Inqilab Logo

বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

কেন বারবার পরিচয় বদলেছেন অস্ট্রেলিয়ান এই নারী?

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৩০ মে, ২০২১, ৬:৩৬ পিএম

শিশু চুরির অপরাধে সামান্থা আজোপার্ডি নামে এক নারীকে শাস্তি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ান আদালত। কিন্তু তার অপরাধ এতোটাও সরল কিছু না। বিশ্বের নানা দেশে নানান মিথ্যা পরিচয়ে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। এ সময় এমিলি পিট, লিন্ডসে কফলিন, ডাকোটা হনসন, জর্জিয়া ক্যাঅলিফে, হার্পার হার্নান্দেজ, হার্পার হার্ট- এইসব ছদ্মনাম নিয়েছেন তিনি।

৩২ বছর বয়সী এই নারী যাকে ‘প্রতারক’ আখ্যা দেয়া হয়েছে, তাকে গত এক দশকে দেখা গেছে আয়ারল্যান্ড, কানাডা ও নিজ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। অস্ট্রেলিয়ায় মিথ্যা প্রমাণাদি দেখিয়ে একটি কাজ নেন আজোপার্ডি, শিশু দেখভালের কাজ, সেখানে কোন অনুমতি ছাড়াই দুই শিশুকে নিয়ে ঘুরতে যান এবং ভিক্টোরিয়ায় ধরা পড়েন তিনি। তাকে দুই বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। মেলবোর্নের ম্যাজিস্ট্রেট জোহানা মেটকাফ বলছেন, এই প্রতারকের ‘উদ্ভট অপরাধ’-এর পেছনে কী কারণ ছিল তা বোঝা মুশকিল।

অতীতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আজোপার্ডি নিজেকে পাচারের শিকার নারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। নিজেকে সুইডেনের রাজবংশের সদস্য এবং রাশিয়ান জিমন্যাস্ট বলেও পরিচয় দেন তিনি। কুড়ি বছর বয়স থেকে প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি প্রায়ই নিজেকে কিশোরী বলে পরিচয় দিতেন। ক্ষীণাঙ্গ, মৃদু স্বর এবং ঘাবড়ে যাওয়ার ভঙ্গিমায় আঙ্গুল চিবানোর অভিব্যক্তি তাকে কিশোরীর ছদ্মবেশ ধরে রাখতে সহায়তা করে। বারবার আজোপার্ডি ধরাও পড়েন কোন না কোনভাবে। তাকে বিভিন্ন দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, ছোটখাটো মেয়াদে জেল দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের পরিসমাপ্তি হয়নি কখনো।

ম্যাজিস্ট্রেটের বক্তব্য অনুযায়ী, তার এসব অপরাধের পেছনে কোন আর্থিক কারণ ছিল না। খ্যাতি পাওয়ার উদ্দেশ্যও ছিল না। ট্রায়ালের সময় আদালতের শুনানিতে জানা গেছে, নানা লক্ষণ পর্যালোচনায় আজোপার্ডির পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার রয়েছে। এটা একটা বিরল পরিস্থিতি যার নাম বলা হচ্ছে সিউডোলোজিয়া ফ্যান্টাস্টিকা, এর নানা দিকের একটি না চাইতেও ধারাবাহিক মিথ্যা কথা বলতে থাকা। অক্সফোর্ডের ক্লিনিকাল সাইকের ভাষায়, এদের বলা হয় ‘প্যাথলজিকাল লায়ার’ বা স্বভাবজাত মিথ্যাবাদী। তাই এই অপরাধীর মানসিক দিক বিবেচনায় এবং যত্নের খাতিরে বারবার বিচার কাজও বিলম্বিত হয়েছে।

বিভিন্ন ঘটনার যোগসূত্র মিলিয়ে সামান্থা আজোপার্ডির বিচার করা হয়। যার মধ্যে ২০১৯ সালে ভিক্টোরিয়ায় ঘটে যাওয়া একটা ঘটনায় মামলার মোড় ঘুরে যায়। এর সাথে জড়িয়ে ছিলেন এক ফরাসী জুটি, যাদের পরিচয় জানা যায়নি। এই জুটিকে আজোপার্ডি বলেন তার বয়স ১৮। সেখানে তিনি যখন শিশুদের দেখভাল করার কাজ করছিলেন তখন বাচ্চাদের নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে ধারে কাছে না গিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চলে যান, সেখানে গোয়েন্দা পুলিশ আজোপার্ডিকে শনাক্ত করে।

এলাকার মুদি দোকানে ধরা পড়রার আগে একটি কাউন্সেলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে যান তিনি সেখানে নিজেকে অপ্রাপ্তবয়স্কা গর্ভবতী হিসেবে দেখান। তখন তার পরনে ছিল স্কুলের পোশাক, এমনকি একজন অপরিচিত ব্যক্তিও জোগাড় করেন তিনি, যিনি তার বাবা হিসেবে ফোনে কথা বলে দেন এই সেবা পাওয়ার জন্য। এর আগেও একই রকম কাজ করেন আজোপার্ডি। কিন্তু মিথ্যার ধরন ছিল ভিন্ন।

অস্ট্রেলিয়ার একজন পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড় টম জার্ভিস এবং তার স্ত্রী জেজের বাড়িতে শিশু দেখভালের কাজ করেন আজোপার্ডি। এই দম্পতি বলেন, আজোপার্ডিকে তারা একটি ওয়েবভিত্তিক সার্ভিসে পান এবং তাকে ভরসাও করেন শুরুতে। আজোপার্ডি এই দম্পতির সাথে ব্রিজবেন থেকে মেলবোর্নে আসে। এই পুরো ঘটনা খোলাসা হতে থাকে তখনই যখন এই দম্পতি বুঝতে পারেন যে আজোপার্ডি একজন ১২ বছরের মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করে এবং তাকে পিক্সার মুভিতে কণ্ঠ দেয়ার কাজ পাইয়ে দেবে বলে মিথ্যা আশ্বাস দেন। অস্ট্রেলিয়ান একটি ওয়েবসাইটে জার্ভিস বলেন, ‘আমি তাকে নিজের মেয়ের মতো দেখতাম। আমরা পরে জানতে পারি সে মিথ্যা বলছে। এবং এর কোন মানে ছিল না।’

ডাবলিনের জেনারেল পোস্ট অফিস, যার সামনে সামান্থা আজোপার্ডিকে পাওয়া যাওয়ার পর তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘জিপিও গার্ল’। ২০১৩ সালের অক্টোবরে আজোপার্ডি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ছিলেন। সেখানে আইরিশ গোয়েন্দা পুলিশ ডেভিড গ্যাল্যাগারের মুখোমুখি হন অদ্ভুতভাবে। তখন আজোপার্ডির নাম এই পুলিশ কিংবা স্থানীয় কেউই জানতো না। পরবর্তীতে সে জিপিও গার্ল হিসেবে পরিচিতি পায়, কারণ তাকে ডাবলিনের জেনারেল পোস্ট অফিসের বাইরে পাওয়া যেত। এই জেনারেল পোস্ট অফিসের আদ্যক্ষর থেকেই তার জিপিও গার্ল পরিচয়টি আসে।

আয়ারল্যান্ডের পুলিশ ফোর্স আজোপার্ডিকে অসহায় অবস্থায় পায়, সে তখন এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করতো কিন্তু কারো সাথে কথা বলতো না। দুইজন অফিসার তাকে নিয়ে হাসপাতালে যান। কিন্তু আজোপার্ডি সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোন কথাই বলেনি। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, আজোপার্ডি মানবপাচারের শিকার হয়েছিলেন। যদিও তিনি তার বয়স মুখে বলেনি কিন্তু হাতের ঈশারায় বুঝিয়েছেন যে তার বয়স ১৪।

পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে দ্বারে দ্বারে খোঁজে। শিশু কল্যান বিশেষজ্ঞদের সাথে, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের সাথে, ইন্টারপোলের সাথে, ফরেনসিক ল্যাব, অভিবাসন অফিস, ঘরোয়া সহিংসতা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এবং যৌন সহিংসতা ইউনিটের কাছে যায় আইরিশ পুলিশ। এমনকি তার দাঁতে লাগানো ব্রেস দেখে তারা দেশব্যাপী নানা দন্ত চিকিৎসাকেন্দ্রেও খোঁজ নেয়।

গোয়েন্দা সুপারিনটেনডেন্ট গ্যালাগার বলেন, তার বয়স নিয়ে সবসময় প্রশ্ন ছিল, কিন্তু এই মেয়ে যে পুরোপুরি ভুয়া হবে সেটা তারা কল্পনা করেনি। যেহেতু প্রতারক নিজেকে কম বয়সী দাবি করে, তার তদন্তের খাতিরে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে ছবি দিয়ে তথ্য যাচাই করতে হাইকোর্টের অনুমতি পর্যন্ত লেগেছে। শেষ পর্যন্ত, তার পরিবারের সাথে জড়িত একজন আজোপার্ডিকে চিনতে পারে, যে তার সাথে আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত আসে।

আজোপার্ডির মূল পরিচয় তখন জানা যায় এবং তাকে পুলিশি হেফাজতে অস্ট্রেলিয়া পাঠানো হয়। যাত্রার সময়ও মুখ খোলেনি আজোপার্ডি। গোয়েন্দা সুপারিনটেনডেন্ট গ্যালাগার বলেন, ‘যখন তার বয়স ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সত্য জানা যায়, তখন তদন্তকারী দল ও যারা তদন্ত নিয়ন্ত্রণ করছিলেন তাদের মধ্যে নানা মতও সৃষ্টি হয়।’

কানাডার ক্যালগারিতে আজোপার্ডিকে পাওয়া যায় ২০১৪ সালে। একই রকম ঘটনা ঘটে কিন্তু এবারে সে মুখ খোলে। নিজের নাম তিনি বলেন, অরোরা হেপবার্ন। এবারও নিজেকে ১৪ বছর বয়সী দাবি করেন তিনি। তবে এবারে যোগ করেন তার সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং সে একজন কিডন্যাপারের হাত থেকে পালিয়ে এসেছেন। তখন তার আসল বয়স ছিল ২৬। আবারো তদন্তকারীরা এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজ করে এই কেস নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কেউ একজন ডাবলিনের গল্পের সাথে একটা যোগসূত্র খুঁজে পান।

ক্যালগারি পুলিশকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টার দোষে দোষী সাব্যস্ত হন আজোপার্ডি। পুলিশের শিশু নির্যাতন ইউনিটের কেলি ক্যাম্পবেল বলেন, ‘এখানে পেশাদারদের একটা দল কাজ করে এবং তদন্ত করেছে যারা মনে করেছে এটা একটা সত্যিকারের ঘটনা। এমন ঘটনা আরো থাকতে পারে এবং ভুক্তভোগীও আরো থাকতে পারে।’

ক্যালগারি হেরাল্ডের প্রতিবেদনে পাওয়া যায় শুনানিতে যে নথি ছিল সেখানে দেখা যায় আয়ারল্যান্ড থেকে ফেরৎ পাঠানোর ছয় মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আরো একটি পাসপোর্ট পান আজোপার্ডি। আরো অনেক গল্প আছে তার, আরো অনেক পরিচয়। সূত্র: বিবিসি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অস্ট্রিয়া

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
৩ ডিসেম্বর, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ