Inqilab Logo

বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮, ১৯ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

আত্মসাৎ ৮২৩ কোটি

দুদকের মামলা ৪৩ কোটি টাকার

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০২১, ১২:০১ এএম

অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে ৮২৩ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার। এজাহারে উল্লেখ না করে আত্মসাৎকৃত ৭৮০ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ১৬৪ টাকা গোপন, আড়াল, গোপন কিংবা বৈধতা দেয়া হয়েছে। গুরুতর এই অভিযোগ উঠেছে দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক)র বিরুদ্ধে। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড’ (বিআইএফসি) নামক লিজিং কোম্পানি। দেশি-বিদেশি যৌথ অর্থায়নে ননব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি ১৯৯৮ সালে কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি শিল্প ও বাণিজ্যে ব্যাপক ঋণ দেয়। বিতরণকৃত ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে ৯৬ শতাংশ ঋণই ‘কুঋণ’ হিসেবে চিহ্নিত। কুঋণের ৭৬ শতাংশই মঞ্জুর করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মান্নানের মালিকানাধীন ‘সানম্যান গ্রæপ’এর অনুক‚লে।

ঋণ আদায়ে ৩০টির মতো মামলাও হয়েছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি অধিকাংশ ঋণ নেয় কাগজে প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে। ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির কারণে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিআইএফসি’র পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দেউলিয়া প্রায়। এ পরিস্থিতিতে এটিসহ ৩টি প্রতিষ্ঠানের অর্থলগ্নিকারীরা বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। আদালত বিআইএফসিসহ অপর দুই প্রতিষ্ঠান দিউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণ উদ্ঘাটনে ৭ সদস্যের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করে। এ কমিটি এখন কাজ করছে।

দুদক সূত্র থেকে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, বিআইএফসি লিজিং প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতে অনেকটা ‘সহায়ক’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানও। প্রতিষ্ঠানটি যখন ‘কুঋণ’র দায়ে জর্জরিত তখন ঋণগ্রহীতা বা ঋণের অর্থ আত্মসাতকারীদের প্রতি এক ধরনের সহমর্মিতা প্রদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্রমতে, ২০১৬ সালে বিআইএফসি’র ঋণ জালিয়াতি নিয়ে যখন সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক লেখা লেখি হয় তখন দুদক একটি অনুসন্ধান শুরু করে। ৩ বছর ধরে চলে এ অনুসন্ধান। এ সময় বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বহু রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করে। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০১৯ সালের ৮ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন বিআইএফসির তৎকালিন চেয়ারম্যান মেজর (অব.) এমএ মান্নান, প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী মো. মাহমুদ মালিকসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে।

দুই মামলায় ঋণ চুক্তির নামে ৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। অন্য আসামিরা হলেন, প্রতিষ্ঠানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুর রহমান, সাবেক এসভিপি সৈয়দ ফকরে ফয়সাল, সাবেক এভিপি আহমেদ করিম চৌধুরী, সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, সাবেক কর্মকর্তা মো. সৈকত আজাদ, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার তানিজা মাজেদ, সাবেক অফিসার মাসুদ-উল-রেজা চৌধুরী, সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা আফ্রিদা আহসান, ডি আফরোজ সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’র এমডি গোলাম জিলানী দিদার এবং ক্লিক টু ডিজাইনের এমডি মো. নাজমুল বাশার।

এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, ডি আফরোজ সোয়েটার ও ক্লিক টু ডিজাইনের নামে আলাদাভাবে বিআইএফসি থেকে দু’টি করে ঋণচুক্তির মাধ্যমে বোর্ডসভার অনুমোদনের অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন- মর্মে অভিযোগ আনা হয়। দুটি এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ড বিধির ৪০৬/৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।
এদিকে দুদকের সূত্র জানিয়েছে, বিআইএফসি থেকে অর্থ আত্মসাতের অংক এজাহারে উল্লেখিত অংকের চেয়ে অনেক বেশি। সংস্থাটি অনুসন্ধান পর্যায়েই বিপুল এই আত্মসাতের রেকর্ডপত্র হাতে পায়। তা সত্তে¡ও আসামিদের আত্মসাৎকৃত অর্থের বড় অংশটি গোপন করে তুলনামূলকভাবে নাম মাত্র অংক উল্লেখ করে মামলার এমই দিলে তৎকালিন কমিশন সেটি অনুমোদন দেয়। এর ভিত্তিতে দু’টি মামলাও রুজু হয়।

অথচ যথাযথ অনুসন্ধান হলে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রের ভিত্তিতে মামলা হতে পারত এক ডজনের বেশি। দু’টি মাত্র মামলা দিয়ে আত্মসাৎকৃত বাকি অর্থের বৈধতা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ, দুই এজাহারের উল্লিখিত অংক ধরেই চার্চশিটও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানার জন্য গতকাল সোমবার দুদক সচিব ড. মুহা: আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি ফোন কেটে দেন।

সূত্রমতে, বিআইএফসি থেকে আসামিরা মোট অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ৮২৩ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অনুসন্ধানকালে দুদক যেসব রেকর্ডপত্র হস্তগত করেছে তাতে এই টাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। দুদক অর্থ আত্মসাৎ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র চাইলে (স্মারক নং-৪৪৪৪৩, তারিখ: ০২/১১/২০২১৬ ইং) বিআইএফসি থেকে জানানো হয়, মেজর (অব.) এমএ মান্নানের মালিকানাধীন সানম্যান গ্রæপ তাদেরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৭৬টি এগ্রিমেন্ট’র বিপরীতে মোট ৫১৭ কোটি ৬১ লাখ ২৯ হাজার ২৮১ টাকা ঋণগ্রহণ করেন। উক্ত ঋণের বিপরীতে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুদে-আসলে মোট পাওনা ৮২৩,৩০,৬০,১৬৪ টাকা। যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে সানম্যান গ্রুপ ঋণ নিয়েছে তার অধিকাংশই ভুয়া। ঋণগুলো জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বরের মধ্যে মেজর (অব.) এমএ মান্নানের প্রতিশ্রুত ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা না হলে বিআইএফসি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সে ক্ষেত্রে আমানতকারী কিংবা পাওনাদারদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে।
এর আগে ২০১৫ সালে বিআইএফসি’র আত্মসাতের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে দুদককে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে বিআইএফসি’র পরিচালক মেজর মান্নানের স্ত্রী উম্মে কুলসুম মান্নান, মেয়ে তাজরিনা মান্নান এবং তানজীলা মান্নান, শ্যালক রইস উদ্দীন, রফিক উদ্দীন, মহিউদ্দিন, ভাই আকবর হোসেন, আত্মীয় আব্দুল ওহাব, আয়েশা খানম, মেজর মান্নানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচালক এএনএম জাহাঙ্গীর আলম, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ, রোকেয়া ফেরদৌসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ রয়েছে। বিআইএফসি থেকে তারা ঋণের আড়ালে ৫১৮ কোটি আত্মসাৎ করেছেন মর্মে স্পেশাল অডিটে ধরা পড়ে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিআইএফসি থেকে ৭০৩ কোটি টাকা উত্তোলনের বিষয়টি মেজর (অব.) মান্নান নিজেই স্বীকার করেছেন। এছাড়া তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম মান্নান বিআইএফসিতে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেন। প্রতারণার আশ্রয়ে ঋণের আড়ালে উত্তোলিত অর্থ ফেরতের জন্য ৩ দফায় ৬ মাস সময় দেয়ার পরও এ পর্যন্ত দায়ী ব্যক্তিরা কোনো অর্থ পরিশোধ না করে কালক্ষেপণ করছেন। অনিয়মের দায়ভার ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এদিকে বৃহৎ আত্মসাতের ঘটনা (৮২৩,৩০,৬০,১৬৪) আড়াল করতেই এজাহারে আত্মসাতের পরিমাণ কম (৪৩ কোটি ১৫ লাখ) দেখানো হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট বাবরূল আমীন। তিনি মনে করেন, আত্মসাৎকৃত অর্থের বৈধতা দিতেই এজাহারে নামমাত্র অংক উল্লেখের মাঝে দুরভিসন্ধি থাকতে পারে। যেখানে দুদকের দায়িত্ব হচ্ছে আত্মসাতের সমুদয় অর্থ উদ্ধারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া এবং দায়ীদের বিচারার্থে আদালতের কাছে ন্যস্ত করা, সেখানে দুদক নিজেই আবিভর্‚ত হয়েছে আত্মসাতকারীর সহায়তাকারী হিসেবে। আর ভেতর-বাইরে নানাদিক থেকে নানা মাত্রার সহযোগিতা নিয়েই আত্মসাতকারীরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত করেছে। যা আরেকটি বৃহৎ দুর্নীতি বৈ কিছুই নয়। অনুসন্ধান-তদন্তের নামে প্রকারন্তে যারা আত্মসাৎকারীর দায় মুক্তি দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলেও জানান এই আইনজীবী।



 

Show all comments
  • গিয়াস উদ্দীন ফোরকান ১৮ আগস্ট, ২০২১, ৩:৪৬ এএম says : 0
    এদের বিরুদ্ধে প্রযোজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক
    Total Reply(0) Reply
  • বেলায়েত হোসেন ১৮ আগস্ট, ২০২১, ৮:৪০ এএম says : 0
    দুদককে নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং অর্থ আত্মসাতকারী চক্রকে মহা সিআইপি পুরস্কারে ভূষিত ও তাদের চিরকালীন ব্যবসায়িক শুল্ক ভ্যাট কর দায়মুক্তি দেয়া যেতে পারে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুদক


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ