Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অধরা স্বপ্ন

প্রকাশের সময় : ৫ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের সিদ্ধান্তে ১৯৯৪ থেকে ১৯১টির বেশি দেশে দিবসটি পালিত হয়। ১৯৬৬ প্যারিস সম্মেলনে ১৩টি অধ্যায় ও ১৪৬টি ধারা-উপধারায় শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারের সুপারিশ প্রণীত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষকও হয়তো দিবসটি কবে, কেন, কী জন্য তার জবাবেও জিহ্বা সংযত রাখবেন! এ যেন ‘রবীন্দ্র-দর্শনে’র সার্থক উপলব্ধিÑ
“রাশি রাশি মিল করিতেছ জড়ো
রচিতে পুঁথি বসি বড় বড়
মাথার ওপর বাড়ি পরো পরোÑÑ
তাহার খোঁজ রাখ কি...”?
বলা চলে, গুণী শিক্ষকের মুহূর্তকাল সঙ্গ, একাকী হাজার বেলার চেয়ে উত্তম। অথচ যথোপযুক্ত আধুনিক পাঠক্রম, নিরপেক্ষ মানদ-ে যোগ্য ও পর্যাপ্ত শিক্ষকম-লী, প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী এবং ভৌত অবকাঠামো সুসমন্বিত শিক্ষণ, শিখন কৌশল প্রয়োগ, সার্বক্ষণিক নিবিড় তদারকি ছাড়া মানব সম্পদ উন্নয়নে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা গড়া যায় না। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত পাঠ্যাভ্যাস, গবেষণা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না থাকলে শিক্ষকতার উচ্চতা অবনমিত হয়! বর্তমানে শিক্ষকতা একটি নির্মোহ পেশা ও বঞ্চনার পরিভাষা হয়ে উঠেছে এবং বাড়ছে অপেশাদারিত্ব ও হতাশা। অথচ শিক্ষকতা এক মহানব্রতের নাম। প্রকৃত শিক্ষকের গুরুত্ব বোঝাতে জাপানি প্রবাদ আছে : ইবঃঃবৎ ঃযধহ ধ ঃযড়ঁংধহফ ফধুং ড়ভ ফরষরমবহঃ ংঃঁফু রং ড়হব ফধু রিঃয ধ মৎবধঃ ঃবধপযবৎ.
আমাদের দেশে মানুষ গড়ার কারিগরদের নিয়ে কারো যেন টেনশন নেই! প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্ব স্তরের শিক্ষকরা তাদের অবস্থানে ও দাবি বাস্তবায়নে হতাশ। বিশেষত এমপিওভুক্ত সবার যেন দ্রুত পরিবর্তনশীল চলমান বাস্তবতার সঙ্গে ছন্দপতন ঘটছে প্রতিনিয়ত। এমপিওভুক্তগণ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ও উৎসব ভাতা পান না। তারা পদোন্নতি, স্বেচ্ছা অবসর, বদলি সুবিধাসহ অসংখ্য বঞ্চনার শিকার। এমপিওভুক্তগণ পাননি বৈশাখী ভাতা ও বার্ষিক ৫% প্রবৃদ্ধি সুবিধা! নতুন বেতন স্কেলে সরকারিগণ ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা পেয়েছেন গত জুলাইয়ে। কিন্তু এমপিওভুক্তগণের ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অনিশ্চয়তায় অন্ধকারেই রয়েছে। এমপিওভুক্ত কেউই পদমর্যাদা অনুযায়ী বাড়িভাড়া পান না। চিকিৎসা ভাতা পাঁচশ’ টাকা যা নিতান্তই অপ্রতুল। বলা হচ্ছে, বেসরকারি শিক্ষকগণকেও আয়কর দিতে হবে। এমপিওভুক্তগণ শুধু তাদের প্রারম্ভিক বেতনের শতভাগ সরকারিভাবে পেয়ে থাকেন। তাই তাদের বঞ্চনার অবসান না ঘটিয়েই নতুন করে আয়করের বোঝা চাপানো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ তুল্য! একটি ‘জাতীয় লজ্জা’ বেসরকারি শিক্ষকরাই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র পেশাজীবী যারা সিকিভাগ(?) উৎসব ভাতা পান।
দেশ এখন এসডিজি অর্জনের পথে এবং মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু এমপিওভুক্তগণের যাপিত জীবনের পরতে পরতে না পাবার না হওয়ার ‘দুঃখের অশ্রু’ শুকিয়ে, তাদের জ্বালাময় হাহাকার আকাশের অসীম শূন্যতায় হারায়। দেশে ‘পাখি ড্রেসের’ জন্য আত্মহত্যা, ডিভোর্সের ঘটনা ঘটে। তাজরীণ, তোবা গ্রুপ বা রানা প্লাজার ঘটনায় আলোড়িত হয় দেশ-দুনিয়া। কিন্তু একজন শিক্ষক আলো ছড়িয়ে নিজেই কি থাকবেন অন্ধকারে? কে শোনাবে মানুষ গড়ার কারিগরদেরকে আশার বাণী? পেশাগত স্বার্থে শিক্ষকদের মলিন জীবনে ত্যাগ ও সংগ্রামী অভিযাত্রা দীর্ঘতর হোক তা কাম্য নয়। তাই সময় ও বাস্তবতায় শিক্ষক সমাজ অধিকারের আওয়াজ তুলে তুলে ক্লান্ত ও নিরাশ হয়ে বর্তমানে এক-একাত্ম আওয়াজে মুখরÑ যা হলো : ‘শিক্ষা জাতীয়করণ’ ও সর্ব স্তরের শিক্ষকদের জন্য ‘স্বতন্ত্র বেতনস্কেল’।
প্রবল জনশ্রুতি বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে, ২০১৯’র মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হবে। কিন্তু এমন আকাক্সক্ষার প্রণিধানযোগ্য ভিত্তি কোথায়? বরং অসঙ্গতিতে ভরপুর খ-িত জাতীয়করণের চলমান মস্ত মহড়ায়, সমস্ত শিক্ষক সমাজের মধ্যে বৈষম্য, হতাশা, অপমানের তিক্ত অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলায় একটি করে স্কুল-কলেজ সরকারিকরণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে মাউশি প্রকাশিত তালিকার প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যেই সারাদেশে মানববন্ধন, হরতাল, সড়ক অবরোধের কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমজনতা সোচ্চার হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অসংখ্য অভিযোগ-আপত্তি জমা হয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নগরায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে চলমান খ-িত জাতীয়করণ প্রক্রিয়া বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ক্ষেত্রভেদে প্রতিষ্ঠানের বয়স, অবস্থান, অবকাঠামোগত সুবিধা, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায় আনার প্রাসঙ্গিকতাও উপেক্ষিত। বারবার তালিকা পরিবর্তন, সংশোধন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সদয় সম্মতিপত্র প্রাপ্তির পরও কাক্সিক্ষত ফল পেতে নীতিমালা তৈরির অপেক্ষা, জরিপ ইত্যাদির সুযোগে দীর্ঘসূত্রতা, পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়ম, দুর্নীতি, দুর্নামের নতুন আবহ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। কাজেই, আংশিক জাতীয়করণের ফলে যে এলাকার শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবে তাদের কি ওই এলাকায় জন্মগ্রহণ ছিল অন্যায়? এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কি হতাশা সৃষ্টি হবে না? জন্মগত অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীকে খ-িত জাতীয়করণের উপজাত বঞ্চনার গহ্বরে নিক্ষেপ করা যায় না। বরং সামগ্রিক জাতীয়করণের মাধ্যমেই সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ সম্ভব।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমবেত হওয়া সব পেশাজীবীরই মৌলিক অধিকার কিন্তু টিকে থাকা ও নিজেকে মেলে ধরার সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ গড়ার কারিগরদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গ্লানিকর। অভিন্ন সিলেবাসে পাঠদানকারী শিক্ষকদের প্রায় শতভাগ বেসরকারি! এমন পটভূমিতে শিক্ষক সমাজের অন্যতম চাওয়া : বিচ্ছিন্ন ও খ-িতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পরিবর্তে স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সামগ্রিক জাতীয়করণ। স্থায়ী, সংবিধিবদ্ধ শিক্ষা কমিশন গঠন করা। যথাশীঘ্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া সচল করা। পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের ২০ ভাগ অথবা জিডিপির শতকরা ৬ ভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। পিএসপি, জেএসসি, সৃজনশীল পদ্ধতির অভিনবত্ব, অস্পষ্টতার অবসান ঘটানো। এ সংক্রান্ত পূর্ণ প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দ্রুত সম্পন্ন করা। তথাকথিত ‘শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো’র কল্পনা পরিহার করা। বরং যা আছে, যেমন আছে তাকে অব্যাহত রেখে ক্রমশ তার মানোন্নয়ন, ভিত্তি সুদৃঢ়করণ বেশি জরুরি। কেননা, ‘ঢেলে সাজানো’র কথা বলে শুধু ঢালা হয় সাজানো হয় না!
আফসোস! কে শোনে কার কথা। বছর ফুরিয়েও বন্ধ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক গ্যাড়াকল মুক্ত হয়নি। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধের দায় তো কর্মরতদের নয় অথচ শূন্যতা পূরণে তারাই অতিরিক্ত শ্রম দিচ্ছেন বিনা পারিশ্রমিকে। আইসিটি, উৎপাদন ব্যবস্থাপনাসহ অনেক নতুন বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের এমপিওভুক্তি অনন্ত অপেক্ষার প্রহর গুনছে। স্কুলের অতিরিক্ত শাখায় নিয়োগপ্রাপ্ত ও কলেজের অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি যেন নিষিদ্ধ দাবি! এ যেন হাত-পা বেঁধে সাঁতরানোর প্রয়াস! মাদরাসার বেলায়ও রয়েছে ঘোষিত, অঘোষিত নানান অবহেলা! অন্যদিকে অবসরে গেলেও সরকারি পাওনাদি অনেকের হায়াতে নাগাল পায় না!
যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত উন্নত সে দেশ তত উন্নত। অথচ শিক্ষকের জীবনমানের উন্নতি ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন অসম্ভব। কেননা, জাতিকে খাড়া ও সোজা রাখার শক্তি জোগান তারাই। এ জন্যই সর্বসম্মত জাতীয় গণদাবিÑ ‘শিক্ষা জাতীয়করণ’। কোনো কোনো আমলা, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অনেকের বিশ্লেষণেই পাওয়া যায়Ñ ‘শিক্ষা জাতীয়করণে’র জন্য অর্থের চেয়ে নীতি ও সুস্পষ্ট ঘোষণাই বেশি জরুরি। সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নযোগ্য একটি চলমান প্রক্রিয়া হতে পারে। যথাÑ ১ম স্তর : স্বাধীনতা পূর্বকালীন প্রতিষ্ঠান। ২য় স্তর : ১৯৭২ থেকে ২০০০ এর মধ্যের প্রতিষ্ঠান। ৩য় স্তর : ২০০১ থেকে ২০১৬ এর মধ্যের প্রতিষ্ঠান।
অথবা, ১ম পর্যায়ে : উপজেলা সদরের একটি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা। ২য় পর্যায়ে : প্রত্যেক ইউনিয়নে জ্যেষ্ঠতা ক্রমানুসারে একটি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা। ৩য় পর্যায়ে : ১৯৭২ থেকে ২০০০ এর মধ্যের সব প্রতিষ্ঠান। ৪র্থ পর্যায়ে : সমগ্র শিক্ষা খাত জাতীয়করণ।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ইউনেস্কোর সুপারিশমালা স্মরণীয়। যাতে শিক্ষকের চিকিৎসা-স্বাস্থ্যসেবা, ছুটি বেতন-ভাতা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে বলা আছে (ক) সম্মানজনক পারিতোষিক নিশ্চিতকরণ (খ) যুক্তি সঙ্গত জীবনমান বিধান কল্পে সুবিধাদি নিশ্চিতকরণ (গ) স্কেল অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা (ঘ) জীবন ধারণের ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও বর্ধিত বেতন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ইত্যাদি।
বস্তুত শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও অধিকারের স্বীকৃতি তাদেরই সম্মান বাড়ায় যারা শিক্ষা ও শিক্ষক দরদী। তাই সবার প্রত্যাশা ‘দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা’ অচিরেই জাতীয়করণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। কেননা, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বড়ই বেমানান শোনাবে যদি লাখ লাখ ‘সাদা অন্তর’ গুমড়ে কেঁদে ওঠে:
“আমি যেন সেই ভাগ্যাহত বাতিওয়ালা
পথে পথে আলো দিয়ে বেড়াই
কিন্তু নিজের জীবনেই অন্ধকার মালা”।
(‘তালেব মাস্টার’: আশরাফ সিদ্দিকী)
ষ লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।