Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

ইসলামী ঐতিহ্যের অংশ হিজরী সন জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ান

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৬ আগস্ট, ২০২১, ৪:১৭ পিএম

ধর্মীয় কারণেই মুসলমানদের নিকট হিজরী সন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হিজরী সন গণনার মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি ও সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করা সম্ভব হয়। আজ জুমার খুৎবাপূর্ব বয়ানে খতিব ও পেশ ইমামরা এসব কথা বলেন। বৈশ্বিক করোনা মহামারি থেকে মুক্তির জন্য সারাদেশের মসজিদগুলোতে মোনাজাতে বিশেষ দোয়া করা হয়। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নগরীর মসজিদগুলোতে জুমার নামাজে প্রচুর মুসল্লির সমাগম ঘটে। অধিকাংশ মসজিদে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় রাস্তার উপর মুসল্লিদের জুমার নামাজ আদায় করতে হয়েছে।

ঢাকার বাংলা মটরস্থ বাইতুল মোবারক জামে মসজিদের অনারারী খতিব অধ্যাপক ড. মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ আজ জুমার খুৎবাপূর্ব বয়ানে বলেন, পার্থিব ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই ‘সময় ও সময়ের হিসাব’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময় যাকাত আদায় করতে হয়, রমজান মাসের রোজা, জিলহজ মাসের হজ ইত্যাদি মুসলমানদের আবশ্যক ইবাদাত, যা সরাসরি সময়ের সাথে সম্পৃক্ত। যে কারণে ইসলামে সময় ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ধর্মীয় কারণেই মুসলমানদের নিকট হিজরী সন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

আমরা ১৪৪২ হিজরী সনের বিদায়লগ্নে ও হিজরী নববর্ষ ১৪৪৩ দ্বার প্রান্তে উপস্থিত। ১ মহররমের মধ্যদিয়ে হিজরী নববর্ষ ১৪৪৩ এর সূচনা। মহররম ইসলামী পঞ্জিকা হিজরী সনের প্রথম মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে আরবদের নিজস্ব কোনো বর্ষ গণনা পদ্ধতি ছিল না। ১৬ হিজরী সনে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে আবু মুসা আশআরী (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর ছিলেন। নিজস্ব বর্ষ গণনা পদ্ধতি না থাকায় খলিফা কর্তৃক জারিকৃত ফরমান যথা সময় বাস্তবায়ন করা গভর্নরদের জন্য দুষ্কর ছিলো। এ প্রেক্ষিতে আবু মুসা আশআরী (রা.) খলিফা উমরের (রা.)কে এ মর্মে পত্র লিখেন যে, ‘আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের নিকট পৌছে তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোনো চিঠি কোন দিনের তা নিরুপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। এতে করে আমাদের নির্দেশ কার্যকর করতে সমস্যা হয়। অনেক সময় আমরা বিব্রত বোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে।’ আবু মুসা আশআরীর চিঠি পেয়ে হযরত উমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহবান করেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। উক্ত পরামর্শ সভায় হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.)সহ বিশিষ্ট অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সকলের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই সভায় ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামি সন প্রবর্তনের। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মদিনায় হিযরতের বছরকে প্রথম বছর ধার্য করে হিজরী সন প্রবর্তিত হয়।

ইসলামে হিজরী সনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গণনা হিসেবের মাস হলো ১২টি। যেদিন থেকে তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ সম্মানিত। (সূরা তাওবাহ, ৩৬)। আর হারাম বা সম্মানিত চারটি মাস হলো মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ। (তাফসিরে বাগাভি, ৪/৪৪)

হিজরী সন হচ্ছে চন্দ্র ভিত্তিক। চাঁদ উদিত হওয়ার উপর ভিত্তি করে হিজরী সন গণনা করা হয়। চন্দ্রকে সৃষ্টি করা হয়েছে সময় নির্ধারণের জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, লোকেরা আপনাকে নবচন্দ্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন, তাহলো মানুষের এবং হজের জন্য সময় নির্ধারণকারী। (সূরা বাকারা, ১৮৯) হিজরী সন গণনা করা হয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিযরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ফলে হিজরী সন ব্যবহার ও গণনার ফলে রাসুল (সা.)-এর হিযরতের ঘটনা মুসলিম হৃদয়ে বার বার দোলা দেয়।

ইসলামের অধিকাংশ ইবাদত-বন্দেগি যেমন রোজা, হজ, কুরবানি, শবে-কদর, শবে বরাত, আশুরা ইত্যাদি ইবাদত হিজরী সনের সাথে সম্পৃক্ত। ফলে হিজরী সনের ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক সময়ে ইবাদত বন্দেগি পালন করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন লাভ করা সম্ভব হয়।
হিজরী সন গণনার মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি ও সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করা সম্ভব হয়। এজন্য চন্দ্র মাস হিসেবে হিজরী সন গণনা করা মুসলমানদের জন্য কর্তব্য।

মহান আল্লাহ আমাদের সময়ের গুরুত্ব উপলদ্ধি এবং যাবতীয় বিপদাপদ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মুফতি মিজানুর রহমান আজ জুমার বয়ানে বলেন, বছর ঘুরে আবারও মুমিনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মহররম। ত্যাগের মাস জিলহজ এখন বিদায়ের পথে। মুমিনের কাছে হাজির হচ্ছে এবার আরেকটি বরকতপূর্ণ মাস। আরবি মাসের প্রথম মাস মহররম। এ মাস যেমন ফজিলত ও বরকতময় তেমনি শোক ও বিরহগাঁথার মাসও বটে। পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে বলেছে, এ মাস আরবাআতু হুরুম অর্থ্যাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। হাদিসে একে আল্লাহর মাস আখ্যা দিয়ে রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মাসে রোজা রাখার ফজিলত বর্ণনা করেছেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা হল সর্বশ্রেষ্ঠ।’সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭

এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন। সহীহ বুখারী ১/৪৮১ জামে তিরমিযী ১/১৫৭। এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন (রা.)। হযরত হুসাইন (রা.) এর শাহাদাত আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার ও আত্মত্যাগের শিক্ষাই দেয়। তবে এই শোক সহ্য করা উম্মতের জন্য সহজ নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা ‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রæসজল হয়, হৃদয়ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’ (বুখারী ঃ ১২৪১ )। অতএব শাহাদাতে হুসাইন (রা.) কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকান্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য। খতিব বলেন, করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা হতে উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদেরকে বেশি বেশি আল্লাহর দরবারে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। আল্লাহর কাছে নিজেকে পূর্ণ সমর্পিত করব। আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলব, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখব। অবশ্যই মাস্ক পরিধান করব। উদ্ভূত কোন পরিস্থিতিতে পতিত হলে আমরা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করব। সর্বশেষ মহান আল্লাহর কাছে আমাদের ফরিয়াদ আমরা যেন, আরবি নতুন বছর শুরু করতে পারি রবের কাছে নিজেকে পূর্ণ সমর্পিত করার মাধ্যমে । আমরা যেন সমস্ত হিংসা- বিদ্বেষ, কলুষতা মুক্ত এক নবজীবন গঠন করতে পারি। সর্বোপরি মহান আল্লাহর কাছে আমাদের আকুতি আল্লাহ যেন আমাদেরকে সর্বপ্রকারের মুসিবত, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। চলমান পরিস্থিতি থেকে আমাদের দেশ-জাতি ও বিশ্বমানবতাকে মুক্তি দান করেন। আমিন। দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা রেজাউল করিম জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, মহররমের তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা এ মাসকে সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনার মাস বারোটি। আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। ( সূরা তওবা আয়াত ৩৬) সম্মানিত চারটি মাসের অন্যতম মাস হলো মহররম। হাদীস শরীফে এসেছে রমজান মাসের রোজার পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। মুসলিম শরীফ। রাসুল (সা.) বলেন,আমি আল্লাহ তায়ালার দরবারে আশা রাখি যে আশুরার রোজাদার তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করা হবে। সহি মুসলিম শরীফ। আগামী ১০ আগস্ট পহেলা মহররম। আল্লাহ তায়ালা আমাদের গুনাহ মাফ করে নতুন হিজরী সনে বেশি বেশি আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মিরপুরের বাইতুল আমান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল্লাহ ফিরোজী আজ জুমার খুৎবা পূর্ব বয়ানে বলেন, রাগ বা ক্রোধ মানুষের জীবনের একটি মন্দ দিক। মাত্রাতিরিক্ত রাগ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অধিক রাগান্বিত মানুষ বেসামাল হয়ে পড়ে। তখন সে গোনাহ, জুলুম ও যে কোন অপরাধ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম রাগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে নেককার মানুষের গুণাগুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, "যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) খরচ করে, যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সৎকর্মশীলদেরই ভালোবাসেন"। সূরা আল ইমরান : ১৩৪। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসীহত করুন। রাসুল (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবী কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। রাসুল (সা.) প্রত্যেকবারই বললেন, রাগ বর্জন কর। বোখারি।

খতিব আরও বলেন, রাগ মানুষকে জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়। এজন্য রাগ হলে আলেমরা ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এক হাদীসে বলা হয়েছে, "যখন তোমাদের কারও রাগ আসে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে। তাতে যদি রাগ দমে না যায়, তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে"। তিরমিজি শরীফ। আবু দাউদ শরীফের একটি হাদীসে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রাগ আসে শয়তানের কাছ থেকে। শয়তান আগুনের তৈরি। আর আগুন নেভাতে পানি লাগে। তাই যখন তোমরা রেগে যাবে, তখন অজু করে নেবে। আর মুসলিম শরীফের এক হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে রাগের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে, সেই প্রকৃত বাহাদুর। অন্য আরেকটি হাদীসে আছে, রাগের কারণে প্রতিশোধ নেয়ার সক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও যে ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন পুরস্কৃত করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করেন। আমীন।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পেশ ইমাম


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ