিন হতে ২৮/২৯ দিনের মধ্যে ৬ টি নফল রোজা রাখার ব্যাপারে নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে রোজা রাখবে এর পর শাওয়াল মাসে ৬ টি রোজা রাখবে তার সারাবছর রোজা রাখার মত সওয়াব হবে। (মুসলিম শরিফ)
আরবী মাসের ১৩.১৪.১৫ তারিখ রোজা রাখা, সপ্তাহের প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা, জিল হজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা, বিশেষত আরাফার দিন, আশুরার দিন এবং তার আগে ও পরে একদিন রোজা রাখার অসিম ফযিলত ও সওয়াবের কথা বিভিন্ন হাদিসে বর্নিত আছে। নবী (সা.) নিজে এবং সাহাবায়ে কেরাম এই রোজা গুলো রাখতেন যা আমাদের জন্য সুন্নাত। কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজের ফযিলতের কথা কোরআন হাদিসে অনেক বেশী পরিমাণ বর্নিত আছে। শেষ রাত্রে জাগ্রত হওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা থাকলে কমপক্ষে এশার নামাজের পর বা রাত ১১/১২ টার সময় ২/৪ রাকাত তাহাজ্জুত নামাজ আদায় করা উচিত। রমজানের মতই পুর্ন বছর তিলাওয়াতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা দরকার। আল্লাহ তায়ালা রমজানের মত অন্যান্য মাসেও আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমীন!



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বয়ান


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ