Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ০৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

দিক দর্শন আহলে বাইতের পরিচয় ও ফজিলত

প্রকাশের সময় : ৬ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মোহাম্মাদ খায়রুল বাশার
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এই সন্ধির ব্যাপারে খলিফা হযরত হাসান (রা.) হাশিম বংশীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। হযরত হুসায়েন (রা.) এই সন্ধির ব্যাপারে প্রথমে অমত প্রকাশ করলেও পরে রাজি হয়েছিলেন। কারণ তিনি মনে মনে বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই সন্ধি-চুক্তি রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। পরবর্তীতে তা-ই সত্যে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের পঞ্চম খলিফা হযরত হাসান (রা.)-এর খেলাফতকাল ছিল মাত্র ৭ মাস ২৬ দিন। ইরাক ছাড়া হিমাস এবং খুরসানও তার শাসনাধীনে ছিল বলে জানা যায়। (সিয়ারুস্্ সাহাবা : খলিফা হযরত হাসান (রা.) প্রসঙ্গ) সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের পর মুয়াবিয়া (রা.)-এর অনুরোধে হযরত হাসান (রা.) কুফার মসজিদে, ভিনমতে আমরুহে এক জনসভায় ক্ষমতা পরিত্যাগের কথা ঘোষণা করেছিলেন। অতঃপর হযরত হাসান (রা.) মদিনায় চলে যান এবং বাকি জীবন সেখানেই অতিবাহিত করেন। তিনি অধিকাংশ সময় ইবাদতে মশগুল থাকতেন। ইতিকাফ ও তাওয়াফ পরিত্যাগ করে তিনি মানুষের প্রয়োজন মিটাতে উন্মুখ থাকতেন। তিনি মুক্তহস্তে দান করতেন। দুবার সমস্ত ধন-সম্পদ এবং তিনবার অর্ধেক ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন (উসদুল গাবা)। হযরত হাসান (রা.) মহৎ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ক্ষমতালোভী ছিলেন না। মুসলমানদের মধ্যে শান্তি ও ঐক্য বজায় থাকুক, তিনি মনেপ্রাণে ইহা চাইতেন। তিনি তার মনের এই ইচ্ছা খিলাফতের দায়িত্ব পরিহার করে বাস্তবে পরিণত করে চারিত্রিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন।
তার তিনজন স্ত্রীর নাম জানা যায়। যথা (১) উমনু বাশীর। তিনি ছিলেন আবু মাসউদ আনসারী (রা.)-এর কন্যা। (২) খাওলাহ এবং (৩) জা’দা। কোনো কোনো গ্রন্থে তার বহু বিবাহের কথাও উল্লিখিত হয়েছে (সিয়ারুস সাহাবা)। ঐতিহাসিক আল ইয়াকুবীর তারিখে তার নি¤েœাক্ত পুত্রদের নাম উল্লেখ আছে। (১) আল্্ হাসান (রাহ.); (২) যায়েদ (রাহ.); (৩) উমার (রাহ.); (৪) আল কাসিম (রাহ.); (৫) আবু বাকর (রাহ.); (৬) আবদুর রহমান (রাহ.); (৭) তালহা (রহ.); (৮) উবায়দুল্লাহ (রাহ.)। হযরত হাসান (রা.) ১৩টি হাদিস রিওয়ায়াত করেছেন (তাহযিবুত তাহযীব : ২:১২৯৫)। তিনি কিছু ফতওয়াও প্রদান করেছেন। তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর বাগ্মী ছিলেন। কিছু কবিতার রচয়িতা বলেও তার সুখ্যাতি পাওয়া যায় (ইবনুর রাশীক : কিতাবুল উমদাহ)। ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)-এর মতে, তিনি হিজরি ৫০ সালে রবিউল আউয়্যাল মাসে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তার বয়স তখন ৪৬ অথবা ৪৭ বছর হয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন মত পরিদৃষ্ট হয়। তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে (ক্ষয় রোগে) মারা যান (দীনাওয়ারী)। অন্যান্য মতে, বিষ প্রয়োগে তার মৃত্যু হয়। তার স্ত্রী জা’দা বিন্তে আল্্ আশয়াছ এই বিষদাত্রী। আবার কারো মতে, আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইঙ্গিতে এই বিষ প্রদান করা হয়। স্ত্রী-জা’দা সতীনদের প্রতি ঈর্ষাবশত এ কাজ করেছিলেন বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের ধারণা। কোনো কোনো ঐতিহাসিক আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর সংশ্লিষ্টতার কথাটি কল্পিত এবং উমায়্যাদের বিরোধীদের রটনা বলে মন্তব্য করেছেন (সিয়ারুস্্ সাহাবা : ৬:৯৩-১০৩; ইবনে খালদুন : ২:১৮২; ইবনে তায়মিয়া : মিনহাজুস্্ সুন্নাহ : ২:২২৫)।
আহলে বাইতের পরিচয় ও ফজিলত প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর ১৪ জন পুত্রসন্তান এবং ১৭ জন কন্যাসন্তান ছিলেন। রাসূলে পাক (সা.)-এর কন্যা খাতুনে জান্নাত মা ফাতিমা যাহরা (রা.) যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন তিনিই ছিলেন হযরত আলী (রা.)-এর একমাত্র পতœী। তার গর্ভে জন্মলাভ করেন হযরত হাসান (রা.), হযরত হুসাইন (রা.) এবং হযরত মুহাস্সীন (রা.)। হযরত মুহাস্সীন (রা.) শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। খাতুনে জান্নাত মা ফাতিমা (রা.)-এর গর্ভে দুজন কন্যাসন্তানও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হযরত বড় যায়নাব (রা.) এবং হযরত বড় উন্মু কুলসুম (রা.)। (তাবারী : ১ম খ., পরিচ্ছেদ ৩৪৭১) হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর বংশধরদের অধিক সংখ্যকই ছিলেন ভাগ্যবিড়ম্বিত ও কূট ষড়যন্ত্রের শিকার। বিশেষ করে আমীরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে ‘খিলাফাতুন আলা মিনহাজিন নাবুওয়্যাত’কে চিরতরে পরিত্যাগ করে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর বংশধরদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টিম রোলার। তাদের দুঃখের কাহিনীতে তৎকালীন মুসলিম ইতিহাস পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। হযরত আলী (রা.)-এর বংশের যে সকল পুণ্যাত্মাগণ নিপীড়িত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ঐতিহাসিক মাসউদী তার মুরুজ গ্রন্থের ৭ম খ-ের ৪০৪ পৃষ্ঠায় তাদের একটা তালিকা উল্লেখ করেছেন। এই তালিকায় উল্লিখিত পুণ্যাত্মাদের নাম পাঠ করলে প্রত্যেক বিশ্বাসী মুসলমানের অন্তরাত্মা কেঁপে না উঠে স্থির থাকতে পারে না। আর পারে না বলেই আহলে বাইতের প্রতি বিন¤্র চিত্তে সালাম সম্ভাষণ জ্ঞাপন করে অনেকেই মনের জ্বালা নিরসনে যতœবান হয়ে থাকেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন