Inqilab Logo

রোববার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪ আশ্বিন ১৪২৮, ১১ সফর ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

আল্লামা মোজাহেদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:)

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ২৯ জুলাই, ২০২১, ১২:০২ এএম

দেখতে দেখতে একটি বছর পার হয়ে গেলো। সুদীর্ঘ প্রায় অর্ধ-শতাব্দীকাল যাবত একটানা বিলাতে বসে নিরলসভাবে বিভিন্নমুখী ইসলামের প্রচার প্রসারে যিনি আত্ন-নিয়োগ করেছিলেন, দশ জুলাই তার প্রথম ওফাত বাষির্কী। আমরা ওলিয়ে কামেল আল্লামা মুফতী মোজাহেদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) এর কথাই বলছি। তাঁর ইছালে সোয়াব বা ওফাত বার্ষিকী বিলাতে উদযাপনের ব্যাপক কর্মসূচীর কথা পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণী হতে জানা যায়।


বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হজরত আল্লামা দুবাগী (রহ:) কর্ম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাঁর জন্মভ‚মি সিলেটে অবস্থানকালে একজন সুদক্ষ মোহাদ্দেস হিসেবে, হাজার হাজার ছাত্রকে হাদীসের শিক্ষা প্রদান করেছেন এবং মুফতী হিসেবে অসংখ্য ফতোয়া রচনা করে মুসলমানদের ধর্মীয় নানা বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করেছেন এবং মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে জবানে ও কলমে মানুষকে হেদায়েতের পথে প্রদর্শণ করেন।

আল্লামা দুবাগী সাহেবের প্রবাস জীবন প্রায় অর্ধ শতাব্দী। লন্ডনের মতো ইসলাম বৈরী দেশে বৈরী পরিবেশে ইসলামের বাণী উচ্চারণ করা সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু তিনি এ ক্ষেত্রে আত্মত্যাগের যে পরিচয় দিয়ে গেছেন তা অতুলনীয় অনন্য। তিনি বিলাতে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভের জন্য গমন করেননি, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা সভ্যতার সূতিকাগারে ইসলামের বাণী প্রচার করা, ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সে দেশের অধিবাসী ও সেখানে বসবাসকারী তথা বাংলাদেশী মুসলমানদের ইসলাম প্রচারের মাধ্যমে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব ও অপসংস্কৃতির ছোবল হতে মুক্ত রাখা। এ ব্যাপারে আল্লামা দুবাগী ব্যক্তি পর্যায়ে নানা মুখি তৎপরতা ও প্রচার ধারা শুরু করেন এবং তার সুফলও দেখা যায়। তিনি ব্যক্তিগত শ্রম সাধনা ও নানামুখি উদ্যোগ প্রয়াসে মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাঁদা সাহায্য সংগ্রহ করে তাঁর প্রচার মিশন জোরদার ও ব্যাপকতর করেন। বিলাতে গমন করার পর প্রথমেই তিনি প্রচারের লক্ষ্য বস্তু স্থির করেন। মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে ওয়াজ নসিহতের এক অব্যাহত ধারা শুরু করেন। ইসলামের উৎসব-ঐতিহ্যগুলো মানুষের মধ্যে তুলে ধরেন। ঈদে-মিলাদুন্নবী, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা কোরবানী, শবে-কদর, শবে-বরাত, আশুরা প্রভৃতি উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করেন এবং পোস্টার হ্যান্ডবিল আকারে ছাপিয়ে সর্বত্র বিতরণ করা ছাড়াও এসব বিষয়ে স্বতন্ত্র পুস্তক-পুস্তিকা প্রকাশ করতে থাকেন এবং একই সাথে ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জবানি ও কলমি অস্ত্র ব্যবহার করতে থাকেন। বিভিন্ন উপলক্ষে ইসলামী জনসভা সমাগমের আয়োজন এবং বিভিন্ন সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ওয়াজ-বক্তৃতার মাধ্যমে তাঁর অভিযান চালু রাখেন। আল্লামা মুফতী মোজাহেদ উদ্দীন দুবাগী (রহ:) এর এ প্রচার মিশনের মধ্যে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে একজন সুদক্ষ সংগঠক হিসেবে তিনি ইসলামের নানা দিক তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন সংস্থা-সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন সংস্থার সভাপতি, উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালন করেন।

একজন হক্কানী ওলিয়ে কামেল হিসেবে তাঁর জীবন কে গড়ে তুলেছিলেন সম্পূর্ণ শরীয়ত অনুযায়ী। বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক হজরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ‘সাহেব কেবলার’ ভক্ত শিষ্য হিসেবে আল্লামা দুবাগী সাহেব তাঁর আস্থাভাজন ছিলেন, ইনকিলাব প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা এম. এ. মান্নান (রহ:) এর ও তিনি ছিলেন পরম ভক্ত এবং তাকে খুবই ভালবাসতেন, যার প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি মাওলানা মান্নাস (রহ:) স্মরণে ইনকিলাবে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ আত্ম কাহিনীতে। আল্লামা দুবাগী (রহ:) তরিকত প্রচারের জন্য বিলাতে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে এ ধারা চালু রেখেছেন।

হজরত আল্লামা দুবাগী (রহ:) কর্মজীবনের সিংহভাগই অতিবাহিত হয়েছে বিলাতের মতো ইসলাম বিদ্বেষী পরিবেশ পরিস্থিতিতে। সুতরাং তাঁকে সর্বদা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে জবানী ও কলমী অভিযানের মাধ্যমে। ব্যক্তি পর্যায়ে এককভাবে তিনি বিলাতে ইসলামের প্রচার প্রসারে যে ভূমিকা রেখেছেন তা এক কথায় অনন্য অসাধারণ। তাঁর প্রচারধর্মী তৎপরতাগুলোর সাথে তাঁর পুস্তক রচনার দিকটা যোগ করলে আরো অবাক হতে হয়। তিনি ইসলামের বিভিন্ন দিকের ওপর ছোট-বড় অন্তত কুড়িটি পুস্তক রচনা করেছেন এবং পান্ডুলিপি আকারেও রয়েছে কয়েকটি। বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাঁর বহু প্রবন্ধও রয়েছে। তাঁর রচনাবলীতে সঠিক তথ্য নির্ভর গবেষণা ধর্মী বর্ণনাগুলো পর্যালোচনা করলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না যে, পরিণত বয়সেও তিনি জ্ঞান সাধনা-গবেষণায় নিজেকে এমনভাবে ব্যস্ত রেখেছিলেন যে, একজন সুস্থ সবল গবষকের পক্ষেও তা সম্ভব নয় ।

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ের ওপর আল্লামা দুবাগী সাহেব কলম ধারণ করেছেন এবং কোরআন ও হাদীসের আলোকে যুক্তি প্রমাণাদি উপস্থাপন একজন বিচক্ষণ, দূরদর্শী, সূক্ষ্ণবিদ গবেষক হিসেবে তিনি তথ্য উপাত্যগুলো অত্যন্ত সতর্কতা ও নির্ভরযোগ্যতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুস্তকেই বিশ্বস্ত ইসলামী গ্রন্থাবলীর প্রদত্ত তালিকাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তাঁর রচনাবলী পাঠ করলে আগেকার যুগের উলাময়ে হক্কানীর দ্বীনি খেদমতের কথা স্মরণ হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ তার ‘মীলাদে বেনযীর’ বাংলা ভাষায় এ বিষয়ের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে স্থান লাভের অধিকারী, ইসলামের কিছু কিছু উপেক্ষিত সুন্নত বিষয়কে দালিলিক ভাবে অতি চমৎকার রূপে উপস্থাপন করেছেন এবং প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধারণ করেছেন। বিদেশের বুকে বৈরী পরিবেশে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সাথে ইসলামের জন্য যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা অসাধারণ।

আল্লামা মোজাহেদ উদ্দীন দুবাগী (রহ:) ছিলেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব। বিলাতের মতো বিখ্যাত স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করায় তাঁর বাস ভবন হয়েছিল আন্তর্জাতিক মানের ধর্মীয় মিলন কেন্দ্র। বিদেশী ও দেশীয় উলামা তথা ধর্মীয় বহু ব্যক্তিত্ব তাঁর সাথে প্রয়োজনে অথবা সৌজন্য সাক্ষাতে সেখানে গমন করতেন এবং নানা বিষয়ে তাঁর সাথে মত বিনিময় করতেন। আত্মপ্রচার বিমুখ আল্লামা দুবাগী নিরলসভাবে ইসলামের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি অনেকবার বিভিন্ন বিদেশ সফর করেছেন এবং স্বপরিবারে হজ্জ পালন করেছেন। বহু ধর্মীয় আরব ব্যক্তির সাথে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ সর্ম্পক ছিল।

প্রতিভা, জ্ঞানচর্চা গবেষণায় তিনি যে, অপূর্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন , তাঁর রচনাবলী তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। জানা যায়, তাঁর নিজস্ব কুতবখানায় ইসলামী গ্রন্থাবলীর বিরাট সমাহার। কোরআনের তফসীর হাদীস এবং ফেকাহ্ ইত্যাদিও মূল দুর্লভ গ্রন্থ এবং নানা ভাষার মূল গ্রন্থ রাজির বিশাল সমাবেশ খুব কমই দেখা যায়। ইসলামের যে কোনো জটিল বিষয়ের ওপরই তিনি লেখনি চালাতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ইসলামী জ্ঞান ভান্ডার ছিল তাঁর আয়ত্বে। আল্লামা দুবাগী (রহ:) সাহেবের ফতোয়া গ্রন্থে সমসাময়িক বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে। তাঁর ‘মাছায়েলে নাদেরাহ’ আসলেই অভিনব। এ গ্রন্থে তিনি যে সব অভিনব বিষয় চয়ন করেছেন, সাধারণ ভাবে সেগুলো দেখা যায় না ।

সংক্ষেপে বলতে গেলে আল্লামা মুফতী মোজাহেদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:) বিলাতে বসেই তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন, যা দেশের অনেকেরই অজানা। তিনি সেখানে একক উদ্যেগে প্রচেষ্টায় ইসলামের শিক্ষার প্রচার, প্রসার ও ইসলামী ঐতিহ্য সংস্কৃতির বিকাশে এক অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি দুনিয়া হতে চির বিদায় নিয়ে গেলেও তাঁর অমর কীর্তিগুলো মুসলমানদের জন্য আলোক বর্তিকা হিসেবে অক্ষত থাকবে।

আল্লামা দুবাগী সাহেবের এ প্রথম ওফাত বার্ষিকীতে আমরা আল্লাহর দরবারে তাঁর মাগফিরাত ও তাঁর উচ্চ মর্যাদা প্রার্থনা করি ।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আল্লামা মোজাহেদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ:)
আরও পড়ুন