Inqilab Logo

বুধবার, ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৪ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

প্রস্তাবিত বাজেটে নেই কোন ‘উইকনেস’

ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রীর ২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় কমিটিতে ১১ প্রস্তাব অনুমোদন : বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১০ জুন, ২০২১, ১২:০০ এএম

একাধিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সমালোচনা করলেও আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো দুর্বলতা দেখছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ‘২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোন উইকনেস নেই’ এমন দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি কোন পার্টিকুলার সিগমেন্ট উল্লেখ করতে চাই না। বাজেটটি যখন বাস্তবায়ন শুরু হবে, তখন আমরা দেখবো কারা বেনিফিশিয়ারি। উপকারভোগী কারা আমরা সেটি জানতে পারব। যাদেরকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তাদেরকে কভার করার জন্যই আমরা এবারের বাজেট সাজিয়েছি। আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে, নিম্ন আয়ের মানুষদের যদি আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারি এবং অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসতে পারি তাহলে আগামীতে আমাদের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে। এই নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি এবং সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। ‘করোনা পরিস্থিতিতে আড়াই কোটির মতো নতুন দরিদ্র হয়েছে’ Ñবিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার এ ধরনের গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সরকারের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আছে, তারা এগুলো দেখবে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য পাওয়ার আগে কারো তথ্য গ্রহণ করতে পারি না।
অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রথমে আমাকে বলতে হবে কোন্ কোন্ জায়গায় আপনারা ব্যত্যয় দেখেছেন। পুরো তালিকা আমাকে দিতে হবে। সেগুলো দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ‘আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে’ সদ্য প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ এ পূর্বাভাসের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রথমে দেখতে হবে বিশ্বব্যাংক যা বলে এখন পর্যন্ত সেটা ঠিক হয়েছে কি না। যদি কিছু প্লাস-মাইনাসও হয়, তারপরও আমরা সেখানে মিল খুঁজে পাই না। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছর সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব প্রজেকশন আছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে পারব। এখন চলতি অর্থবছরে যেটি আছে, আমরা সেখানে প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলেছি। অর্থবছরের শেষ দিকে মে-জুন মাসে সামষ্টিক অর্থনীতির গতিধারা যেভাবে পজেটিভলি টার্নওভার করেছে, আমরা বিশ্বাস করি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ১ এর উপরে আমরা অর্জন করতে পারব। এই অর্জনটি দক্ষিণ এশিয়ার সবার ওপরে হবে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার, আপনারা দেখবেন ঠিক হয় কি না।
চীন থেকে সময় মতো ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে কি না Ñজানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এ বিষয়টি সভায় আলোচনা হয়নি। সঙ্গত কারণেই আমি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারি না। এ বিষয়ে জানতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য পেতে পারেন।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে এনজিওদের মাধ্যমে ১ লাখ শিশুকে ৬ মাস মেয়াদি উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ৪ মাস মেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ১১টি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে ‘সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’। এর মধ্যে ইতোপূর্বে অনুমোদিত ৫টি ক্রয় প্রস্তাবের ব্যয় বৃদ্ধির (ভেরিয়েশন) প্রস্তাবও রয়েছে। পাঁচটি পুরনো প্রস্তাবে অতিরিক্ত ব্যয়সহ নতুন ৬টি প্রস্তাবে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৩০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা।
বৈঠক শেষে অতিরিক্ত সচিব শামসুল আরেফিন এক ভার্চুয়াল ব্রিফিং-এ সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে এনজিওদের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন (৪র্থ পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ শিশুকে ৬ মাস মেয়াদি উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ৪ মাস মেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদানের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ৭৫৭টি এনজিও’র কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া যায়। এদের মধ্য থেকে ১১২টি এনজিও-কে মনোনীত করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১৬০ কোটি টাকা।
তিনি জানান, বৈঠকে ‘সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২’-এর আওতায় ‘এলেঙ্গা-হাটিকামরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের দুটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়নে দুটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজ নং ডব্লিউপি-১৩-এর আওতায় হাটিকামরুল ইন্টারচেইঞ্জ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড’-কে মনোনীত করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৭৪৩ কোটি ২৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে প্যাকেজ নং ডব্লিউপি-০৫-এর পূর্ত কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণে ‘আবদুল মোনেম লিমিটেড’-কে মনোনীত করা হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৬০১ কোটি ১০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।

অতিরিক্ত সচিব জানান, বৈঠকে ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ প্রকল্পের প্যাকেজ-৩.১-এর আওতায় ‘রামপুরা থেকে ভাটারা হয়ে এয়ারপোর্ট রোড, উত্তরা, গুলশান, বনানী, কচুক্ষেত পর্যন্ত’ ২৫ কিলোমিটার পরিশোধিত পানির ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপনের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ কাজটি পেয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘চায়না জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’। এতে ব্যয় হবে ৫৮৯ কোটি ৩১ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
শামসুল আরেফিন জানান, বৈঠকে ‘গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং-পিডব্লিউ-০১-এর পূর্ত কাজ সম্পাদনে ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’-কে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৩০১ কোটি ৩৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা।
অতিরিক্ত সচিব জানান, এছাড়া বৈঠকে ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার’-এর জন্য ১টি ‘ভেহিকেল মাউন্টেড মোবাইল ইন্টারসেপ্টর অ্যান্ড রিলেটেড সার্ভিসেস’ ক্রয়ের লক্ষ্যে ‘সীমিত দরপত্র পদ্ধতি’-তে সুইজারল্যান্ডের ‘তরু গ্রুপ লিমিটেড’-কে মনোনীত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লোকাল এজেন্ট হচ্ছে ঢাকার ‘স্মার্ট এসসিএম সলিউশন’। এতে ব্যয় হবে ৬৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তিনি জানান, অন্যান্যের মধ্যে বৈঠকে ইতোপূর্বে অনুমোদিত ৫টি ক্রয় প্রস্তাবের সংশোধিত ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতাধীন প্যাকেজগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত কাজ যুক্ত হওয়ায় সবকটি প্রস্তাবেই ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ ৩৯ মাস বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যয় বাড়ছে ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মূল চুক্তিমূল্য ছিল ১৯ কোটি ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এ কাজের যৌথ পরামর্শক হচ্ছেÑ ‘কুনহুয়া-ডিডিসি-এফসিইএ’ ও ‘ভারনাকুলার কনসালটেন্ট লিমিটেড’।
অতিরিক্ত সচিব শামসুল আরেফিন জানান, ‘দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার গৌরিপুর নামক স্থানে খরা মৌসুমে সম্পূরক সেচ প্রদানের লক্ষ্যে পুনর্ভরা নদীর উপর সমন্বিত পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং-ডিডব্লিউসিএস-০১-এর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ছে ১২ কোটি ৫ লাখ টাকা। এ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। কাজটির মূল চুক্তিমূল্য ছিল ৪৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

তিনি জানান, ‘কুমিল্লা (টমছম ব্রীজ)-নোয়াখালী (বেগমগঞ্জ)’ আঞ্চলিক মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের প্যাকেজ নং পিডব্লিউ-০১-এর পূর্ত কাজ সম্পাদনে ব্যয় বাড়ছে ৪৭ কোটি ৮৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। যৌথভাবে এ কাজটি বাস্তবায়ন করছে ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। এ কাজের মূল চুক্তিমূল্য ছিল ১৯৩ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
শামসুল আরেফিন জানান, একই প্রকল্পের প্যাকেজ নং পিডব্লিউ-০৩-এর পূর্ত কাজ সম্পাদনে ব্যয় বাড়ছে ৩৯ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। যৌথভাবে এ কাজটি বাস্তবায়ন করছে ‘তাহের ব্রাদার্স লিমিটেড’ ও ‘রানা বিল্ডার্স লিমিটেড’। কাজের মূল চুক্তি মূল্য ছিল ১৯৪ কোটি ৯৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা । অতিরিক্ত সচিব জানান, এছাড়া ‘গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (সিলেট জোন)’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং ডব্লিউডি-০৫-এর পূর্ত কাজ সম্পাদনে ১৬ কোটি ৮১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয় বাড়ছে। যৌথভাবে এ প্যাকেজের কাজটি বাস্তবায়ন করছে ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘মেসার্স জন্মভমি নির্মাতা প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘ওহিদুজ্জামান চৌধুরী’। এ কাজের মূল চুক্তিমূল্য ছিল ১৮৬ কোটি ৯৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা। তিনি জানান, ক্রয় কমিটির বৈঠকের আগে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুুষ্ঠিত ‘অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’র ভার্চুয়াল বৈঠকে ‘পার্বত্য অঞ্চলের ৩টি জেলায় (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি) অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনে’ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগের একটি প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ কাজটি বাস্তবায়ন করবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বাজেট


আরও
আরও পড়ুন