Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

গল্প : বাঘ শিকার

প্রকাশের সময় : ৩ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ স আ র শা নু খা ন

রাজাদের বনে বাঘ শিকার করতে যাওয়া তাহাদের রেওয়াজ। সমস্ত প্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সকল জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘোড়াশালের সেরা দুইটি তেজি সম্পন্ন ঘোড়া নিয়ে রাজা ও সেনাপতি রাজ প্রাসাদ ত্যাগ করলেন খুব ভোরে। উদ্দেশ্য একটাই প্রাণ থাকুক আর নাই থাকুক বাঘ শিকার করা চাই-ই চাই। মানসম্মানের প্রশ্ন। কয়েক বছর ধরে সিংহাসনে বসে রাজ্য শাসন করেই চলেছি এখন যদি বাঘ শিকার না করতে পারি তাহলে প্রজারা কি ভাববে। সেনাপতি রাজার কথার মাত্রা বাড়িয়ে বলে উঠে জ্বী জাহাপনা। আপনি বাঘ শিকার করে নিয়ে রাজ্যে ফিরবার সাথে সাথেই সমস্ত রাজ্যে ঢাক পিটিয়ে দিবো বাঘ দেখতে আসার জন্য। আর প্রজারা বাঘ স্বচক্ষে দেখলে আপনার প্রতি তাদের ভয় ভীতি ও দ্বিগুণ হারে বাড়বে। সেনাপতির কথায় রাজা ডুবে যায় কল্পনায়। রাজা আসলে খুব ভীত মানুষ। বাঘ শিকার করবার মত সাহস তাহার নেই। ক্ষণিকের সাহসে রাজ্য থেকে বেরিয়ে পড়েছে। এতো বড় রাজ্য পরিচালনা করবার মত বুদ্ধিও তার নাই। বাবা রাজা ছিলেন তাই তো তিনিও রাজা হয়েছেন। রাজার মনে একবার বাঘ শিকার করে ফিরে আসলে কি হবে সেটা আসে আবার একবার মনে পড়ে বাঘ শিকার হরতে গিয়ে যদি প্রাণ যায় তাহলে কি হবে। তবুও রাজা নিজের দুর্বলতা একটুও বুঝতে দেয়না সেনাপতিকে।
পথিমধ্যে কয়েকবার থেমে থেমে বিশ্রাম করে কিছু শুকনা খাবার পেটে পুরে পড়ন্ত বিকালে পৌঁছালো বনের কাছাকাছি। বন থেকে সেনাপতির মুখে হাসির ছিটাছিটি। আর ওদিকে রাজার পরাণ দেট টাকা পাঁচ সিয়ে অবস্থা। তবুও মুখে হাসির মুখোশ। বনে ঢুকতেই নানান পশু পাখির নানান সব বিস্ময়কর আওয়াজ এসে কানে লাগতে লাগলো রাজার। বনের ভিতরে চিকন রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে ঘোড়া। সেনাপতি বার বার বলতে লাগলো হুজুর এবার ঘোড়া থেকে নামা যাক। রাজা সে কথায় কান ই দিতে চাইলো না তখন। রাজা আস্তে করে জানালো একটু ধৈর্য ধরো সেনাপতি।
বনের ভিতরের দিকে যতই এগোচ্ছে ততই সিংহের গর্জন আর শিয়ালের হাক, বানরের কিচির মিচির, পাখির লাগামহীন ডাকা ডাকি স্পষ্ট হয়ে ভেসে আসতে লাগলো। বেলা কমবার সাথে সাথেই চারিদিকে নিরব হলেও বন হয় ঠিক তার উল্টো। নেশাচর প্রাণীর ঘাটতি নেই বনে। চারিদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে পড়লো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। সেনাপতির পরামর্শে দুজনে ঘোড়া থেকে নেমে ক্লান্তি নিবারণের জন্য বনের ভিতরের একটু ফাকা জায়গায় আশ্রয় নিতে উদ্ধত হলো। সেনাপতি দুটো ঘোড়াকেই গাছের সাথে বেঁধে বসে পড়লো । ক্লান্তিতে হিং¯্র পশুপাখির ভয় মনে নেই রাজার। গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সেনাপতিকে বললো কিছু শুকনা ডাল গুছিয়ে আগুনের ব্যবস্থা করতে। মুহূর্তের মধ্যে তন্দ্রা গেল রাজা। ক্ষিধায় চো চো করছে সেনাপতির পেট। উপায় নাই একটুও সারাদিন পরে রাজা একটু চোখ বুজেছেন। ডাকার সাহস নাই সেনাপতির। আগুন জ্বালিয়ে সেনাপতিও একটি গাছের সাথে মাথা বাধিয়ে ঝিমটি মারতে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়লো অজান্তে। মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল রাজা। চোখ খুলে রাজাতো এক্কেবারে পাথর হয়ে যেতে লাগলেন। রাজা আস্তে আস্তে করে সেনাপতির কাছে গিয়ে ডেকে জাগালেন সেনাপতিকে। সেনাপতি উঠেই জানতে চাইলেন কি হয়েছে জাহাপনা। এখনই কি শিকারে বের হবেন। আশে পাশে বাঘের ডাক শুনেছেন?রাজা বললেন শুনতে পাচ্ছো না কি সব ভয়ংকর আওয়াজ। সেনাপতি একটু কান খাড়া করে বললেন ওগুলোতো বনের সব নেশাচর প্রাণীর ডাকাডাকির শব্দ। রাজার গলাটা প্রায় ধরে এলো। ফ্যাঁস ফ্যাঁস গলায় বলিল, সেনাপতি তুমি কি মনে করছো? এখন কি আমাদের এই খানে থাকাটা নিরাপদ হবে নাকি অন্যকোথায় যাওয়া উচিত। সেনাপতি কহিল, এটা গভীর অরণ্য সঙ্গে গভীর রাতও। এই গভীর বনে আপনি নিরাপদ জায়গা কোথায় পাবেন জাহাপনা? কাজুবাজু অসহায়ত্ব প্রকাশক মুখ নিয়ে মায়াবী কণ্ঠে বলিল এখন কি করার আছে সেনাপতি। আশপাশের আওয়াজ শুনে আমার খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না। কি আর করার আছে হুজুর! চারিদিকে বিদঘুটে অন্ধকার অচেনা অজানা বন কোথায় যাবো আমরা। এখন সৃষ্টিকর্তাকে সহায় রেখে চোখকান বুঝে সকাল পযর্ন্ত অপেক্ষা ছাড়া আর কি করার আছে। হঠাৎ করে এক বিরাট আকারের পাখি রাজা ও সেনাপতির মাথার উপর দিয়ে সাঁ করে উড়িয়া ডসয়ে বসিল ঘোড়া বেঁধে রাখা গাছটির একটা ডালের উপর। ঘাড় থেকে বন্ধুক এনেই ডাক করতে উদ্ধত হলেন রাজা। সেনাপতি খপ করে বন্ধুকের নালা ধরে বসলেন। এটা ভুলেও করবেন না হুজুর । বন্ধুকের গুলির শুনতে পারলে বনের সকল হিং¯্র পশুরা চলে আসতে পারে এবং স্বাভাবিকের থেকে আরও হিং¯্র হয়ে উঠতে পারে। রাজা বন্ধুকটা গুটিয়ে রাখলেন।
রাজা লক্ষ্য করলেন একটি ঘোড়ার সামনের দুই পা কাঁপছে। খেয়াল করে দেখলেন অন্য ঘোড়াটির ঠিফক একই অবস্থা। রাজা আরও ভয় পেয়ে গেলেন। সেনাপতি, আমার মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমাদের সময় থাকতে এখান ত্যাগ করাই জ্ঞানের কাজ।
ওমন করে কি দেখছেন হুজুর? আমাকে খুলিয়া বলেন। রাজা আঙ্গুলের ইঙ্গিত দিয়ে দেখিয়া বলিলেন দেখ সেনাপতি ঘোড়ার দুইটার সামনের পা কিভাবে কাঁপছে। সোনপতি ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে সামনের পায়ের কাছাকাছি বসে ঘোড়ার ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে দেখলেন ঘোড়ায় পায়ে ছোট ছোট পোকায় ঘিরে ধরেছে। সেনাপতির বুঝতে একটুও বাকি রইলো না এই পোকা গুলোই কামড়াচ্ছে আর ক্ষণে ক্ষণে ঘোড়াগুলো কাঁপছে। উপরের দিকে তাকিয়ে রাজার তালগোল পেকে যাওয়ার মত অবস্থা। নিজেদের জ্বালানো ডালপালার আগুনে যতদুর দেখা যায় গাছের ডালপালার উপর ছোট বড় অনেক অনেক পাখি এসে ভরে গেছে। কিছু কিছু পাখির চোখে আলো লেগে জ্বল জ্বল করতে লাগলো। রাজা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে উপরের দিকে তাকিয়েই হাত দিয়ে সেনাপতির পিঠের উপর রেখে উপরের দিকে তাকাতে বললেন । হঠাৎ একটি পাখি ছো মেরে রাজাদের দিকে এসে আবার ফিরে গিয়ে ডালে বসলেন। রাজা বন্ধুক তাক করতে করতে বললেন, সেনাপতি ঘোড়ার রশি খোলো এখনই এখান থেকে রওনা হতে হবে। সেনাপতি বলিলেন হুজুর গুলি ছুড়িয়েন না। এ পাখিগুলো আমাদের কোন ক্ষতি করবে না। এই দেখুন আমাদের জ¦ালানো আগুন দেখে বনের অনেক পোকা মাকড়, ঘাস ফড়িং জাতীয় অনেক কিছু উড়তেছে। আর এইগুলোকে খাবার জন্যই ঔ পাখিগুলো জড় হয়েছে এবং ছোঁ মেরে সেগুলোই খাচ্ছে।
বড় সড় একখান হাই ছেড়ে রাজা বললেন, ‘সেনাপতি রাতের আর কতটুকু বাকি? আমি আর পারছি না।’ এই তো হুজুর কিছু সময়ের মধ্যেই চাঁদ পশ্চিমে ডুবে যায়বে। এবং সঙ্গে সঙ্গে সূর্য উঠিয়ে পড়বে। -ও আচ্ছারাত পোহালেই রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।
সেনাপতি এটা কি বলেন হুজুর! বাঘ শিকার না করে ফিরলে লজ্জায় নাক কাটা যাবে। রাজা বলিল, শোনো সেনাপতি আমার থেকে কি তোমার মানসম্মান বেশি নাকি। শোন আমার বাবা ছিলেন রাজা, তার বাবাও ছিলেন রাজা। কিন্তু তুমি কি একটি জিনিস লক্ষ্য করেছ যে আমাদের প্রাসাদে বাঘ কিংবা হরিণের কোন চিহ্ন চোখে পড়ে। তিনারা যুগের পর যুগ রাজ্য শাসন করে গেছেন তিনারা যখন বাঘ শিকার করেননি। তো আমার এখন বাঘ শিকার করার কি প্রয়োজন আছে।
সেনাপতি হেঁসে হেঁসে বলিলেন হুজুর একটি কথা বলি। যে মানুষ একটি রাত দুইটি ঘোড়াকে নিরাপত্তা দিতে পারে না সেই মানুষ পুরা রাজ্যকে কিভাবে দেখবে।
রাজা রাগান্বিত কণ্ঠে গড় গড় করে বললেন ইদানীং তুমি খুব বেশি বুঝতে শিখেছ দেখছি। রাজ্য চালানো কি তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে নাকি। আগে তুমি আমার ঘোড়ার রশি খুলে দাও। আর এতোই যদি ল্জ্জায় কান কাটা যায় তাহলে বাঘ শিকার তুমিই করে নিয়ে আসো।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।