Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবণ ১৪২৮, ১৩ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

গণআজাবের কারণ-২

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ৯ জুলাই, ২০২১, ১২:০৪ এএম

পাপকর্ম না করেও মানুষ কীভাবে পাপ কর্মের ভাগী হয় তা তিরমিজি শরীফের বরাতে বর্ণিত একটি হাদীস হতে অবগত হওয়া যায়। হুজুর (সা.) বলেছেন: ‘এই উম্মতের শেষ যুগে মসখ হওয়া (মানুষ কুকুর ও বানর প্রভৃতি আকারে বিকৃত হওয়া) এবং কযফ হবে (আসমান হতে পাথর বর্ষিত হওয়া)।’ কেউ প্রশ্ন করল, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি এ অবস্থায় হালাক (ধ্বংস) হতে পারি, যখন আমাদের মধ্যে নেক লোকেরা (সালেহীন) থাকেন।’ হুজুর (সা.) বললেন: ‘হ্যাঁ, যখন খাবাসত এর আধিক্য হবে, অর্থাৎ মন্দ অনাচারের প্রাদুর্ভাবের সময় নেক লোকদের উপস্থিতি কালেও আজাব হতে পারে। পরস্পর নেক কাজের হুকুম করা এবং মন্দ কাজগুলো হতে বিরত রাখার কথাও বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে। তা না হলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর শাস্তি (আজাব) নাজেল করবেন। কোনো কোনো হাদীস অনুযায়ী, দোয়া করা হবে কিন্তু দোয়া কবুল হবে না। অপর এক হাদীসে আছে, যে দলে কোনো অবৈধ কাজ চালু হয় এবং তারা সে কাজ রোধ করতে সক্ষম অথচ রোধ করে না, তাহলে মৃত্যুর পূর্বেই আল্লাহ তাদের ওপর কোনো আজাব নাজেল করবেন।

একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, একবার আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরাইল (আ.) কে নির্দেশ করেন যে, ‘অমুক জনপদকে ধ্বংস করে দাও।’ তিনি আরজ করলেন, ‘সে জনপদে অমুক বান্দার অবস্থান, যে কখনো আপনার নাফরমানি করেনি।’ আল্লাহ বললেন: ‘এ কথা ঠিক, কিন্তু আমার জন্য কখনো তার কপালে বিরক্ত ও ক্ষোভের লক্ষণ দেখা যায়নি। অর্থাৎ আমার অবাধ্যগুলোকে দেখেও তার দুঃখ, ক্ষোভ হয়নি যা নিম্নতর।’ (মেশকাত)

না জায়েজ কর্মকান্ডগুলো দেখার পরও নিম্নতম যাদের দুঃখ কষ্ট হয়নি, ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির উদয় যাদের মধ্যে হয়নি, তাদের সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে। অর্থাৎ প্রতিহত করার ক্ষমতা না থাকলেও অন্তত তা দেখে অসন্তুষ্ট ও মনে মনে ঘৃণা পোষণ করা উচিত এবং এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন ও দুর্বলতম স্তর।

রসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলেছেন, ‘সেই সত্তার কসম, যার কব্জায় আমার প্রাণ! তোমরা নেক কাজের নির্দেশ করো, লোকদের মধ্যে তাবলীগ করো এবং মন্দ কাজ হতে বিরত রাখো। তা না করলে আল্লাহ তোমাদের ওপর আজাব নাজেল করবেন এবং তোমরা সে সময় দোয়াও করবে, কিন্তু দোয়া কবুল হবে না।’

‘আম’ বা গণআজাব সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘কয়েকজন লোক কোনো (নাজায়েজ) কাজ করলে আম বা সাধারণ আজাব আসে না, যতক্ষণ না ওদের সামনে সে কাজ করা হয় এবং তারা তা রোধ করতে সক্ষম কিন্তু রোধ করে না এবং যখন সময় হবে তখন আম ও খাছ অর্থাৎ সাধারণ ও বিশিষ্ট সবার ওপর আজাব নাজেল হবে এবং ভালো মন্দ কেউ এ গণ আজাব হতে রক্ষা পাবে না।’

আজকে সমগ্র বিশ্বে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব মহানবী (সা.)-এর এতদ সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর প্রতিফলন নয় কি? এ বৈশ্বিক গণআজাব হতে মুক্তির একমাত্র পথ বিশ্ব স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ করা, তার আনুগত্য স্বীকার করা, তারই প্রদর্শিত পথের অনুসরণ করা, তওবা-তিল্লাহ করা এবং তারই দিকে নিজেকে রুজু করা।

(হজরত মওলানা যাকারিয়া (রহ.) রচিত ‘আল এতে দালু ফি মারাতিবির রিজাল’ পুস্তক অবলম্বনে) মানুষের অপরাধ ও পাপ-তাপের কারণে, তাদের অপকর্মের দরুন ছোট-বড় সকল প্রকারের বিপর্যয় ও অনাকাক্সিক্ষত, অশুভ ঘটনা ঘটে থাকে যা, তাদের চিন্তা ভাবনার মধ্যেও থাকে না। (পূর্ব বর্ণিত) আলোচ্য আয়াত সম্পর্কে হজরত ইমাম হাসান (রা.) বলেন, আয়াতটি নাজেল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘সেই জাত সত্তার কসম, যার কব্জায় রয়েছে আমার প্রাণ! কোনো লাকড়ির ক্ষত, আচর অথবা কোনো রগের নড়াচড়া-রক্ত চলাচল কিংবা পদস্খলন, হোঁচট খাওয়া অথবা কোথাও হতে পাথর এসে শরীরে আঘাত করা, এ সব ক্ষত আঘাতের যেসব ঘটনা ঘটে, সবই কোনো পাপের কারণে ঘটে থাকে।’

হজরত আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘কোনো বান্দার ওপর কোনো জখম বা আঘাত এলে অথবা তার চেয়েও কোনো নিম্ন স্তরের লঘু কোনো বস্তু পৌঁছলে তা তারই কোনো কৃতকর্মের ফল।’
হজরত ইমরান ইবনে হোছাইন (রা.) এর শরীরে কোনো কষ্ট অনুভ‚ত হচ্ছিল। লোকেরা সহানুভ‚তি প্রদর্শনের জন্য তাকে দেখতে আসেন এবং তার এই কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে থাকেন। এতে তিনি বললেন, ‘দুঃখ প্রকাশ করার কী আছে? নিশ্চয়ই কোনো পাপের কারণে এ অবস্থা হয়েছে।’

হজরত যাহ্হাক (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে ভুলে যায়, তা কোনো গোনাহের কারণে হয়ে থাকে।’ অতঃপর তিনি বর্ণিত আয়াত পাঠ করেন এবং বলেন যে, ‘কোরআন শরীফ ভুলে যাওয়ার মতো বিপদ আর কী হতে পারে।’

হজরত সিদ্দীকে আকবার এর কন্যা হজরত আসমা (রা.)-এর শির ব্যথার স্থানে হাত রেখে বলতে লাগলেন, ‘আমার পাপ কর্মগুলোর কারণে।’ (অর্থাৎ কন্যার মাথা ব্যথা পিতার পাপের কারণে এ কথাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন)। (দোররে মনসুর ইবনে কাসির)

 



 

Show all comments
  • তানিম আশরাফ ৯ জুলাই, ২০২১, ২:০২ এএম says : 0
    এই যে সারা পৃথিবীতে একের পর এক ঘটনা ঘটছে আর শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, এর একটাই কারণ, আর তা হলো, দয়াময় আল্লাহর বান্দারা আজকে সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যেতে বসেছে। সব ধরণের ঐশী আজাব থেকে রক্ষার এখন একটিই মাত্র রাস্তা খোলা আছে আর তাহলো- ‘মহান আল্লাহ তাআলার প্রকৃত বান্দায় পরিণত হওয়া, আল্লাহর অধিকার এবং বান্দার অধিকার যথাযথ প্রদান করা, নিজকে সংশোধন করা এবং নিজ আত্মাকে পবিত্র করা।’
    Total Reply(0) Reply
  • হাজী গহর আলী শিকদার ৯ জুলাই, ২০২১, ২:০৩ এএম says : 0
    যখন কোনো জাতি আল্লাহর নির্দেশাবলীর অমান্য করতে করতে সীমা ছাড়িয়ে যায় তখনই তার পক্ষ থেকে কোনো না কোনো শাস্তি নিপতিত হয় আর তা কখনো কখনো করোনা ভাইরাসের মতো মহামারি দিয়ে আবার কখনো ভূমিকম্প বা ঝড়ো বাতাস দিয়ে শাস্তির কবলে পড়ে।
    Total Reply(0) Reply
  • হাফেজ মাওলানা নূরুল হক ৯ জুলাই, ২০২১, ২:০৫ এএম says : 0
    বিষয়টিকে এভাবেও বলা যায়- সমাজ ও দেশের বেশির ভাগ মানুষ যখন পাপ, ব্যাভিচার, অন্যায় এবং নিজ প্রভুকে ভুলতে বসে তখনই আল্লাহ তাআলা তার পক্ষ থেকে কোপগ্রস্থ হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়
    Total Reply(0) Reply
  • জোবায়ের খাঁন ৯ জুলাই, ২০২১, ২:০৫ এএম says : 0
    এই যে একের পর এক রোগব্যাধি ও ঐশী আজাবের সম্মুখীন হচ্ছি এর মূল কারণ হচ্ছে- আমার কৃতকর্মই এসবকে আহ্বান জানাচ্ছে।
    Total Reply(0) Reply
  • বদরুল সজিব ৯ জুলাই, ২০২১, ২:০৫ এএম says : 0
    মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার আজাবের শাস্তি থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন।
    Total Reply(0) Reply
  • শেখ আল হেলাল ৯ জুলাই, ২০২১, ৮:৫৬ এএম says : 0
    হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন, একবার রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভাষণে ইরশাদ করেছেন,হে মুহাজেরিন দল, পাঁচটি অভ্যাসের ব্যাপারে আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট পানাহ চাই, সেগুলো যেন তোমাদের মধ্যেও সৃষ্টি না হয়ে যায়। তার একটি হল অশ্লীলতা। ১। কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে যখন অশ্লীলতা বিস্তার লাভ করে, তখন তাদের মধ্যে পেলেগ ও মহামারীর মত এমন নতুন নতুন ব্যাধি চাপিয়ে দেয়া হয় যা তাদের বাপ-দাদারা কখনও শোনেনি। ২! যখন কোনো জাতির মধ্যে মাপ-জোকে কারচুপি করার রোগ সৃষ্টি হয়, তখন তাদের মধ্যে দূরভিক্ষ, মূল্য বৃদ্ধি, কষ্ট-পরিশ্রম এবং কতৃপক্ষের অত্যাচার-উতপীড়ন চাপিয়ে দেয়া হয়। ৩। যখন কোনো জাতি যাকাত প্রদানে বিরত থাকে, তখন বৃষ্টি পাত বন্ধ করে দেয়া হয়। ৪। যখন কোনো জাতি আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের উপর অজ্ঞাত শত্রু চাপিয়ে দেন।সে তাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়। ৫। কোন জাতির শাসকবর্গ যখন আল্লাহর কিতাবের আইন অনুযায়ী বিচার মিমাংসা পরিত্যাগ করে এবং আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নাযিলকৃত হুকুম-আহকাম তাদের মনোপুত হয়না তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে পারস্পারিক বিবাদ সৃষ্টি করে দেন। তাফসীরে মারেফুল কোরআন প্রথম খন্ড ৪৩৬ ও ৪৩৭পৃষ্ঠা হতে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।
    Total Reply(0) Reply
  • মুহীউদ্দিন ৯ জুলাই, ২০২১, ২:২১ পিএম says : 0
    আসুন সকল মুসলমান আল্লাহর দরবারে তওবা ইসতেকফার করি। ছোটবড় সকলপ্রকার গুনাহ ছেড়ে দিয়ে বেশি বেশি নেকআমল করি আল্লাহ আমাকে সকলকে তাওফিক দান করুন আমিন
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন