Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ০৮ আষাঢ় ১৪২৮, ১০ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

বাজেট ও প্রত্যাশা

মো. মাঈন উদ্দীন | প্রকাশের সময় : ১১ জুন, ২০২১, ১২:০৫ এএম

গত বছর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বক্তৃতা শেষ করেছিলেন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা নিয়ে। আশা ছিল, মহামারী থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। কিন্তু মহামারী থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়নি। অর্থনীতি এখনো সংকটে। কাটেনি অনিশ্চয়তা। করোনা প্রথম ঢেউ থেকে এখন দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। মানুষের আয় কমে গেছে, নতুন করে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। করোনার মহামারী থেকে শীঘ্রই মুক্তি মিলছে না। করোনাকে নিয়েই জীবন ও জীবিকা চালিয়ে যেতে হবে। চলতি অর্থবছর পুরোটাই করোনার মাঝেই চলছে। আগামী অর্থবছরটিও হয়তো এভাবেই চলবে। তাই প্রস্তাবিত ২০২১-২২ বাজেটে বলা হয়েছে, ‘জীবন জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ জীবন বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে জীবিকাও। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট। বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬,০৩,৬৮১ কোটি টাকা। আয় ধরা হয়েছে ৩,৮৯,০০০ কোটি টাকা। ঘাটতি আছে ২,১৪,৬৮১ কোটি টাকা। যেখানে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গরীবের জন্য ভাতা বাড়লেও মধ্যবিত্তদের জন্য সুখবর নেই। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। বাজেটের ইতিবাচক দিক হলো, এতে কর্পোরেট কর কমানো হয়েছে আড়াই শতাংশ। শুল্ক, ভ্যাট অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাত। এখাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। ঘাটতি পূরণে দেশি উৎস থেকে কম ঋণ নিয়ে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। বিদেশি ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে আমাদের দেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। এটা বজায় রাখতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এটি অর্জন সম্ভব হওয়ার নয়। কারণ, অর্জন করতে হলে যে ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন বাজেটে তার কোনো পদক্ষেপ নেই। বিনিয়োগ না থাকলে প্রবৃদ্ধি হবে না। প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ দরকার, যা কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্তি তারল্যের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের কর সুবিধা দিলে তারা উদ্যোগী হবে, ফলে বিনিয়োগ বাড়বে, বাড়বে কর্ম সংস্থান। অর্থমন্ত্রীর এই আশা কতটুকু সফল হবে তা দেখায় বিষয়।

বাজেটে জীবন বাঁচানোর কথা, জীবিকা রক্ষার কথা বলা হলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের তেমন কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। দারিদ্র্য হ্রাস করার কথ বলা হলেও কীভাবে দারিদ্র্য হ্রাস হবে তার নির্দেশনা দেখা যায়নি। আমাদের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার বাড়বে ২৩ শতাংশ, ২০২৪ সালে দাঁড়াবে ১৭ শতাংশ। বাজেট বক্তৃতায় বলা হলো, দারিদ্র্য ১২ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অথচ সব জরিপেই দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালে দারিদ্র্যের হার ন্যূনতম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বাজেটে উত্থাপিত তথ্য এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রক্ষেপনের মধ্যে গরমিল রয়েছে। বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপির ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। টাকার অংকে এর পরিমাণ ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। করোনা মহামারী ও এখাতের অবকাঠামো গত দুর্বলতার জন্য কাক্সিক্ষত অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তির হিসাবে দেখানো হয়েছে, রাজস্ব বোর্ড থেকে আদায় করা হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত খাত থেকে পাওয়া যাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। কর ব্যতিত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেছেন, রাজস্ব ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাাকা এনবিআর আদায় করতে পারবে না। এটা অলৌকিক লক্ষ্যমাত্রা। ফলে এই খাতে ঘাটতি থেকেই যাবে। বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে।

করোনা মহামারীর মাঝে প্রস্তাবিত এ বাজেটে সবচেয়ে আলোচিত খাত হলো স্বাস্থ্য খাত। এখাতে আগামী অর্থ বছরের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ৬ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়ালে হবে না, এ খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা প্রয়োজন, যা বাজেটে উল্লেখ নেই। এখানে কাঠামোগত সমস্যা দূরীকরণে কোনো সংস্থার কর্মসূচির দিকনির্দেশনাও দেয়া হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে। প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষ টিকা পাবেন। এতে ১২ কোটি মানুষকে টিকা দিতে ২৪ কোটি ডোজ টিকা লাগবে। এজন্য এ খাতের বরাদ্দ আবশ্যই বাড়াতে হবে। বলা হয়েছে, প্রতি মাসে ২৫ লাখ লোককে টিকা দেয়া হবে তাহলে দৈনিক এক লাখের কম সে হিসাবে এ টিকা কার্যক্রম শেষ করতে প্রায় ৫/৬ বছর সময় লাগবে, যা বাস্তাবতা ও আকাক্সক্ষায় বিশাল ফারাক। চলতি অর্থ বছরে এখাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, তা খরচ হয়েছে কি না, এ টাকা থেকে কারা উপকৃত হয়েছে তা প্রস্তাবিত বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি। আগামী অর্থবছরের জন্য আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, এ টাকা কোন উৎস থেকে আসবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চলতি বছরের বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করতে পারছে না। অথচ, বহু লোক চিকিৎসার অভাবে অক্সিজেন ও আইসিইউ সংকটে মারা গেছেন। চিকিৎসার খরচ মিটাতে বহু মানুষ দরিদ্র হচ্ছে।

আমাদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো শিক্ষাখাত। প্রতি বছর এ খাতে যা বরাদ্দ দেয়া হয়, তা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী মানসম্পন্ন করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাজেট উল্লেখ নেই। প্রায় দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। গ্রামের হত দরিদ্র, মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা উপকরণ, সরঞ্জামাদির দাম কমানো, আর্থিক প্রণোদনা সহ এ খাতের ক্ষতি হতে উত্তরণের কোনো দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। উল্টো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বসানো হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ভ্যাট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদয় করবে। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর নতুন চাপ পড়বে। প্রস্তাবিত বাজেট থেকে এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা উচিত।

মানব সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অবক্ষয়িত পরিবেশ পুুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। মানুষের জীবনের সাথে পরিবেশের সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে তাই পারিবেশ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত। বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের (এসএমই) নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা হিসাবে ব্যবসার টার্নওভার ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু বাজেটে কুটির, ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতকে পুনরুজীবিত করার জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা প্রস্তাব দেয়া হয়নি। এ খাতে আগে যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল তার বাস্তবায়ন ধীর গতি ও প্রতিকার সম্পর্ক বাজেটে কোনো ব্যাখ্যা নেই। অথচ, দেশের ৮০ শতাংশ শ্রমিকই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এদেরকে ক্ষতির হাত থেকে উদ্ধারের জন্য কোনো কাঠামোগত পরিকল্পনার কথা বাজেটে থাকা প্রয়োজন।

কৃষি আমাদের অর্থনীতির সুরক্ষা কবচ। এখাতের ভুর্তকি বাড়াতে হবে। যে ভুর্তকি দেয়া হয়েছে, তার সুফল যেন কৃষকেরা পায় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। নচেৎ খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে। কৃষির উপখাত মাছ, গবাদি পশু, পোল্ট্রি খাতের প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিবন্ধকতা দূর করা উচিৎ। কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন করা উচিৎ। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক কমিশন গঠন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়, এ খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিৎ ছিল। সুবর্ণজয়ন্তির বছরে দেশের ৫০তম বাজেট কার্যকরভাবে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় ভূমিকা পালন করবে, সে প্রত্যাশা সকলের। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে একটি বাস্তবমুখী, বিনিয়োগ বান্ধব বাজেটই কাম্য।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক



 

Show all comments
  • Dadhack ১১ জুন, ২০২১, ৬:২৯ পিএম says : 0
    আল্লাহর আইন থাকলে মানুষের মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ,চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবনের সুরক্ষা মানুষ হিসাবে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকা সবি হত, যেহেতু আল্লাহর আইন নাই সেহেতু তারা নিজের ইচ্ছামত আমাদের টাকাগুলো ব্যবহার করবে আর আমরা সবসময় কষ্ট করেই মরবো.
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বাজেট


আরও
আরও পড়ুন