Inqilab Logo

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮, ১৭ সফর ১৪৪৩ হিজরী

তিস্তা চরের সবুজ বিপ্লব

মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলের ভাগ্য বদল : স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি

হালিম আনছারী, রংপুর থেকে | প্রকাশের সময় : ২৩ জুন, ২০২১, ১২:০০ এএম

এক সময় মাছই ছিল তিস্তা চরের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা। মাছ ছাড়া জীবিকার কোনো পথ ছিল না। তবে কেউ কেউ মাছ ধরার পাশাপাশি আখ, তামাক এবং ধান আবাদ করে সংসারের চাহিদা মেটাত। এখন সেই চরের জমি আর পতিত নেই। তামাক চাষ ক্ষতিকর এবং অলাভজনক হওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে পাল্টে গেছে চরের দৃশ্যপট। তিস্তার বালুচর এখন আর অভিশাপ নয়। বছরজুড়েই এখানে ৩৩ প্রকার ফসলের আবাদ হচ্ছে। তিস্তার চর এখন পরিণত হয়েছে শস্যভাণ্ডারে। ভাগ্য বদলে গেছে চরবাসীর। মঙ্গাপীড়িত চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই এখন ভুট্টা ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছে। নিজের খাওয়া যোগাড় করতে যারা হিমশিম খেত বর্তমানে তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রংপুর বিভাগের আট জেলার মোট চরের সংখ্যা প্রায় ৬’শ। এসব চরে মোট জমির পরিমাণ ৭৭ হাজার ৫৭৫ হেক্টর। এরমধ্যে আবাদযোগ্য চরের সংখ্যা ৫’শ ৬৮টি। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৫৮ হাজার ৬’শ ৭১ হেক্টর।
সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলার কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া, পীরগাছা উপজেলায় চরের সংখ্যা হচ্ছে ৯৫টি। মোট জমির পরিমাণ ৮ হাজার ৬০২ হেক্টর। আবাদযোগ্য চর হচ্ছে ৭৮টি। জমির পরিমাণ ৬ হাজার ৭৫৮ হেক্টর। গাইবান্ধা জেলায় চরের সংখ্যা হচ্ছে ১শ’ ৮১টি। যার সবই আবাদযোগ্য। এসব চরে মোট জমির পরিমাণ ২৭ হাজার ২শ’ ৯১ হেক্টর।
কুড়িগ্রাম জেলায় চরের সংখ্যা হচ্ছে ২শ’ ৬৫টি। মোট জমির পরিমাণ ২৯ হাজার ৯শ’ ৬৭ হেক্টর। আবাদযোগ্য চর হচ্ছে ২শ’ ৩১টি। জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৬শ’ ৬৫ হেক্টর।
লালমনিরহাট জেলায় ৬০টি চরের মধ্যে সবই আবাদযোগ্য। মোট জমির পরিমাণ ৯ হাজার ৪শ’ ৬৫ হেক্টর।
নীলফামারী জেলায় চরের সংখ্যা হচ্ছে ২৫টি, যার সবই আবাদযোগ্য। মোট জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৪শ’ ৩৪ হেক্টর।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন তিস্তা বিধৌত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, করাল গ্রাসী তিস্তার তীরবর্তী জমিগুলোতে এখন শোভা পাচ্ছে ধান, কাঁচামরিচ, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, শসা, ঝিঙ্গা, স্কোয়াশ, ভুট্টা, পুই শাক, লাউ শাক, করলাসহ নানা ধরনের রবি শস্য।
হারাগাছ ইউনিয়নের নাজিরদহ, চর নাজিরদহ, পল্লীমারী, চর চতুরা, শহীদবাগ ইউনিয়নের চর প্রানাথ, চর বল্লভবিষু, চর সাব্দি, বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা, আরাজি হরিশ্বর, গদাই, পাঞ্জর ভাঙ্গা, ঢুষমাড়া, পূর্ব নিজপাড়া, টেপামধুপুর ইউনিয়নের চর গনাই, চর হয়বত খাঁ, চর রাজিব, চর বিশ্বনাথ, চর আজম খাঁসহ তিস্তার জেগে ওঠা চরে ভুট্টা, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঝিঙ্গাসহ কাঁচামরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে।
পীরগাছা উপজেলার চর ছাওলা, চর রহমত, চর শিবদেব, চর কাশিয়া বাড়ি, চর হাগুরিয়া হাসিম, চর তাম্বুলপুর, কান্দিনা চরে শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ধান, আলু, তামাক, ভুট্টা, কাঁচামরিচ, মিষ্টি কুমড়া, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হচ্ছে। এসব ছাড়াও অনেকেই এসব জমিতে ফলের চাষ করে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন। ফলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কাজী পেয়ারা, আপেল কুল, হাঁড়িভাঙ্গা আম অন্যতম।
এসব এলাকার কৃষকদের কথা বলে জানা যায়, নদীতে জেগে ওঠা চরসহ তীরের পতিত জমিগুলোতে সারা বছর মিলে মোট ৩৩ প্রকারের ফসল আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ভুট্টা, কাউন, মিষ্টি আলু, গোল আলু, মিষ্টি কুমড়া, গম, বাদাম, ডাল (মুগ, মশুর, মাস কালাই, খেসারি অন্যতম), মশলা জাতীয় পণ্য (পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, মৌরী অন্যতম), মরিচ, তিল, তিষি, কাউন, চিনা বাদাম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো এবং ঢেঁড়স অন্যতম।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তার চরে ভুট্টা বেশ ভালো হওয়ায় এখানকার কৃষকরা দারুন খুশি। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি বছর ভুট্টার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে চাষিরা আশাবাদী।
তামাকের জন্য রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা সুপরিচিত। তামাক ব্যবহারে মরণব্যাধি ক্যানসার, যক্ষ্মা, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের সমস্যাসহ স্বাস্থ্যের নানাবিধ রোগব্যাধি হয় জানা সত্ত্বেও এই উপজেলার কৃষকরা ব্যাপকভাবে তামাক চাষ করত। বিশেষ করে তিস্তার চরাঞ্চলগুলোতে তামাকের চাষ হতো সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু কিছুদিন ধরে সরকারি-বেসরকারিভাবে তামাকের বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি, কৃষি অধিদপ্তরের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে এ অঞ্চলের কৃষকেরা চাষাবাদে পরিবর্তন আনতে শুরু করে এবং বর্তমানে ৯৫ ভাগ কৃষকই তামাকের পরিবর্তে অন্যান্য ফসলের চাষ করে চলেছেন। বিশেষ করে ভুট্টা চাষে স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় বর্তমানে এ অঞ্চলের কৃষকেরা তামাক ছেড়ে ভুট্টা চাষেই ঝুঁকে পড়েছেন।
কৃষকরা জনান, তামাক অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং পরিশ্রম বেশি অথচ লাভ কম হওয়ায় তারা তামাক চাষ ছেড়ে দিয়ে উল্লেখিত ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন। এসব ফসল উৎপাদনে খরচও কম, পরিশ্রমও কম। ফলন বেশি হওয়ায় লাভের পরিমাণ বেশি থাকে। কিন্তু অধিকাংশ এলাকাতেই যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকার কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন তারা।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চরের পতিত জমিতে যেসব রবিশস্য ও ফসল উৎপাদিত হচ্ছে তা এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাচ্ছে। এছাড়া এসব এলাকায় উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে চরাঞ্চলের এসব পতিত জমিতে ব্যাপক ভুট্টা চাষ হচ্ছে। ফলনও বেশ হচ্ছে। রবি মওসুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং খরিফ মওসুমে তথা ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ভূট্টার বীজ বপণ করা হয়। সম্পূর্ণ শুকিয়ে কৃষকরা ফলন পায় একর প্রতি প্রায় ১২০ থেকে ১২৬ মণ। পোল্ট্রি এবং মৎস্য ও পশু সম্পদে ফিডের প্রয়োজনে ৫০শতাংশের বেশি প্রয়োজন হয় ভূট্টার। তাছাড়া তাছাড়া ভুট্টা তোলার পর এর মোচা গরুর খাদ্য এবং ভুট্টার গাছ বাড়িতে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা ও আবাদ বেড়ে চলেছে। এ কারণে দরিদ্র পীড়িত এসব এলাকার মানুষের কাছে ভুট্টা আর্শীবাদ হয়ে এসেছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: তিস্তা চরের সবুজ বিপ্লব
আরও পড়ুন