Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

টেলিযোগাযোগ খাত - বেড়েই চলেছে বকেয়া

প্রকাশের সময় : ৪ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ফারুক হোসাইন
রাজস্ব বকেয়া বেড়েই চলেছে টেলিযোগাযোগ খাতে। টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক লিমিটেড, আন্তর্জাতিক গেইটওয়ে অপারেটর (আইজিডব্লিউ), দুই ওয়াইম্যাক্স প্রতিষ্ঠান, ইন্টারকানেশন এক্সচেঞ্জ ও আইপিটিসি অপারেটরদের কাছে সরকারের মোট রাজস্ব বকেয়া ৪ হাজার ২৭৬ কোটি টাকাও বেশি। কিছু প্রতিষ্ঠান বকেয়া পরিশোধে উদ্যোগী হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পড়ে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠান ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার ও অনুমোদন ছাড়াই মালিকানা পরিবর্তন করে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে।
এসব ঘটনার সাথে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সরকার দলীয় রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই জড়িত বলে দাবি করেছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। কমিশন সূত্রে জানা যায়, বকেয়া পরিশোধে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার তাগাদা দিলেও কোনভাবেই কাজ হচ্ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টি কেটে নেয়া এবং কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তেমন কিছুই নেই। আর নাম ঠিকানা বদলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মামলা করেই দায় সারছে বিটিআরসি। কমিশন সূত্রে জানা যায়, রাজস্ব বকেয়ার ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। এরপরেই রয়েছে রাষ্ট্রীয় মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক কোম্পানি লিমিটে। রাষ্ট্রায়াত্ত এই দুই প্রতিষ্ঠানের (বিটিসিএল ও টেলিটক) কাছে সরকারের রাজস্ব বকেয়া রয়েছে ৩ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। টেলিযোগাযোগ সেবার বিভিন্ন লাইসেন্সের বিপরীতে নিয়মিত আয় ভাগাভাগির অংশ এবং লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দ ফি পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে এ অর্থ বকেয়া পড়েছে। বকেয়া অর্থ আদায়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে আবারো চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। এর আগে গত বছরের আগস্টে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দেয় বিটিআরসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে বকেয়া অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নিতে বিটিসিএল ও টেলিটককে নির্দেশ দেয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তা সত্ত্বেও বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেয়নি প্রতিষ্ঠান দুটি। এ কারণে আবারো প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও নির্দেশনা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল ও অভ্যন্তরীণ ফিক্সড ফোনসেবা থেকে আয় ভাগাভাগির অংশ হিসেবে বিটিসিএলের কাছে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। মূলত প্রতিষ্ঠানটির পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন), ইন্টারন্যাশনাল গেইটওয়ে (আইজিডব্লিউ), ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ও ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) লাইসেন্সের আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমের বিপরীতে এ পাওনা দাঁড়িয়েছে। বিটিসিএলের আইজিডব্লিউ লাইসেন্সের বিপরীতে আয় ভাগাভাগির অংশ হিসেবে সরকারের পাওনা প্রায় ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আইসিএক্স লাইসেন্সের মাধ্যমে আয় ভাগাভাগির অংশ হিসেবে সরকারের পাওনা ৫২৬ কোটি ৮১ লাখ, পিএসটিএনের ২৫৫ কোটি ৫৫ লাখ ও আইআইজি সেবার মাধ্যমে আয় ভাগাভাগির অংশ হিসেবে আরো ৮২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।
অন্যদিকে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের কাছে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে থ্রিজি লাইসেন্সের আওতায় বরাদ্দ দেয়া তরঙ্গের ফি বাবদ বকেয়ার পরিমাণ ১ হাজার ৫৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০১২ সালের অক্টোবরে সরকার দেশের প্রথম সেলফোন অপারেটর হিসেবে টেলিটককে থ্রিজি প্রযুক্তির বাণিজ্যিক সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর অনুমোদন দেয়। থ্রিজি সেবাদানে বরাদ্দ দেয়া ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের ফি হিসেবে দুই কিস্তিতে যথাক্রমে ৯৩২ কোটি ও ৬৫৩ কোটি টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের (এসওএফ) অর্থ হিসেবে বকেয়া রয়েছে আরো ২৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে পাওনা অর্থের সঙ্গে যুক্ত হবে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও বিলম্ব ফি। নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে লাইসেন্সিং নীতিমালা অনুযায়ী বিলম্ব ফি প্রদানের বিধান রয়েছে। বিটিসিএল এবং টেলিটকের বিষয়ে বিটিআরসি’র পক্ষ থেকে বলা হয়, বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যক্রম সীমিতকরণ ও বন্ধ, ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়ন এবং লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে কমিশন। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিসিএল ও টেলিটক এক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। খাতের শৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতার সুষম ক্ষেত্র বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠান দুটির বকেয়া অর্থ পরিশোধ জরুরি।
অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস এ্যাক্সেস (বিডব্লিউএ) অপারেটর ও ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সধারী দুই প্রতিষ্ঠাননের কাছে সরকারের রাজস্ব বকেয়া রয়েছে ৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলালায়নের কাছে ৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং কিউবির কাছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি সরকারের রেভিনিউ শেয়ারিং ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ বাংলালায়নের ৬২ কোটি ৬২ লাখ এবং কিউবি’র ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধে দুই সপ্তাহের সময় দেয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করলে নির্ধারিত দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার পরের দিনই প্রতিষ্ঠান দুটির (কিউবি ও বাংলালায়ন) ১০ শতাংশ অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ (সীমিত) করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিটিআরসি। বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর এই দুই প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশ হারে অপারেশনাল কার্যক্রম সীমিত করা এবং তা শূণ্যের কোটায় নেমে আসলে তাদের লাইসেন্স বাতিল ও মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কমিশন।
বিটিসিএল ছাড়া ২৬টি আইজিডব্লিউ অপারেটর কাছে সরকারের বকেয়া ৭৪৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে পাঁচ আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটরের কাছে লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিং, ভ্যাট ও বিলম্ব ফিসহ সরকারের রাজস্ব বকেয়া রয়েছে ৬৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ এই টাকা নিয়ে এক প্রকার উধাও হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। যারা এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স পেয়েছিলেন, বকেয়া রেখে তারা দেখিয়েছেন মালিকানার পরিবর্তন। পরিবর্তিত মালিকানায় কোন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা কিংবা মালিককেই খুঁজে পাচ্ছেনা টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। যদিও বকেয়া আদায়ে এসব অপারেটরের বিরুদ্ধে ১৪ টি মামলা দায়ের করেছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এই পাঁচ অপারেটর হচ্ছে টেলেক্স লিমিটেড, ভিশন টেল লিমিটেড, রাতুল টেলিকম, কে টেলিকমিউনিকেশন্স ও বেসটেক টেলিকম। যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বকেয়া থাকার কারণে ইতোমধ্যে বেসটেক ছাড়া বাকি চার অপরেটরের লাইসেন্স বাতিল করেছে বিটিআরসি। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এসব অপারেটরের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে। এছাড়া সরকার ও আদালতের মাধ্যমে এর সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হবে। সরকার ছাড়াও মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও আইসিএক্স অপারেটর এই পাঁচ আইজিডব্লিউ অপারেটরের কাছে কয়েক কোটি টাকা পাবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টেলেক্স লিমিটেডের কাছে লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, ভ্যাট ও বিলম্ব ফিসহ সরকারের পাওনা ১০৪ কোটি ৭৪ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। ভিশন টেলের কাছে একইভাবে পাওনা রয়েছে ১৯১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, রাতুল টেলিকমের কাছে ১০২ কোটি ২৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা, কে টেলিকমিউনিকেশন্স এর কাছে ১০৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং বেসটেক টেলিকমের কাছে সরকারের পাওনা ১৩০ কোটি ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
বর্তমানে আইজিডব্লিউ কার্যক্রমে থাকা ২১টি অপারেটরের কাছে রাজস্ব ভাগাভাগির অর্থ, বিলম্ব ফি ও লাইসেন্স ফি বাবদ বকেয়া রয়েছে ১১২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আইজিডব্লিউ কার্যক্রম অব্যাহত থাকা ২১ অপারেটরের বকেয়া আদায়ে আইজিডব্লিউ অপারেটর ফোরাম (আইওএফ) এর সাথে সভা করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।
আইসিএক্স অপারেটর মাইক্রো ট্রেডের কাছে মার্চ পর্যন্ত সরকারের বকেয়া রয়েছে ১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বকেয়া পরিশোধে কিস্তির সুযোগ প্রদানের জন্য বিটিআরসি’র কাছে আবেদন করে। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে মাইক্রো ট্রেডকে ৬টি মাসিক কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আইপিটিএসপি লাইসেন্সধারী ১৮টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বার্ষিক লাইসেন্স ফি এবং রেভিনিউ শেয়ারিং বাবদ বকেয়া পাওনা রয়েছে ২ কোটি ৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। কমিশনের হিসেব অনুযায়ি গত ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ইনোভেটিভ অনলাইন লিমিটেডের কাছে ১৩ লাখ ৭২ হাজার, এক্স নেট লিমিটেডের কাছে ২০ লাখ টাকা, গ্লোবাল এক্সেস লিমিটেডের বকেয়া ৩৫ লাখ, এইডিএস বাংলাদেশের ৩০ লাখ, শাইন ১০ বিডি লিমিটেড ১৬ লাখ, চিটাগাং টেলিকম সার্ভিসের ২ লাখ, ইনফরমেশন সার্ভিস নেটওয়ার্ক সাড়ে ৬ হাজার, কমিউনিকেশন ওয়ান ১৫ লাখ, আইএস প্রোস ৫ লাখ, এইচ আর সি টেকনোলজিস ২৮ হাজার, মেট্রোনেট বাংলাদেশ ৬৮ হাজার, এক্সেস টেলিকম বিডি দেড় হাজার, সাদিয়া টেক ৫ লাখ ৮৮ হাজার, আইটি কানেক্ট ৫ লাখ, প্রীতি ইনফরমেশন ১৫ লাখ, মিডিয়া এন্ড মাল্টিমিডিয়া ১২ লাখ ৯০ হাজার, জেএফ অপটিক্যাল সার্ভিস ২০ লাখ এবং এইচএন টেলিকমের কাছে বকেয়া পাওনা ১০ লাখ টাকা। এর আগে বকেয়া অর্থ পরিশোধে এসব প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করলেও কোনো কাজ হয়নি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ