Inqilab Logo

শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

পানি পরিশোধনে জৈব প্রযুক্তি

আব্দুল ওয়াহিদ | প্রকাশের সময় : ১৯ আগস্ট, ২০২১, ১২:০৮ এএম

পানির অপর নাম জীবন হলেও সব পানি সব জায়গায় যেমন ব্যবহার করা যায় না, তেমন সব স্থানের পানির অপর নাম জীবন হতে পারে না। বিশুদ্ধ পরিশোধিত নিরাপদ পানির অপর নাম জীবন। জীবজগতের জীবন ও প্রাণির বাহক হচ্ছে পানি। প্রাণির জীবন ধারণের জন্য প্রযোজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পানি। খাদ্য ছাড়া হয়তো একজন মানুষ কয়েক সপ্তাহে বেঁচে থাকতে পারে কিন্তু পানি ছাড়া ১০-১২ দিনের বেশি বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। মানুষের শরীরের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ পানি। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং শরীর সুস্থ রাখতে নিরাপদ পানি জরুরি। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, নিরাপদ পানির ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে বিশ্বে প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ১৪০০ শিশুর মৃত্যু হয়।

জীবনের সাথে পানির রয়েছে এক অবিচ্ছিন্ন আন্তঃসম্পর্ক। মানুষের পান করার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি। যে সকল পানিতে ময়লা, আবর্জনা, রোগজীবাণু থাকে না তাকেই আমরা বিশুদ্ধ পানি বলি। পৃথিবীর উপরিভাগের এক তৃতীয়াংশ পানি দ্বারা আবৃত্ত। এইসব পানি নিরাপদ পানি নয়। পৃথিবীর ৯৭.৫ শতাংশ পানি পানের অযোগ্য সমুদ্রের লবণাক্ত পানি। বাকি মাত্র ২.৫ শতাংশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পানি বরফ হয়ে পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। আবার বাকি পানির তিন-চতুর্থাংশ ভূ-গর্ভস্থ পানি এবং মাত্র ০.৩ শতাংশ পানি থাকে নদনদী, খাল-বিল হ্রদে। সুতরাং পৃথিবীর মোট পানির শতকরা একভাগের ও কম পানি পানের যোগ্য। বৃষ্টি, নদীনালা, খাল-বিল-হ্রদ ইত্যাদি প্রাকৃতিক উৎস থেকে মনুষ্যসৃষ্ট উৎস পুকুর, কুয়া, নলকূপ ও পানির কল ইত্যাদি থেকে আমরা পানি পাই। এই নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর এমনকি ভূ-গর্ভস্থ পানি বিভিন্নভাবে দূষিত হচ্ছে। আজকাল আমাদের দেশে যেখানে সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপিত হচ্ছে। আর এসব শিল্প কারখানার উৎপাদিত বর্জ্য ময়লা সঠিকভাবে পরিশোধন না করে সরাসরি নদী-নালার পানিতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে নদী-নালাসহ ভূগর্ভের পানি দূষিত হচ্ছে। আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় বন্যা হয়। আর এসকল অঞ্চলের মানুষেরা নিরাপদ পানির অভাবে বিভিন্নরকম রোগে ভোগে।

আমাদের দেশের দুই তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারের চেয়ে কম উচ্চতা ও হিমালয়ের পাদদেশে হওয়ায় এবং বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদী থাকার ফলে ঘনঘন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় হওয়ায় পানির উৎস দূষিত হচ্ছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অধিক সংখ্যক মানুষের শহরমুখিতা ইত্যাদি কারণেও পানির উৎস দূষিত হচ্ছে। এছাড়াও অল্প বৃষ্টি হলেই ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের মতো শহর প্রায়ই পানির তলায় হারিয়ে যায়। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পানিবদ্ধতা। এর ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। মানুষ চরমভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকটে ভুগছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস হয়, এতেও শহরের ময়লা আবর্জনায় পানি দূষিত হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন পানিবাহিত রোগ হচ্ছে অন্যদিকে শহরাঞ্চলের এডিস মশার প্রাদুর্ভাব প্রকট আকারে ধারণ করছে, যার কারণে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব হচ্ছে।

আমাদের মতো দেশে পানি দূষণ একটি মারাত্মক সমস্যা। দেশের অধিকাংশ মানুষ দ্রারিদ্যসীমার নিচে বাস করে যাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি পান করা এক বিরাট সমস্যা। অন্যদিকে ঘন ঘন বন্যার ফলে পানি বাহিত কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয় ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ২ বিলিয়ন মানুষ এখনো নিরাপদ পানি পান করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ মানুষের নিরপদ পানি পান করার সম্ভাবনা আছে কিন্তু মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ নিরাপদ পানি পান করে। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে আর্সেনিক যুক্ত পানি পানকারীর হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ নেমে এসেছে। বায়োটেকনোলজি বা জৈব প্রযুক্তি ব্যবহর করে আমরা খুব সহজে ও অল্প খরচেই সহজ পদ্ধতিতে পানি পরিশোধন করেত পারি।

শেওলার মাধ্যমে পানি পরিশোধন: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের বিভিন্ন জয়গায় প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন রঙের শেওলা জন্মে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমির ঢালের লেকে জন্মানো শেওলা লেকের পানি পরিষ্কার রাখে। এইসব শেওলা দিয়ে আমরা সহজেই পানি পরিশোধন করতে পারি। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ পায়, যাতে বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল মোজাদ্দেদ আলফেসানী ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারা বেগম ও গবেষক ড. শারমিন জামান এবং সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানোটেকনোলজির অধ্যাপক আলবার্ট মিহরানিয়ান বলেন, ‘পিথোফোরা’ নামক গোত্রের শেওলা দিয়ে দূষিত ময়লাযুক্ত পানি পরিশোধন করা যায়। এটির দ্বারা পানিতে থাকা বিভিন্ন ময়লা, ক্ষতিকর উৎপাদান, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস পরিশোধন করা সম্ভব, যা কিনা পানিকে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ করে এবং পানিতে থাকা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, এমনকি ২৭-২৮ ন্যানোমিটারের ক্ষুদ্র ভাইরাসও পারিশোধন করে। এই জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে একদিকে যেমন বাংলাদেশের সকল মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব, অন্যদিকে বন্যার ফলে যে সকল পানিবাহিত কলেরা, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো রোগ দেখা দেয় সেগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব। আবার পানিতে জন্মানো এডিস মশার প্রাদুর্ভাব ও অনেকাংশ হ্রাস করা সম্ভব হবে।
ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদের মাধ্যমে পানি পরিশোধন: অনেক সময় নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা, লেক ও সমুদ্রের পানিতে নানাধরনের তৈলাক্ত পাদার্থ মিশ্রিত থাকে। পানিতে থাকা এসব রাসায়নিক কারখানার নানারকম বর্জ্য পদার্থ, গৃহস্থলির বর্জ্য এবং লঞ্চ ও জাহাজ দুর্ঘটনায় নানাধরনের তৈলাক্ত পানি পরিশোধনের জন্য আমরা জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি। এক্ষেত্রে আমরা ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ জৈব প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। এই উদ্ভিদ উষ্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্মায়। এই উদ্ভিদ জলাশয়ের নিকটে জন্মে এবং অনেক সময় পানির উপর ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি জার্মানির কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (টিআইকে) এবং বন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পরীক্ষা করে দেখেন, র্ফান জাতীয় উদ্ভিদ সমুদ্রের তৈলাক্ত পদার্থ শোষণ করতে সক্ষম। ফলে এটি তৈলাক্ত পানি পরিশোধন করে বিশুদ্ধ করে। ফিলিপাইনে এটি ব্যবহার করে পানি পরিশোধন করা হয়। বাংলাদেশের পরিবেশে এই জাতীয় উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণ জন্মে, এটি ব্যবহার করে আমরাও খুব সহজে পানি পরিশোধন করতে পারবো। যাতে করে আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ২০১৫ সালের এক জরিপে দেখা যায় পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হারে মাটির নিচের পানি উত্তোলন করে ফেলা হচ্ছে। এটা কমিয়ে আমাদের মাটির উপরের পানির উৎসের উপর বেশি জোর দিতে হবে এবং সেক্ষেত্রে আমরা জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি।

সম্প্রতি জলবায়ু বিষয়ক জাতিসংঘের প্যানেলের গবেষণা বলছে, প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ২০ ভাগ বিশুদ্ধ পানি কমে যাচ্ছে। আর এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৪০ ভাগ বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দেবে। এই বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট থেকে বঞ্চিত মানুষের বাঁচার একমাত্র উপায় হতে পারে জৈব প্রযুক্তি।
লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন