Inqilab Logo

সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮, ২২ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

স্থায়ী দখল উচ্ছেদ ও পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থার সংস্কার জোরদার করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৮ জুন, ২০২১, ১২:০৮ এএম

বর্ষাকাল শুরুর আগেই একদিনে কয়েক ঘন্টার বৃষ্টিতে ঢাকার অধিকাংশ এলাকার রাস্তা হাটুপানিতে তলিয়ে যাওয়ার সাম্প্রতিক চিত্রটি ছিল ভয়াবহ। এটি কোনো নতুন অভিজ্ঞতা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ অবস্থা চলছে। ঢাকার যানজট ও পানিবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপরিসীম অপচয় হলেও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। নগরীর পানিবদ্ধতা নিরসনে পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়ণের পাশাপাশি চারপাশের নদী, পুরনো খাল এবং নিম্নভ‚মি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের উপর জোর দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। এ লক্ষ্যে গত দেড় দশকে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণ ও দখল উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বেশকিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়ণের উদ্যোগও দেখা গেছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কদিনের মধ্যে পুরনো দখলদার বা নতুন কোনো প্রভাবশালী নতুনভাবে দখল ও ভরাট করে নিয়েছে নদী, খাল বা নিম্নভূমি। এভাবেই কয়েক দশকে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা শহরকে গ্রিনসিটি, ক্লিনসিটি, তিলোত্তমা ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিসিক্ত করে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতারা মেয়র নির্বাচিত হলেও শহরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

অপরিকল্পিতভাবে এবং সরকার ও প্রশাসনিক সমর্থনে বেড়ে চলেছে ঢাকার আয়তন ও লোকসংখ্যা। নদী-খাল দখল ও নিম্নভূমি ভরাটের কুফল ক্রমেই জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে। নগরবাসির দুর্ভোগ কমিয়ে আনা এবং নাগরিকদের কাছে সেবা আরো সহজলভ্য করার কথা বলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দুইভাগ করা হয়েছিল। সেই থেকে জনদুর্ভোগ ক্রমেই দুর্বিসহ করে তোলা হচ্ছে। দক্ষিণ সিটির ডিএনডি বাঁধ এলাকার পানিবদ্ধতার সংকট কয়েক দশকেও নিরসন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এখন ঢাকার নতুন নতুন এলাকা এমন সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেশকিছু এলাকার রাস্তা ও বসতবাড়ির নিচতলা প্রায় একমাস ধরে ময়লা পানিতে তলিয়ে আছে। গতমাসের শেষদিকে এবং জুৃনের প্রথম সপ্তাহের বৃষ্টিতে আবদ্ধ পানি আর নিষ্কাশিত হয়নি। উত্তরের মেয়র এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ঢাকায় সমন্বিত ও পরিপূর্ণ আধুনিক পয়:নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকা এবং বেআইনীভাবে খাল ও নিম্নভূমি ভরাটের মাধ্যমে পুরনো প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা ও চ্যানেলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরের প্রান্তিক এলাকায় এমন দীর্ঘস্থায়ী পানিবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। শহরের বেশকিছু এলাকার বাসিন্দারা মাসের পর মাস ধরে রাস্তায় হাঁটুসমান ময়লাপানি ডিঙিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। রফতানি ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ ও আশুলিয়ার বেশকিছু এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতে সারাবছর পানিবদ্ধতা লেগে থাকছে। ক্রমবর্ধমান ঢাকার বর্ধিষ্ণু এলাকা আশুলিয়া একসময় খাল ও জলাভূমি ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল। অপরিকল্পিত শিল্পায়ণ ও নগরায়ণে খাল ও জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে আশুলিয়ায় পানিবদ্ধতার নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এভাবেই ঢাকার পাশাপাশি আশপাশের এলাকাগুলোও বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে আবারো বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে রাজধানীর হাজারিবাগ, কামরাঙ্গিরচর সহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান শুরু করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। আদালতের নির্দেশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীতে দখলদার উচ্ছেদে এর আগেও বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। নদীর সীমানা নির্ধারণের পেছনেও শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। সে সব অভিযানের স্থায়ী ও বাস্তব কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। এর কারণ হচ্ছে উচ্ছেদ করার পর তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ, সংস্কার ও সুরক্ষার কোনো কার্যকর উদ্যোগ ছিল না। এ কারণে এ খাতে ব্যয়িত শত শত কোটি টাকা আদতে জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। এসব লোকদেখানো তৎপরতা জনগণের ট্যাক্সের টাকার বেহিসাবি অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। জনভোগান্তি এবং ঢাকার মর্যাদা রক্ষার্থে বিভিন্ন সময়ে পেশাজীবী ও সচেতন মহল হাইকোর্টে রিট করেছেন। এসব রিটের শুনানিতে আদালত নতুন নতুন পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা জারি করেছে। সে সব নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো যদি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হতো তাহলেও ঢাকার জনদুর্ভোগ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। রাজধানীর পয়:নিষ্কাশন ও বর্জ্যব্যবস্থাপনায় নগর কর্তৃপক্ষের সীমাহীন ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ৫ বছর আগের এক রিটের নির্দেশনার অগ্রগতি জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। গত বুধবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মোহাম্মদ রাশেদ জাহাঙ্গিরের ডিভিশন বেঞ্চ ঢাকার ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংস্কার ও অগ্রগতির রিপোর্ট জমাদিতে দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের দুই সপ্তাহের সময় দিয়েছেন। জনস্বার্থে আদালত একের পর এক নির্দেশনা জারি করলেও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে অবস্থার বাস্তব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যে সব নিম্নভূমি, খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণে শহরের নতুন নতুন এলাকায় পানিবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে সে সব প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর অব্যাহত শিল্পদূষণ বন্ধের জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। শহর- জনপদের বাসযোগ্যতা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব কোনো কাজে আসবে না।

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা
আরও পড়ুন