Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬, ২৩ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

বিভাজন সৃষ্টির পথ পরিহার করতে হবে

প্রকাশের সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিরাজমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেছেন, বিচার বিভাগ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। অলোচনা সভায় প্রধান বিচারপতির অবসরে গিয়ে রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী Ñ এ বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে বিতর্কের জন্ম দেয়া অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে বিকারগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত ও উন্মাদ হিসেবে অভিহিত করে বিচার বিভাগের ভাবমর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি এবং প্রখ্যাত আইজীবীরা। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করা, ‘তাকে মানি না’ বলে হুঙ্কার দেয়া অনভিপ্রেত, অনাকাক্সিক্ষত এবং অবিচারকসুলভ বলে তারা মত দিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের আচরণ সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর কর্মকা-ে অভাবনীয় এক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং এর প্রভাবে বিচার বিভাগের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। দেশের মন্ত্রিসভায় অনুমোদনকৃত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেছেন, শুনেছি এটি সংসদের পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকায় যে সংবাদ দেখেছি তা খুবই বিপজ্জনক। ওই আইনে রাজাকারদের নাগরিকত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে। রাজাকারের সম্পদ তার ছেলেমেয়েরা ভোগ করতে পারবে না। রাজাকাররা তো চলে গেছে ৪০-৪২ বছর আগে। তিনি আরো বলেছেন, আমরা যেভাবে চলছি তাতে তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হচ্ছে। বাবার শাস্তি ছেলে ভোগ করবে Ñ ফৌজদারি আইনে একজনের শাস্তি আরেকজন ভোগ করতে পারে না। গণতান্ত্রিক সরকারে এসব থাকার কথা নয়, জনগণের জন্য আইন হওয়ার কথা Ñ এ বিষয়ে দেখা উচিত আমরা কোথায় যাচ্ছি?
রাষ্ট্র পরিচালনার যে তিনটি সাংবিধানিক বিভাগ তার মধ্যে বিচার বিভাগ অন্যতম। দেশে সুশাসন, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার Ñ যা কিছুই বলা হোক না কেন, তার সাথে সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে বিচার বিভাগের। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, গত কিছুদিনে অবসরে গিয়ে রায় লেখা অসাংবিধানিক প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ নিয়ে সংসদে কথা হয়েছে। কোনো কোনো সংসদ সদস্য প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে উস্কানিমূলক বলেও অভিহিত করেছেন। দেশের বিশিষ্ট আইনবিদ ও প্রবীণ আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির বক্তব্য সমর্থন করেছেন। এই বাস্তবতায় প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতিকে ডিনারে দাওয়াত জানালে তা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতি। তিনি বলেছেন, এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্টেল করা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নানামাত্রিক আলোচনা যখন স্থান করে নিয়েছে, তখন সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এবং সংসদের জন্য অপেক্ষায় থাকা নাগরিকত্ব আইনের অনুমোদিত খসড়া নিয়ে যে প্রসঙ্গ তুলেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই একই বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে বর্তমান অইনমন্ত্রী বলেছিলেন, তাদের বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবেই বিচার করা হয়েছে। সুতরাং সহজেই একথা বলা যেতে পারে, যাদের বিচার হয়ে গেছে তাদের সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা কতটা সমীচীন তা চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি যেমন বলেছেন, একজনের অপরাধে ফৌজদারি আইনে অন্যজনকে শাস্তি দেয়া যায় না, ইসলামের বিধানও তাই। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, দেশে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি এবং দেশে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ জিইয়ে রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা দেশের মধ্যকার স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা ও ঐকমত্য সৃষ্টির অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে সর্বত্রই চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য। আইনের শাসনের ঘাটতির বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি যখন বিচার বিভাগকে একটি নিয়ম-শৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন যা ঘটছে তার নানামাত্রিক নেতিবাচক প্রভাবের কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা যে দেশে স্থায়ী বিরোধের ইঙ্গিতবাহী, সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি। এটা কোনো শুভ লক্ষণ নয়। সংশ্লিষ্টরা জাতীয় স্বার্থকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে দেশকে বিভেদ-বৈষম্য থেকে মুক্ত রাখতে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেবেন, এটাই প্রত্যাশিত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন