Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৩ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

কোটি টাকা লুটপাট

ঝিনাইদহে কর্মসৃজন প্রকল্প শ্রমিকের তালিকায় প্রবাসী-স্বচ্ছল ব্যক্তি, চেক বইয়ে আগাম স্বাক্ষর

শিহাব মল্লিক শৈলকুপা (ঝিনাইদহ) থেকে : | প্রকাশের সময় : ১৪ জুন, ২০২১, ১২:০১ এএম

কর্মসৃজন প্রকল্পটি অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নেয়া হলেও ঝিনাইদহে এ কর্মসূচি শ্রমিকের তালিকায় রয়েছে তালিকায় প্রবাসী-স্বচ্ছল ব্যক্তিরা। এ সকল ব্যক্তিরা কেউ চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, আবার কেউ কেউ চেয়ারম্যান- ইউপি সদস্যের আপনজন।

অভিযোগে জানা গেছে, বছরের পর বছর তাদের নামে নিয়মিত টাকাও তোলা হচ্ছে। সরকারের অন্যতম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির নামে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা লুটপাট চলছে এ প্রকল্পে। চলতি বছর সবচেয়ে বেশি লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলায়।
তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে কর্মসৃজন প্রকল্পের নামে সরকারের অর্থ লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। হরিণাকুন্ডু উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রথম দফায় ৮০ দিনের কর্মসূচির জন্য ৪৮টি প্রকল্পের অনুক‚লে ১ হাজার ২১২ জন শ্রমিকের দিন হাজিরার মজুরি বাবদ ১ কোটি ৯৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে মান্দিয়া গ্রামের রইচ উদ্দিন থাকেন সউদীতে। খাতায় রঘুনাথপুর ইউনিয়নের মাঠ আন্দুলিয়া মাঠের পাকা ড্রেন সংস্কার প্রকল্পের তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের সর্দার সে। চরপাড়া গ্রামের মিল্টন হোসেন তথ্য সেবায় কাজ করে। একই গ্রামের মামুনুর রশিদ ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকে চাকরি করে। আবদুল হাকিম দর্জি, মতিয়ার রহমান বিত্তশালী মানুষ। চরপাড়া বাজারের নরসুন্দর শ্রী স্বপন কুমার দাস, আবদুল লতিফ রাজধানীতে বসবাস করে, দোকানদার মিরাজ উদ্দিন, ভাংড়ি ব্যবসায়ী নায়েব আলী, এনামুল হক গ্রামের পশু চিকিৎসক, সাইদ হাসান রনি ও সাগর হোসেন চাকরি করে, সুশান্ত কুমার ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার, মহিউদ্দিন মেকানিক, রাশিদুল ইসলাম চায়ের দোকানদার।

রঘুনাথপুর ইউনিয়নের সাবেক নিত্যানন্দপুর গ্রামের শরিফ আল আমীন জেলা শহরে পাকাবাড়িতে বসবাস করে। চরপাড়া গ্রামের পায়রা খাতুনের নাম কর্মসৃজন প্রকল্পে রয়েছে। তবে এ খবর জানা নেই তার। মুলতোলা গ্রামের মর্জিনা খাতুন এলজিইডির এমআরপি প্রকল্পের শ্রমিক। কর্মসৃজন প্রকল্পের তালিকাতেও নাম রয়েছে তার। এমন অসংখ্য নারী-পুরুষের কাজই করতে হয় না। কর্মসৃজনের প্রকল্পের তালিকাভুক্ত শ্রমিক আনোয়ারা খাতুন (৫০) অভিযোগ করেন, গদ সপ্তাহে মেম্বর তার কাছ থেকে সাতশ টাকা জোর করে কেটে নিয়েছে। তার স্বামী মজিবর পঙ্গু, হরিণাকুন্ডু উপজেলার ৭নং রঘুনাথ ইউনিয়নের কালাপাড়িয়া আবাসনে থাকেন তারা। একই আবাসনের রঙ্গিলা খাতুন (স্বামী মৃত ইসমাইল) আজও কানাকড়িও পাননি। উপজেলার চর-আড়ুয়াকান্দি গ্রামের শ্রবণপ্রতিবন্ধী সাজ্জাত হোসেন অসুস্থ হয়ে বাড়িতে থাকেন। কয়েক দিন আগে গ্রামের তপছেরের ছেলে সাহেব আলী পাঁচশ টাকা দেওয়ার কথা বলে ব্যাংকের চেক বইয়ে টিপসই নিয়ে গেছে। উপজেলার মাঠ আন্দুলিয়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্র রতন কুমার দাসের বাবা প্রদীপ কুমার দাস কর্মসৃজন প্রকল্পের একজন তালিকাভুক্ত শ্রমিক। বাবার পরিবর্তে কাজ করতে হয় তাকে। কালাপাড়িয়া আবাসনের বাসিন্দা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আরিফুল ইসলামও অসুস্থ মা আকলিমা খাতুনের পরিবর্তে কাজ করে।

ব্যাংকের দেওয়া তথ্যমতে, সপ্তাহে ৫ দিনে এক হাজার টাকা করে ৪০ দিনে আট হাজার টাকা মজুরি পান শ্রমিকরা। সর্বমোট ৮০ দিনে পান ১৬ হাজার টাকা। প্রল্পের সরদারের মজুরি প্রতিদিন ২৫০ টাকা করে সপ্তাহে ১২০০ টাকা। জানা গেছে, হরিণাকুন্ডু উপজেলার ৭নং রঘুনাথ ইউনিয়নে দ্বিতীয় ধাপে ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা। প্রতিটি প্রকল্পে ৫৮ জন করে ১৭৪ জন শ্রমিকের নাম তালিকায় রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল কুদ্দুস বলেন, গরিব মানুষের হিসাব বোধ নেই। ওরা মিথ্যে কথা বলে। কাজ না করে টাকা নেয়। আমার সামনে কেউ কথা বলতে পারবে না। একই ইউনিয়নের হাসেম আলী ইউপি সদস্য হওয়ার সুবাদে একটি প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত সব শ্রমিক কাজ করে না। বৃষ্টির কারণে প্রকল্পের কাজ হয়নি। হরিণাকুন্ডু উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের ওয়ার্ড মেম্বর সোহরাব হোসেন ওরফে সাহেব আলী অন্য একটি প্রকল্প কমিটির সভাপতি। স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্মাণাধীন সড়কের পাশে ফেলে রাখা ইটের খোয়া দিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার রাস্তা তৈরি করছেন। কাজটি করে দিচ্ছেন কর্মসৃজন কর্মসূচির ২৫ জন শ্রমিক। কথা হয়, ওই সব শ্রমিকের সঙ্গে। তারা জানায়, গ্রামের ওমর আলীর বাড়ি থেকে খালপাড় অভিমুখে রাস্তা মাটি দিয়ে সংস্কার করার কথা তাদের। এরা স্বীকার করেছেন যে ৩ দিন তারা মৎস্য বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পে কাজ করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাকিবুল হাসান রাসেলের নির্দেশে ৩০ জন শ্রমিক ওই ৩ দিন গ্রামের একটি সরকারি পুকুরে মাটি কেটেছেন বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন এই ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন। অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান রাকিবুল হাসান রাসেল জানান, তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য মিথ্যে বানোয়াট অভিযোগ করা হয়েছে। হরিণাকুন্ডু উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মুহাম্মদ জামাল হুসাইন বলেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সুপারভাইজার) হাবিবুর রহমান বলেন, তালিকাভুক্ত সব শ্রমিক কাজ করে না, এমন অভিযোগ নেই। তবে সব সময় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না। সার্বিক বিষয়ে হরিণাকুন্ডু উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দা নাফিস সুলতান বুধবার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করার জন্য নির্দেশ দেন।

একই অভিযোগ কালীগঞ্জ ও শৈলকুপা উপজেলায়ও। যেখানে করোনা মহামারির মধ্যে প্রথম ধাপে কাজের কাজ না হলেও ব্যাংক থেকে দিন হাজিরার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, খাতা ও মাস্টার রোলে টিপ সই দেখানো হয়েছে। ওই টিপ সই প্রকৃত শ্রমিকই দিয়েছেন কিনা তা যাচাই করা যায়নি। তবে শ্রমিকের চেক বইয়ে আগাম স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, এমন প্রমান মিলেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে টাকা তুলছেন অন্য কেউ! কালীগঞ্জ ও শৈলকুপা উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ-হেল-আল-মাসুদ বলেন, তালিকাভুক্ত শ্রমিক নিজের টাকা অন্যকে দিয়ে দিলে আমার কিছুই করার থাকে না। সপ্তাহে দু-একদিন কর্মসৃজনের কাজ পরিদর্শন করা হয়েছে এবং সঠিকভাবে কাজ হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ