Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

সুইচ টিপলেই মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু

প্রকাশের সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ঢাকায় অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন ইমিগ্রেশনে কর্মীর লেভি জমা হচ্ছে
শামসুল ইসলাম : কর্তৃপক্ষ সুইচ টিপলেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হবে। সোর্স কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে নতুনভাবে কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে অনলাইন প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে অনলাইনের মাধ্যমে কর্র্মী নিয়োগের জন্য জনপ্রতি লেভির ১৮শ’ ৫০ রিংগিত করে জমা দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরলেই জনশক্তি রফতানির পর্দা উঠতে পারে। গতকাল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে এমন আভাস দেয়া হয়েছে। এদিকে, ঢাকায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অফিসে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের পাসপোর্ট ও ছবি দেদারসে জমা হচ্ছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের চাহিদার অনুকূলে লেভির অর্থ জমা দেয়া শুরু করেছে। এসব রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারীরা মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্রে সত্যায়িত করার জন্য ফাইল জমা দেয়া শুরু করছে। হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলর সায়েদুর রহমান নতুন কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্রে সত্যায়নের ফাইল সম্পর্কে দিকনির্দেশনা জানতে চেয়ে আজকালের মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির ডিজির কাছে জরুরি চিঠি দিচ্ছে। গতকাল শনিবার বিএমইটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
শ্রমবাজার চালু প্রসঙ্গে বিএমইটির মহাপরিচালক সেলিম রেজা গতকাল তার দপ্তরে ইনকিলাবের সাথে আলাপকালে বলেন, যারাই মালয়েশিয়া থেকে কর্মী নিয়োগের চাহিদা আনতে পারবে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়া হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া কোনো সিন্ডিকেট চক্রের হাতে চলে যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, কর্মী নিয়োগে কোনো সিন্ডিকেট চিনি না। মহাপরিচালক বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য সরকার ৭৪৫টি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের কাছে প্রেরণ করেছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া থেকে নিজের যোগ্যতায় কর্মী প্রেরণের চাহিদাপত্র নিয়ে আসতে সক্ষম হবে আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেবো। তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে রিক্রুটিং লাইসেন্স দেয়া হয়েছে বিদেশে কর্মী প্রেরণের জন্য। সেক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হলে কর্মী প্রেরণে কারো বাধা নেই। বিএমইটির মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণেই আজ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, অনলাইনের মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে ১০টি মেডিক্যাল সেন্টারকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার অতিসম্প্রতি ৬টি সফটওয়্যার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করেছে। ইতোমধ্যেই এসব সফটওয়্যার চালুকরণের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, এখন মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনের সুইচ টিপলেই কর্মী যাওয়া শুরু হবে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে প্রচুর বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা রয়েছে বলে বিএমইটির মহাপরিচালক বলেন, জনশক্তি রফতানির গতি দিন দিন বাড়ছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় জনশক্তি রফতানির নতুন দেশ রাশিয়া ও শ্রীলংকায়ও কর্মী নিয়োগের চাহিদা পাওয়া গেছে বলে মহাপরিচালক সেলিম রেজা উল্লেখ করেন। গত আগস্ট মাসে বিভিন্ন দেশে ৬৯ হাজার ১৯০ জন এবং গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৫৬৯ জন কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ৪ লাখ ৯০ হাজার ৪০৬ জন কর্মী বিদেশে চাকরি লাভ করেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের মার্চ মাস থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ রয়েছে। বহু কূটনৈতিক তৎপরতার পর ২০১২ সালে মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের জি টু জি প্রক্রিয়ায় শুধু প্লানটেশন খাতে সরকারি উদ্যোগে কর্মী যাওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। জি টু জি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য ঢাকঢোল পিটিয়ে দু’দফায় সারাদেশ থেকে প্রায় ২২ লাখ কর্মীর নিবন্ধন করা হয়েছিল। কিন্তু জি টু জি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে দেশটিতে জনশক্তি রফতানির সুযোগ না থাকায় মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীরা দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার পথে পা বাড়ায়। অনেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করে অকালে সাগরপথে প্রাণ হারান। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকেই মালয়েশিয়ায় যেতে না পেরে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে তাদের ভাগ্যে গণকবরে স্থান হয়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে গত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ হাজার ৮৯২ জন কর্মী জি টু জি প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় গেছেন।
বহু কূটনৈতিক তৎপরতার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রিচার্ড রায়ত জায়েম পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার জি টু জি প্লাস সমঝোতা স্মারকে সই করেন। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে জি টু জি প্লাস চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পরই মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত ঘোষণা করে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পূর্ব মালয়েশিয়ার কোতাকিনাবালু মোয়ারা তুয়াং আর্মি ক্যাম্পে সেনাকর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতো শ্রী ড. আহমদ জাহিদ হামিদী সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে অভিবাসী কর্মী নেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। ঐ সময়ে মালয়েশিয়ায় প্রফেশনাল ভিসায়ও কর্মী প্রেরণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ায় স্বল্পসংখ্যক প্রফেশনাল ভিসায় কর্মী প্রেরণ চালু হয়।
বায়রার মালয়েশিয়া জনশক্তি রফতানি সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন বে-বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আলহাজ মো: গিয়াস উদ্দিন বাবুল গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, অনলাইন প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বে-বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে দেশটির ইমিগ্রেশনে লেভি জমা দেয়ার অনুমতি দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে আলহাজ গিয়াস উদ্দিন বাবুল বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রচুর বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা রয়েছে। মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশী কর্মীদের নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহী। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশনে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের অনুমতি পেয়ে লেভিও জমা দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বায়রার সাবেক যুগ্ম সচিব-১ আলহাজ আবুল বাশার মালয়েশিয়ায় অনলাইন প্রক্রিয়ায় কর্মী প্রেরণের পথ সুগম হওয়ায় মালয়েশিয়া সরকার ও বাংলাদেশ সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি জি টু জি প্লাস প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় সকল রিক্রুটিং এজেন্সি যাতে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী প্রেরণের সুযোগ পান তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বায়রার মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন রাতে ইনকিলাবের সাথে আলাপকালে বলেন, মালয়েশিয়ায় জি টু জি প্লাস অনলাইনের মাধ্যমে নতুনভাবে কর্মী প্রেরণের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগে আর কোনো বাধা নেই। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার লক্ষ্যে মালয়েশিয়া সরকার এ যাবৎ ঢাকার ১৪টি মেডিক্যাল সেন্টারকে অনুমোদন দিয়েছে। বায়রা মহাসচিব স্বপন বলেন, যে কোনো মুহূর্তে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন থেকে কর্মী নিয়োগের অ্যাপ্রুভাল বের হয়ে যাবে। অ্যাপ্রুভাল বের হলেই কর্মী যাওয়া শুরু হয়ে যাবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে অভিবাসন ব্যয় প্রসঙ্গে বায়রা মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন বলেন, উভয় দেশের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ীই অভিবাসন ব্যয় নেয়া হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে কেউ যাতে উচ্চ হারে অভিবাসন ব্যয় নিতে না পারে সে ব্যাপারে বায়রা কর্তৃপক্ষ নজরদারি জোরদার করবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ