Inqilab Logo

রোববার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৯ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

তীব্র যানজটে চরম ভোগান্তি

বনানীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে : ডিজি ফায়ার সার্ভিস ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে বিমান বাহিনী, পুলিশ ও র‌

খলিলুর রহমান | প্রকাশের সময় : ২২ আগস্ট, ২০২১, ১২:০০ এএম

সরকারি ছুটির দিনেও তীব্র যানজটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। গতকাল শনিবার সকালে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় একটি বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিকান্ডের পর সামনের রাস্তায় যে গাড়ি জটলা শুরু হয়েছিল তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় দিনভর ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। এছাড়াও রাস্তার ওপরই প্রখর রোদ্রের মধ্যে বিভিন্ন যানবাহনে ঘন্টার পর ঘন্টা অতিক্রান্ত করতে হয়েছে তাদের।

জানা যায়, গতকাল সকাল ৯টা ১০ মিনিটের সময় রাজধানীর বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার এমিকনের গোডাউনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। আগুন লাগার পর কাজ নির্বিঘ্ন করতে বনানী এলাকার সড়ক বন্ধ করে দেয় ফায়ার সার্ভিস। এতে রাস্তার দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের চেষ্টায় দুপুর ১টা ১০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে বিমান বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গতকাল সন্ধ্যায় ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ভেতরে সার্চিং অভিযান শেষ হয়েছে। তারা ভেতরে কোনো হতাহত লোকজনের সন্ধান পাননি। এছাড়া তাদের কাছে নিখোঁজের কোনো দাবিদারও আসেনি। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে মো. মনিরুজ্জামান নামের একজন ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন। তারা বলছেন, গোডাউনে প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ থাকায় থেমে থেমে আগুন জ্বলছে ভবনটির ভেতরে। এছাড়া ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও তারা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। ফায়ারের কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী বলেন, ভেতরে ফাইবারের জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন ধরনের কার্টুন মজুত রাখা হয়েছিল। যখন আমরা আগুন নেভানোর জন্য পানি ছিটাই, ঠিক তখনই আগুনের ব্যাপকতায় ব্যাপক তাপ সৃষ্টি হয়। ভেতরে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব হয়নি। আমাদের চলে আসতে হয়েছে। কিছুক্ষণ পরপরই আমাদের কয়েকজন গিয়ে পানি ছিটিয়ে আবার ফিরে আসতে বাধ্য হয়। দায়িত্বরত ফায়ার সার্ভিসের আরেক সদস্য বলেন, কার্টন ও প্লাস্টিক থাকায় পানি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ব্যাপকতার পাশাপাশি ধোঁয়ার মাত্রা বেড়ে যায়। ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ভবনটি থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ভবনটির চারতলা ও পাঁচতলায় কোনও জানালা ছিল না। একপর্যায়ে আমরা চারতলা-পাঁচতলার দেয়ালের কিছু অংশ ভেঙে ধোঁয়া বের করে দিই।
জানা গেছে, এমিকন নামের প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় তলায় ছিল তাদের গোডাউন। বিভিন্ন ধরনের ক্রেস্ট তৈরি হতো এখানে। দোতলায় ছিল প্রতিষ্ঠানটির শোরুম ও কার্যালয়। অর্ডার পাওয়ার পর তিনতলার গোডাউনে প্রস্তুত হতো এসব ক্রেস্ট। মূলত দাহ্য পদার্থ সংমিশ্রণ করে বানানো হতো ক্রেস্ট। আগুন লাগার পর এসব দাহ্য পদার্থ আগুনের মাত্রা ও ধোঁয়ার ব্যাপকতা বাড়িয়ে দেয়।

এদিকে আগুন লাগার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ফায়ারের ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন। তারা এসময় বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, এ ঘটনায় কোনো পক্ষ দায়ী থাকে থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, এমিকনের গোডাউনে আগুনের ঘটনা তদন্ত করা হবে। কারো গাফিলতি পাওয়া গেলে কিংবা গোডাউনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, আগুনের খবর পাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। এখানে এমিকন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের শোরুম ও কারখানা ছিল। যেখানে প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ ছিল। ফলে আগুনের নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। এখন আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণ হলেও ভবনের ভেতরে প্রচুর তাপ রয়েছে। সেই তাপটা আমরা বের করার চেষ্টা করছি। এখানে কোনো ধরনের হতাহতের খবর আমরা পায়নি।

আগুন নিয়ন্ত্রণে ৪ ঘণ্টার মতো সময় কেন লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগুনটি মূলত একটি গোডাউনে লেগেছিল। গোডাউনে বিভিন্ন মালামাল থাকায় আগুন অনেকক্ষণ জ্বলছিল। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে অনেক আগেই এসেছে। সম্পূর্ণ নির্বাপণ করতে আরও কিছু সময় লাগবে।
প্রতিবারই আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয় ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না, পরে ভবন মালিকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ফায়ারের ডিজি বলেন, ভবনের মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সব সময় নেয়া হয়। আগুন লাগার পর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে জানিয়ে দেয়া হয় যেন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ঘটনায়ও তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) জিল্লুর রহমান জানান সাংবাদিকদের জানান, ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বলেন, এই অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির দেয়া প্রতিবেদন থেকেই আগুন লাগার আসল কারণ জানা যাবে।
ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আমরা এখনও ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দেখতে পাইনি। বলতে গেলে ভবনের নিজস্ব কোনো ফায়ারফাইটিং ব্যবস্থা ছিল না। তবে পাশের একটি ভবনে পানি যাচ্ছিল। প্রথম আধাঘণ্টা সেই পানি দিয়েই আমরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছি।

এদিকে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, বনানীর কোনো ভবনে বিল্ডিং কোড মানা হয়নি। এ কারণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো ভবনে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হবে না। তিনি বলেন, আমাদের এখানে যিনি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকতা আছেন, তাকে আমি নির্দেশ দিয়েছি এসব বিল্ডিংয়ে থেকে যারা লাইসেন্স নেওয়ার জন্য যাবে প্রতিটি বিল্ডিংয়ের মালিককে বিল্ডিং আইন মেনে ট্রেড লাইসেন্স দিতে হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মানা ছাড়া কোনো ভবনে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হবে না। তিনি বলেন, এক বিল্ডিয়ের সঙ্গে আরেক বিল্ডিং লাগানো মাঝখানে কী ব্যবস্থা থাকবে, অল্টারনেটিভ সিঁড়ি কতটা চওড়া করতে হবে সব কিছু দেখে বিল্ডিং কোড মানা হলেই কেবল ট্রেড লাইসেন্স পাবে। অন্যথায় তারা এটা পাবে না। চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় যত ট্রেড লাইসেন্স আছে সেগুলো আপতত রিনিউ হবে না।

মেয়র আরও বলেন, বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ির এই বিল্ডিংটা অনেক পুরাতন। ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে সেই সঙ্গে এয়ার ফোর্সকে ধন্যবাদ তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফোর্স পাঠিয়েছে। কেন আগুন লেগেছে আমরা এখনও বুঝতে পারছি না। এখানে আগে অনেক গার্মেন্টস ছিল। সেগুলো এখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এখানে কেউ আটকে পড়েছে এমন খবর আমারা এখনও পাইনি। ৩ টি টিম রিসকিউয়ের জন্য ভেতরে ঢুকেছে। আমাদের সিটি করপোরেশনের টিমও এখানে কাজ করছে। পেছন দিকে ভবনটির এমার্জেন্সি এক্সজিট লোহার সিঁড়ি আছে।

অগ্নিকান্ডে দিনভর যানজটের যন্ত্রণা: গতকাল যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে তখন উত্তরা থেকে ফার্মগেইট ও মহাখালীমুখী সড়কে এই যানজটে আটকা পড়েন হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া আগুন লাগার পরপরই উত্তরা থেকে ফার্মগেইটমুখী সড়কে যান চলাচল পুলিশ বন্ধ করে দেয়। ফলে বনানী, ফার্মগেইট, ময়মনসিংহ সড়ক, বিজয় সরণি, মহাখালী, তেজগাঁও, সাত রাস্তার মোড়, সোনারগাঁও, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজারসহ আশপাশের রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে দেখা গেছে। লম্বা সময় অপেক্ষার পর পরিস্থিতির উন্নতি না দেখে রোদ মাথায় করে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন অনেকে।

সকাল ১১টায় উত্তরা থেকে বাসে আসা যাত্রী হাফিজুর রহমান বলেন, বনানীর কাছ থেকে হেঁটে সচিবালয় এলাকায় গিয়েছি। দুই পাশের সড়কে কত গাড়ি আটকে ছিল তার কোনো হিসাব নাই। অটোরিকশায় তেজগাঁও সাত রাস্তা মোড়ে এসে আটকে যাওয়া ফরিদা ইয়াসমীন বলেন, সকাল ১০টায় পল্টন থেকে রওনা হয়েছি। দুপুর ১টায় সাত রাস্তায় মোড়ে যাই।

গতকাল বিকেল ৩টায় মহাখালী ডিওএইচএসের কাছে একটি প্রাইভেট কারের চালক শফিক আহমেদ বলেন, কোনো দিকেই গাড়ি ঘোরানোর পথ নেই। দুই বার চেষ্টা করেছি কিন্তু দেখলাম সব রাস্তায় গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছে স্টার্ট বন্ধ করে। একই সময় মহাখালীর কাছে ফ্লাইওভারের ওপর রোদের মধ্যে থাকা অটোরিকশাচালক নূর মিয়া বলেন, যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সন্ধ্যা পর্যন্ত মনে হয় বসে থাকতে হবে। এখনও তো কোনো আলামত দেখছি না।

এদিকে, মগবাজার থেকে অনেক গাড়ি হাতিরঝিল, রামপুরা হয়ে বিকল্প পথ অনুসরণ করতে গিয়ে সেখানেও লম্বা যানজট সৃষ্টি হয়। নতুন বাজারের কাছে একজন বেসরকারি বীমা কোম্পানি কর্মকর্তা বলেন, বিকল্প পথ অনুসরণ করতে গিয়েও রেহাই পাইনি। নতুন বাজারের কাছে আসতে আমার সময় লেগেছে পাক্কা আড়াই ঘণ্টা। বনানীর আগুনের উত্তাপ পুরো ঢাকা শহরে পড়েছে বলে মনে হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: তীব্র যানজট

২০ অক্টোবর, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ