Inqilab Logo

সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০৯ কার্তিক ১৪২৮, ১৭ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

ভবিষ্যৎ প্রজন্মই যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তবে এই উন্নতি দিয়ে কী হবে?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৫ জুন, ২০২১, ১২:০৩ এএম

ঘটনাটি ভয়াবহ। তবে তা মানুষের মধ্যে কতটা আলোড়ন তুলতে পেরেছে বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পেরেছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য এখন খুন করে লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা, ধর্ষণ কিংবা শিশুহত্যার মতো বর্বর ঘটনা আমাদের মধ্যে খুব একটা বিচলন সৃষ্টি করে না। অহরহ ঘটে চলা এ ধরনের ঘটনা আমাদের চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে দিয়েছে। অথচ এই কয়েক দশক আগেও একেকটি খুনের ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন তুলত। মানুষ তা নিয়ে আলোচনা করত। ঘটনার বিবরণে শিউরে উঠত। কী ভয়াবহ, সাঙ্ঘাতিক, নিষ্ঠুর-এসব শব্দ প্রয়োগে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করত। নিজেরা সতর্ক হতো, অন্যদেরও সতর্ক করত। এমন ঘটনা যাতে না ঘটে এ নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ বলয় গড়ে উঠত। কালক্রমে এসব প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ যেন হারিয়ে গেছে। ফলে একেকটি অস্বাভাবিক ঘটনা কেবল মানুষের জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে না। এ থেকে বোঝা যায়, সমাজে এখন যত অস্বাভাবিক ও অমানবিক ঘটনা ঘটুক না কেন, তা স্বাভাবিকভাবে নেয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। মানবিকতার এমন অবক্ষয় সব ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়ে উঠেছে। এই যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) নামক মাদক গ্রহণ করে দা দিয়ে নিজের গলা নিজে কেটে আত্মহত্যার ঘটনা পত্র-পত্রিকায় এলেও তা আমাদের কতটুকু নাড়া দিতে পেরেছে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। অথচ দেশে ভয়ংকর এই মাদক যে তরুণদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং পরিবার ও সমাজকে ক্ষত-বিক্ষত করছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় নয়। যেমন উপেক্ষা করার নয়, কিশোর গ্যাং। এ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের সেবক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে কতটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে তা বোঝা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকসেবী, ব্যবসায়ী কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ঠিকই, তবে তাতে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মাদক ব্যবসা, মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং, শিশুহত্যা, ধর্ষণ বহাল তবিয়তেই রয়েছে। কার্যকর প্রতিকার ও প্রতিরোধ না থাকায় এসব অপরাধ কমার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দুই.
কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার তরুণ ও যুবশক্তিকে ধ্বংস করে দিলেই হয়; সে জাতি মুখথুবড়ে পড়ে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যেকোনো জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণ প্রজন্মের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠার ওপর। কোনো কারণে তরুণ প্রজন্ম অথর্ব ও অচল বা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলে সে জাতির সামনে এগুনোর পথ থাকে না। আমাদের সরকার ও নীতি নির্ধারকরা এ বিষয়টি কতটা উপলব্ধি করেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমরা দেখছি, সরকার দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, সড়ক-মহাসড়ক, অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বড় বড় প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী। অর্থনৈতিক উন্নতিতে এসব প্রকল্পের ভূমিকা থাকলেও এ উন্নতি যাদের জন্য তারা যদি সুস্থ-সবল না থাকে অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম নেশাসক্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ে কিংবা খুন, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাইয়ের কাজে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এ উন্নতি কি কোনো কাজে আসবে? যে উন্নয়ন মানুষের জন্য, সে মানুষ নেশায় বিভোর হয়ে থাকলে এ উন্নয়ন দিয়ে কি হবে? দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ নেশাসক্ত হয়ে বিপদগামী হয়ে, পরিবার ও সমাজকে অনিরাপদ করে তুললেও এ নিয়ে সরকারের তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। সরকারের পুরো মনোযোগ ইট-পাথরের অবকাঠামোর উন্নয়নের দিকে। মানুষের মানবিকতা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার উন্নয়নের দিকে মনোযোগ নেই বললেই চলে। এ নিয়ে কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেই। আমরা এমন প্রকল্পের কথা শুনি না। অথচ জনগণের সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও সুখী হওয়ার উপরই নির্ভর করে দেশের উন্নতি-অগ্রগতি। সরকার যে অবকাঠামোগত উন্নয়নকেই সুখের মূল চাবিকাঠি মনে করছে, তা তার কথা-বার্তা থেকেই বোঝা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, কেবল বস্তুগত উন্নয়নই কোনো জাতির উন্নয়নের মাপকাঠি নয়। জনগণের সামাজিক ও পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা এবং সুখই হচ্ছে প্রকৃত উন্নয়ন। এক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজন হলেও তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক শান্তি ও স্বস্তি। আমাদের দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির মূল সূচক ধরা হয় জিডিপি কিংবা মাথাপিছু আয়কে। অথচ ভুটানে সবার আগে উন্নতির সূচক ধরা হয় মানুষের সুখের সূচককে কেন্দ্র করে। সেখানে গ্রস ন্যাশনাল প্রডাক্টের চেয়ে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিন্যাসকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি ধরা হয়। এর মূল ভিত্তি চারটি। এক. টেকসই এবং সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দুই. পরিবেশ সংরক্ষণ। তিন. শিল্প-সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও এর প্রসার। চার. সুশাসন। দেখা যাচ্ছে, ভুটানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবার আগে মানুষের চরিত্রগত মানবিক উন্নয়নকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমেই দেশটি এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, আমাদের দেশে উন্নয়ন বলতে কেবল বুঝায় অবকাঠামোগত উন্নয়নকে। এখানে মানুষের চরিত্রগত এবং মানবিক বৈশিষ্ট্যগত উন্নয়ন গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে অনেকে যে যার মতো করে দুর্নীতি, জোর-জবরদস্তি ও অসাধু উপায়ে উন্নতির পথ ধরেছে। এ নিয়ে সরকারেরও যেন মাথা ব্যাথা নেই। এই মানবিক উন্নয়ন উপেক্ষিত হওয়ায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার থেকে শুরু করে উঠতি বয়সের কিশোররা গ্যাং কালচারের দিকে ধাবিত হয়েছে। দেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি প্রভাবশালী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ থেকে শুরু করে দিন মজুর, মুদি দোকানি, গাড়ি চালক, বাসের হেলপার পর্যন্ত মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। মাদককে কেন্দ্র করে কিশোররা গ্যাং তৈরি করে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শুরু করে পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও যুবক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুবকরা বেশি মাদকাসক্ত হচ্ছে। মাদকসেবীদের শতকরা ৬০.৭৮ ভাগই এসএসসি পাস করা। ২০ থেকে ৪০ বছরের মাদকসেবীর সংখ্যা শতকরা ৮১.৩৭ ভাগ। কি ভয়াবহ পরিসংখ্যান। এ পরিসংখ্যান থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশজুড়ে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন চলছে এবং তরুণ প্রজন্ম কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এবং তাদের গন্তব্য কোন দিকে। এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কি? দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি কার জন্য? দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি উচ্ছন্যে যায় এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠে তবে এ উন্নতি দিয়ে কি হবে?

তিন.
এ কথা ভাবাও যায় না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। কিছুদিন আগে স্বয়ং পুলিশ কর্তৃপক্ষই তার সদস্যদের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে অর্ধ শতাধিকের বেশি সদস্যকে মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে মাদকাসক্ত পুলিশের কিছু যায় না আসলেও পুরো পুলিশের ভাবমর্যাদা যে বিনষ্ট হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, সরাসরি মাদকবহন ও বিতরণ এমনকি মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালানোর সুযোগ দিয়ে একশ্রেণীর পুলিশ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্র তৈরি করেছে জনগণের সেবা এবং অনিয়ম, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। এর অর্থ হচ্ছে, পুলিশ জনগণের সেবা করে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন করবে। দেখা যাচ্ছে, পুলিশ জনগণের সেবার পরিবর্তে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সেবার কাজে বেশি মনোযোগী। পুরোপুরি নীতিনির্ধারকমুখী হয়ে রয়েছে। তারা কিসে খুশি হয় এবং কিভাবে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা যায় এ কাজে বেশি ব্যস্ত। এক্ষেত্রে জনগণের সেবা হয়ে পড়েছে গৌণ, সরকারের সেবা হয়ে গেছে মুখ্য। অথচ পুলিশের কাজই হচ্ছে, মানবিক ও সহমর্মী হওয়া, মূল্যবোধের প্রতীক হওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া। একটি মানবিক, মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা সম্পন্ন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা। পুলিশের এমন ভূমিকা আমাদের দেশে কদাচ দেখা যায়। বিগত একযুগে আমরা যদি পুলিশের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখব, বেশিরভাগ সময় তারা রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম দমানো এবং দলন-পীড়নে বেশি কাজ করেছে। এতে সরকার খুশি হয়েছে এবং পুলিশও সরকারের এই খুশিকে পুঁজি করে নানা ধরনের অনাকাক্সিক্ষত কাজে জড়িয়েছে ও অতি উৎসাহী হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। পুলিশের মধ্যে এমন প্রবণতা দেখা গেছে, আমরাই সরকার টিকিয়ে রেখেছি। বলা বাহুল্য, যেখানে পুলিশকে সরকার টিকিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, সেখানে তার পক্ষে জনগণের সেবা করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। এর মধ্যেই ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অপকর্মে অনেক পুলিশকে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের একটি শ্রেণীর এই অপরাধ প্রবণতা ও প্রশ্রয়ের কারণে মাদক চোরাকারবারিরা দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে। বিগত একযুগে দেশে বানের পানির মতো যেভাবে ইয়াবা প্রবেশ করেছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। চোরাকারবারিদের কাছে ইয়াবা হয়ে উঠেছে হিরার মতো দামী। ফলে এই কারবারের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিসহ কুলি-মজুর পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহে একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়াবা চোরাকারবারিদের কাছে আলাদিনের চেরাগে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ে কোটিপতি হওয়া যায়। ইয়াবা চোরাচালান করে অল্পদিনেই বাসের এক হেলপার কোটিপতি হয়ে গেছে। ফুটপাতের দোকানীও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। কক্সবাজারের ক্ষমতাসীন দলের সাবেক এক জনপ্রতিনিধি তো ইয়াবার গডফাদার হয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, মাদক ব্যবসার সাথে যারা জড়িত এবং কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে পুলিশ তাদের টিকিটি পর্যন্ত ধরতে পারছে না। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে বাহক বা ছোটখাটো মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে ক্রসফায়ারে দিতে দেখা যায়। এতে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করা মাদকের বাজারে কোনো প্রভাবই পড়ে না। এখন দেখা যাচ্ছে, ইয়াবার চেয়েও ভয়ংকর মাদকের নতুন সংস্করণ এলএসডি বিস্তার লাভ করছে। এটা ভয়ংকর এ কারণে যে, এর সেবনে হ্যালুসিনেশন হয়। প্রচন্ড উত্তেজনার সাথে চিন্তা, অনুভূতি ও পারিপার্শ্বিক চেতনা পরিবর্তন করে দেয়। অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আত্মহনন বা অন্যকে আক্রমণে উদ্ধত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রটি যে আত্মহত্যা করেছে তা এলএসডির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেই। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তারের পাশাপাশি সমাজের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। উঠতি বয়সী কিশোররা দল বেঁধে পাড়া-মহল্লায় দাবড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের পেছনে শক্তি হিসেবে কাজ করছে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গডফাদার। দূরন্ত এই কিশোরদের ব্যবহার করে খুন, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। দেখা যাচ্ছে, কিশোর গ্যাং এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

চার.
মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় হওয়ার বিকল্প নেই। তবে এর যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং এর সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীসহ প্রভাবশালীরা জড়িয়ে যে দুর্ভেদ্য দেয়াল সৃষ্টি করেছে, তা ভেদ করা সহজ কাজ নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই কঠিন কাজটি করার জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা এবং কঠোর অবস্থান থাকা বাঞ্চনীয়। মাদক নির্মূলকে সরকারকে তার এজেন্ডা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাদক চোরাকারবারির সাথে যারা এবং যত ক্ষমতাশালী জড়িত থাকুক না কেন তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে মেক্সিকোর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মেক্সিকোতে মাদক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট ভয়ংকর শক্তিশালী হওয়ায় তাদের দমন করতে সরকার ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনী নামিয়েছিল। মাদক সিন্ডিকেট কবলিত এলাকা মুক্ত করতে ২০০৬ সাল থেকে সেনাবাহিনী অভিযান শুরু করে। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়। এতে মেক্সিকোর মাদক চোরাচালান অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ দেশটি মাদকের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছিল। আমাদের দেশে মাদকের বিস্তার এবং তা নিয়ন্ত্রণে সাঁড়াশি অভিযান চালানো প্রয়োজন। তা নাহলে, এর বিস্তার যেভাবে পুরো দেশ গ্রাস করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের অভিভাবক শ্রেণীরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের সচেতন ও সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, অনেক অভিভাবক জানেন না তার সন্তান কখন কিভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। যখন জানতে পারেন, তখন কিছুই করার থাকছে না। এটা যে পরিবারের জন্য কত বড় দুঃখ ও কষ্টের তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদকাসক্তি করোনার মতোই ছোঁয়াছে। একজন থেকে আরেক জনের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এভাবে পুরো দেশে তা ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকের এই সংক্রমণ থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে অভিভাবক শ্রেণীর সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। তাদের খেয়াল রাখতে হবে, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, বাসায় কখন ফিরছে, কাদের সঙ্গে মিশছে এবং তার আচার-আচরণে কি পরিবর্তন হচ্ছে। সমাজের অভিভাবক শ্রেণীকেও একইভাবে এলাকার তরুণ প্রজন্মের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক এই সচেতনতা মাদক কিংবা কিশোর গ্যাং তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, সন্তানের মাস্তানী করা কিংবা সন্ত্রাসী হয়ে শক্তি প্রদর্শন কোনো গৌরবের বিষয় নয়। এ কেবল পরিবার ও সমাজে ধ্বংসই ডেকে আনে। সন্তানের জীবনও বিপন্ন হয়। সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও দায়িত্ব রয়েছে। কেবল অপরাধী ধরা তার কাজ নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার তরুণ প্রজন্মের গতি-প্রকৃতি অনুধাবন করে এবং জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবক শ্রেণীর সাথে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে সবসময় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এলাকায় নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক নয় পুরোপুরি সমাজকর্ম হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং এর ক্ষতিকর দিক থেকে সন্তানদের ফিরিয়ে রাখতে পরিবারের অভিভাবকদের মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের চিরায়ত পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহমর্মীতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে মসজিদের ইমামদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। জুমার নামাজের খুৎবায় মাদক ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিতে হবে। ইসলামের শান্তি, শৃঙ্খলা ও সাম্যবাদ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিস্তৃত করতে হবে। সরকারের উচিৎ শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মানুষের মানবিকতা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতার উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করা। পাঠ্যপুস্তকে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ধারায় ধাবিত করা।
[email protected]



 

Show all comments
  • salekbepari ৬ জুন, ২০২১, ১০:০২ এএম says : 0
    খুব সুন্দর লেখা সব পত্রিকায় এ রকম কলাম নিয়মিত লেখা উচিত।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মাদকাসক্ত

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন