Inqilab Logo

শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২, ১৫ মাঘ ১৪২৮, ২৫ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

স্বাস্থ্যবিধিই মূল চ্যালেঞ্জ

রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট : ২১টি চূড়ান্ত  স্বাস্থ্যবিধি-সামাজিক দূরত্ব না থাকলে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ হবে : ডা. লেলিন চৌধুরী  নির্ধারিত স্থানের বাইরে হাট বসতে দেয়া হবে না : স্

মো. জাহিদুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ২৮ জুন, ২০২১, ১২:০০ এএম

করোনার ডেল্টা (ভারতীয়) ভ্যারিয়েন্ট দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এর মাঝেই বসছে কোরবানির পশুর হাট। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এবার পশুর ২১টি অস্থায়ী হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মোট ২১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১০টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বসছে ১১টি হাট। এসব হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষক, খামারি ও ব্যবসায়ীরা পশু নিয়ে আসেন, তাদের পাশাপাশি ক্রেতারাও ভিড় করেন। কিন্তু এবার এসব হাটের মাধ্যমে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। যদিও ঢাকার দুই সিটি করেপারেশনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা জানানো হয়েছে।

তবে গত বছরও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে শুরুতে তোড়জোড় দেখালেও শেষ পর্যন্ত তা মানা হয়নি। এবারও গদবাঁধা বিধিনিষেধের বাইরে যেতে পারছে না তারা। পশুর হাটে আলাদা কোনো নিয়ম থাকছে না বলে জানিয়েছেন করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এমনকি করোনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত ‘জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’র নির্দেশনার আলোকে কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপও তৈরি হয়নি। এরূপ পরিস্থিতিতে দেশে করোনার ভয়াবহ বিস্তারের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

যদিও গত সপ্তাহে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্ধারিত স্থানে কোরবানির পশুর হাট বসবে। এর বাইরে পশুর হাট বসতে দেয়া হবে না।
মন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় দেশটি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই এ বছর সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেই পশুর হাট বসানো হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ পশুর হাট বসানোর জন্য এবং পশু জবাইয়ের যে স্থান নির্ধারণ করবে, শুধু সেখানেই হাট বসবে। এর বাইরে কোরবানির পশুর হাট ও পশু জবাই করতে দেয়া হবে না।

তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এখন পর্যন্ত জারি করা কোনো লকডাউনই হয়নি প্রকৃতপক্ষে লকডাউন। লাভবান হয়নি সাধারণ মানুষ। বরং দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল। যে কয়টি জেলা থেকে রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি পশু আসে এর মধ্যেÑ চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর উল্লেখযোগ্য। এসব জেলায় করোনা সংক্রমণের ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরবানির পশুর হাটে আগের মতো ভিড় হলে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তাদের। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ সব জেলা শহরে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশুর হাটে কেনাবেচা করার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। যদিও এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই ডিএসসিসির, তবে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছে ডিএনসিসি। দুই সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকার দুই সিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিএসসিসিতে এ পর্যন্ত ১১টি দরপত্রের মধ্যে ৬টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, প্রথম পর্বে ৬টি হাট কনফার্ম করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে দরপত্রের মূল্যায়ন এখনও শেষ হয়নি। আজ মূল্যায়ন শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্র। অন্যদিকে উত্তর সিটিতে এখন পর্যন্ত ৫টি হাট চূড়ান্ত হয়েছে। বাকি ৫টিও দ্রুতই চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংল্টিষ্ট সূত্র। এগুলো বাদেও উত্তর সিটি এলাকায় গাবতলী পশুর হাট ও দক্ষিণ সিটি এলাকায় সারুলিয়া পশুর হাটেও কোরবানির পশু বেচাকেনা চলবে।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২১ জুলাই মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। করোনা মহামারির মধ্যেও গত বছর দুই সিটি করপোরেশন রাজধানীতে ২৪টি হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে করোনা সংক্রমণ বিবেচনায় এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২১ এ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির অনুমোদিত ছয়টি হাট হলোÑ হাজারীবাগ এলাকায় ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি মাঠসংলগ্ন উন্মুক্ত এলাকা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন উন্মুক্ত জায়গা, আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক-ই, এফ, জি ও এইচ সেকশন ১ ও ২-এর খালি জায়গা, গোলাপবাগ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মার্কেটের পেছনের খালি জায়গা। বাকি ৫টি হাট নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার টাকায় ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালসংলগ্ন উন্মুক্ত জায়গাটি ইজারা হয়েছে।

আর ঢাকা উত্তর সিটির অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় অবস্থিত বৃন্দাবন থেকে উত্তর দিকে বিজিএমইএ পর্যন্ত খালি জায়গা, ভাটারা (সাইদনগর) পশুর হাট, কাওলা শিয়ালডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাচল ব্রিজসংলগ্ন মস্তুল ডুমনি বাজারমুখী রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা, উত্তরখান মৈনারটেক শহীদনগর হাউজিং প্রকল্পের খালি জায়গা, বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং ব্লক-ই, সেকশন-৩-এর খালি জায়গা, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমের অংশ, ২ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমে গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের ফাঁকা জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬ ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠ। এর মধ্যে পাঁচটি চূড়ান্ত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠে কোরবানির পশুর হাট বসিয়ে সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানানো অনেকটাই অসম্ভব। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার পর এবার খোলা মাঠে গরুর হাট বসানো হলে আরো বড় সর্বনাশ হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে না পারলে করোনার সর্বনাশের ষোলোকলা পূর্ণ হবে বলে মনে হচ্ছে।

এবারের কোরবানির হাট প্রসঙ্গে উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. সেলিম রেজা ইনকিলাবকে বলেন, আমরাতো আমাদের মতো করে আগাচ্ছি। এটাতো আসলে ডিপেন্ড করে করোনা পরিস্থিতি, লকডাউন পরিস্থিতি কিভাবে সামনের দিনগুলোতে সামনে আসবে তার ওপর। তবে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানির পশুর হাট পরিচালনা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি এবং জনসমাগম থেকে দূরে, শহর থেকে একটু বাইরে, সরকারি নিয়ম মেনে আমরা হাটগুলো ইজারা দেয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া অনলাইনে কেনাকাটার প্রক্রিয়াও চালু আছে বলে জানান তিনি।
নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবং তারাই এটা রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন উত্তরের সিইও। তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখবে, তবে সিটি করপোরেশন মোবাইল কোর্ট, ভলেনটিয়ার এবং ইজারাদারদের মাধ্যমে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফরিদ আহাম্মদ ইনকিলাবকে বলেন, আমাদের সরকার থেকে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী আমরা ইজারাদারদের নির্দেশনা দিয়েছি। এর বাইরেও আমরা একটি এনজিও সংস্থা, আমাদের সাথে পার্টনারে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারাও লিফলেট বিতরণ করা, স্যানিটাইজার দেয়া, মানে তারাও এখানে কাজ করবে। আমরা যেই সরকারি সিদ্ধান্তগুলো আছে গরুর হাটের ব্যাপারে এটা আমাদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমরা কিছু নির্দেশনা পেয়েছি। আমরা ইজারাদার এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছি।

বর্তমানে ডেল্টা (ভারতীয়) ভ্যারিয়েন্ট আরো প্রকট আকার ধারণ করলে হাটের সংখ্যা কমবে কি না সে প্রসঙ্গে দক্ষিণের সিইও বলেন, আমরা এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। হাটের সংখ্যা কমালে তো আরো কনজাস্টেট বেশি হবে। বরং আমরা যদি হাটের সংখ্যা বাড়াতে পারতাম, খোলা জায়গা বেশি পেতাম; সেটা আমাদের জন্য সুবিধা হতো। কমানোর ব্যাপারে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আর সর্বশেষ শুরু হওয়ার তিনদিন আগে সরকার যদি কোনো দিকনির্দেশনা দেয়, সেটা আমরা অনুসরণ করব।

এছাড়া করোনা পরিস্থিতি যদি বেশি ঘোলাটে হয় তাহলে হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: স্বাস্থ্যবিধি

১৩ জানুয়ারি, ২০২২

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ