Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ০৮ আষাঢ় ১৪২৮, ১০ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

আত্মহত্যা জঘন্যতম মহাপাপ

সোহেল মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ১১ জুন, ২০২১, ১২:০৪ এএম

কেউ চায় না এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে। তারপরও কিছু মানুষ হতাশা, একাকিত্ব, অধৈর্য , প্রেমে ব্যর্থতা, পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করতে না পারা, পারিবারিক নানা কলহের কারণে আত্মহত্যার মতো মহাপাপ করে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। ইসলাম তথা সকল ধর্মে আত্মহত্যাকে মহাপাপ হিসেবে আখ্যারিত করেছে। আত্মহত্যা করা ইসলামি শরীয়ত অনুসারে কবীরা গুনাহ। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে মরণশীল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যবরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল-কুরআনে বলেন, ‘প্রত্যক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কােেছই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আল-আনকাবূত,২৯ঃ৫৭) । অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান আর তার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তন হবে’ (সূরা ইউনুস,১০ঃ৫৬)। উপরোক্ত আয়াত দুইটি থেকে বুঝা যায়, মৃত্যু একমাত্র আল্লাহ দান করেন। সুতরাং কেউ যদি কাজটি নিজের হাতে তুলে নেন, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই ইসলামে আত্মহত্যাকে জঘন্যতম মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। বিশেষত্ব তরণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩ টি জাতীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যমতে, সারা দেশে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন্য নারী-পুরুষ। এছাড়া আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। সামাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত¡বিদরা মনে করে আত্মহত্যা একটি সামাজিক বিষয়। প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনা সেদেশেই সমাজ,অর্থনীতি,সংস্কৃতি এবং মানুষের মনো-সামজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি।
প্রত্যেক মুসলমান মৃত্যুর পর জান্নাতে যেতে চাই। জান্নাত হচ্ছে চিরস্থায়ী শান্তির জায়গা। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করবে তার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত জন্দুব বিন আবদুল্লাহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি জখম হয়ে (অধৈর্য হয়ে) আত্মহত্যা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা আমার নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজের জীবনের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমি তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৭৫)
মানুষ মনে করে আত্মহত্যা মানে মুক্তি। আসলে তা নয় , আত্মহত্যাকারী পরকালেও কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হবে বলে আল্লাহ মহাগ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কর না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। আর যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করে আত্মহত্যা করবে তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করব। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ (সুরা : নিসা,২৯ঃ৩০)। অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘ আর তোমরা নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ ( সূরা: বাকারা, ০১ঃ১৯৫)
হযরত জাবের বিন সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়েছে, যে লোহার ফলা দ্বারা আত্মহত্যা করেছিল, ফলে তিনি তার জানাজার নামাজ আদায় করেননি।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬২৪)। এই হাদিস থেকে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা) এর মতো কোমল হৃদয়ের মানুষও আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির জানাযার নামাজ পড়ে নি। তাহলে চিন্তা করুন আত্মহত্যা কত বড় মহাপাপ !
এই পার্থিক জগৎ হলো একটি পরিক্ষার জায়গা । আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক মানুষকেই পরিক্ষা করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র আল-কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা, জ্ঞান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরিক্ষা করব।’ ( সূরা বাকার, ০১ঃ১৫৫) তবে সবার পরিক্ষার স্তর সমান নয়। আল্লাহ যাকে যেমন জ্ঞান, মেধা দিয়েছেন তাকে সে অনুপাতে পরিক্ষা করেন। আল্লাহ তা’য়ালা দেখতে চান যে তার বান্দা বিপদে তাকে স্মরণ করে কি না। বান্দা যদি বিপদে আল্লাহর নিকট সাহায্য চায় তাহলে আল্লাহ খুশি হয়ে বান্দার ওপর রহমত বর্ষণ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘ক’ের সঙ্গেই তো স্বস্তি আছে। অবশ্যই ক’ের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।’ (সুরা : ইনশিরাহ, ৯৪ঃ৫-৬)
মানুষের জীবন সুখ-দুঃখ থাকবেই। এজন্য সমসময় আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। আনন্দের সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আর দুঃখের সময় আল্লাহ কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে এবং ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কোনো অবস্থায় আল্লাহ রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। পবিত্র আল- কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সন্দেহ নেই, তিনিই ক্ষমাশীল দয়ালু।’ (সুরা জুমার, ৬২ঃ৫৩)। আল্লাহ তা’য়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : বাকারা, ১ঃ১৫৩) একবার রাসুল (সা.) আনসার সাহাবিদের কিছু লোককে বলেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে, তিনি (আল্লাহ) তাকে ধৈর্যশীলই রাখেন। আর যে অমুখাপেক্ষী হতে চায়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন। ধৈর্যের চেয়ে বেশি প্রশস্ত ও কল্যাণকর কিছু কখনো তোমাদের দান করা হবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৭০)। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ঠ।
যাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয় তাদের মনে হয় আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। মনে রাখবেন আল্লাহ সর্বদা মুমিনের পাশেই থাকেন, তাই একজন মুমিন যেকোনো পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, যাকে প্রয়োজন মাফিক রিজিক প্রদান করা হয়েছে এবং যে তাতেই পরিতু’ থাকে, সে-ই সফলকাম হয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৩৮) তাই আসুন, আমরা আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করি এবং সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা করি। পরিশেষে, আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে আত্মহত্যার মতো জঘন্যতম পাপ থেকে বিরত রাখুক এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুক। আমিন।



 

Show all comments
  • Zahangir Khan ১২ জুন, ২০২১, ৯:১৮ এএম says : 0
    Suicide is a great sin,,,,, therefore no one should commit suicide
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আত্মহত্যা


আরও
আরও পড়ুন