Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ০৮ আষাঢ় ১৪২৮, ১০ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

কেন এমন আত্মহনন

চট্টগ্রামে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যা

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ১১ জুন, ২০২১, ১২:০২ এএম

‘জীবনের সবকিছু পেয়েও পাওয়া হলো না। মা-বাবা ইহলোকে ভালো থেকো। আমি পরপারে চলে গেলাম, আমাকে ক্ষমা করিও। মা, বেঁচে থাকার কোনো সাধ আমার ছিল না, তাই আমি নিজেই নিজেকে শেষ করে দিয়েছি।’
এমন চিরকুট লিখে বিষপান করেন কলেজ ছাত্র অনিক চৌধুরী (২৩)। মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি কাঠের বাংলোর দক্ষিণ পাশে তার লাশটি পড়ে ছিল। পাশে ছিলো কীটনাশকের বোতল ও সুইসাইড নোট। পটিয়া উপজেলার বাথুয়া ইউনিয়নের দোলন চৌধুরীর ছেলে অনিক পটিয়া সরকারি কলেজে বিবিএ (সম্মান) হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ বর্ষের শিক্ষার্থী।
চট্টগ্রামে অনিকের মতো অনেকে এভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। জেলা এবং মহানগরীতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যা। পারিবারিক, দাম্পত্য কলহ ও অসন্তোষ, আর্থিক অনটন, হতাশা থেকে অনেকে আত্মহত্যা করছে। আবার মা-বাবার বকাঝকা কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া, মান-অভিমানের মত তুচ্ছ ঘটনায়ও আত্মহনন করছে অনেকে। করোনা মহামারীতে আর্থিক অনটন বেড়ে যাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনাও বাড়ছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
দরিদ্রের বস্তি থেকে শুরু করে ধনাঢ্য পরিবারের ব্যক্তিরাও আত্মহত্যা করছেন। থানা-পুলিশের খাতায় আত্মহত্যার ঘটনার সঠিক কোন রেকর্ড নেই। তবে জেলা এবং মহানগরীতে বছরে তিন শতাধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। প্রতিদিনই মিলছে আত্মহত্যার খবর। বিষপান কিংবা ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেড়েই চলেছে স্বজনদের হাহাকার।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হতাশার কারণে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার পারিবারিক কলহে হত্যার ঘটনাকেও আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি একটি মানসিক রোগ। ব্যর্থতা এবং হতাশার কারণে জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এজন্য পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবও কম দায়ী নয়।
সম্প্রতি নগরীতে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। ৩ জুন বাকলিয়া কল্পলোক আবাসিক এলাকায় স্বামীর সাথে ঝগড়ার পর গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ শিরীন বেগম (২৯)। একইদিন নগরীর কলসি দীঘির পাড়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে কিশোরী মনি আক্তার। এক যুবকের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। ঘটনা জানতে পেরে বড় ভাই ওই যুবককে ফোন করে বকাঝকা করেন। আর তাতেই নিজেকে শেষ করে দেয় ওই কিশোরী।
একইদিন রাতে নগরীর আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে জিহাদী হাসান নামে এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মচারী। যশোরের বেনাপোলে গ্রামের বাড়িতে এক যুবতীর সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক। অফিস থেকে ফিরে টেলিফোনে প্রেমিকার সাথে ঝগড়া হয়। এরপর ফাঁসিতে ঝুলে পড়ে জিহাদী হাসান। ১ জুন সীতাকুন্ডের জাফরাবাদে ওড়না পেচিয়ে লিজা আক্তার নামে এক কলেজ ছাত্রী আত্মহত্যা করে। অভাবের তাড়নায়ও আত্মহত্যা করছেন অনেকে। গত ২৪ মে ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে না পেরে নগরীর ইপিজেড থানার মাইলের মাথা এলাকায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন মো. শাহীন (৪২) নামে এক ব্যক্তি।
করোনায় চাকরি হারিয়ে বেকার হন আকবরশাহ এলাকার যুবক আবদুর রশিদ। এ নিয়ে মায়ের সাথে প্রায় তার ঝগড়া হত। তার মা দোকান থেকে বিষ কিনে এনে বাসায় রাখেন। ঝগড়ার সময় ছেলেকে বলতেন সংসার আর চালাতে পারছিনা। এ বিষ খেয়ে একদিন আত্মহত্যা করব। মায়ের অগোচরে বিষপান করে আত্মহত্যা করে আবদুর রশিদ। পারিবারিক অশান্তিতেও গলায় ফাঁস দিচ্ছেন অনেকে। গত ২১ মে নগরীর বন্দর এলাকায় মো. জসিম উদ্দিন (৪২) নামে এক চা দোকানী আত্মহত্যা করেন। অভাব-অনটনের সংসারে স্ত্রীর সাথে প্রায় তার ঝগড়া হত। করোনায় চাকরি হারিয়ে চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েন মুকুন্দু বড়–য়া। কন্যা টুকু বড়–য়া (১৪) ও নিশু বড়–য়াকে (১০) বিষ খাইয়ে হত্যার পর নিজেও বিষপান করেন। গত বছরের ৩০ জুন পটিয়ায় ঘটে এ ঘটনা।
গত ৭ এপ্রিল নগরীর হিলভিউ আবাসিক এলাকার নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল মোরশেদ চৌধুরী। এ ঘটনায় তার স্ত্রী ইরশাত চৌধুরী আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেন। নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করছিলেন মোরশেদ চৌধুরী। ওই ব্যবসার লাভের টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করেন।
পরকীয়ায় দাম্পত্য জীবনে কলহের জেরেও আত্মহত্যা করছেন কেউ কেউ। স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্কের জেরে নিজের শরীরে ইনজেকশানের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করে আত্মহত্যা করেন চমেক হাসপাতালের তরুণ চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশ। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিতে না যাওয়ায় ছেলে মাহীনকে (১৯) বকাঝকা করেন নগরীর খুলশী থানার এসআই মহিন উদ্দিন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বাবার পিস্তল মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন মাহীন।
বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়না। থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়। এ ধরনের মামলার তদন্ত বেশিদূর যায় না। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক সচেতনার মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধ সম্ভব। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হতাশা থেকে আত্মহত্যার পাশাপাশি প্ররোচনার কারণেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় মামলা এবং সঠিক তদন্ত হলে অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসবে। তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমে যাবে।
চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আনিসুল ইসলাম বলেন, সামান্য ঘটনায় জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার মত ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেন। পারিবারিক এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এ থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় করা। সমস্যা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করা। আত্মহত্যা যে কোন সমাধান না তা উপলবিদ্ধ করতে হবে। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আলকাদেরী বলেন, আত্মহত্যা মহাপাপ। আত্মহত্যাকারীরা কবীরা গোনাহের ভাগিদার হবেন।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আত্মহত্যা


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ