Inqilab Logo

শনিবার, ২১ মে ২০২২, ০৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

নারী পাচার রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

আর কে চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২:০২ এএম

প্রযুক্তির অপব্যবহার জনজীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। নারী পাচারের ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখছে। পাচারকারী চক্র টিকটক, লাইকি, ফেসবুক, ইমো, ভাইবার, ডিসকড, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির অ্যাপস ব্যবহার করে পাচারের জন্য নারীদের সংগ্রহ করছে। দালাল নিয়োগ করেও নানা কৌশলে নারীদের পাচার করে দিচ্ছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে। নারী পাচারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে ৩০টি বা তারও বেশি নারী পাচারকারী চক্র সক্রিয়। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহপরিচারিকার চাকরির নামে নারী পাচারের ঘটনাও ঘটছে এবং এর সঙ্গে জড়িত আদম ব্যাপারি নামের মানব পাচারকারী চক্র।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বছরে ৫০০ ও আট বছরে ১ হাজার নারী পাচারের শিকার হয়েছেন, যাদের বয়স ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। ২০২০ সালে দেশে মানব পাচারের যে ৩১২টি মামলার বিচার হয়, তার ২৫৬টি ছিল নারী পাচার ও যৌন সহিংসতা-সংক্রান্ত। এছাড়া গত চার বছরে বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার নারী সউদী আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গেছেন। যার একটি অংশ যৌন নিপীড়নসহ নানামুখী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেশ থেকে নারী পাচারের যত ঘটনা ঘটে তার একটি ক্ষুদ্র অংশই গণমাধ্যমে আসে। সাধারণত পাচারের শিকার যারা তার অধিকাংশের পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ করা কিংবা গণমাধ্যমের শরণাপন্ন হওয়ার মতো বোধশক্তির অধিকারী নন। ফলে দেশে নারী পাচারের ঘটনা অহরহ ঘটলেও তার ভয়াবহ আকার সম্পর্কে অবহিত নন সমাজের সচেতন মানুষও। নারী পাচার বন্ধের প্রধান উপায় হলো গণসচেতনতা সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা হাজার হাজার নারীর সর্বনাশ ডেকে আনছে। যার অবসানে সরকারসহ সব সামাজিক শক্তিকে সক্রিয় হতে হবে।
এশিয়ার মধ্যে নারী পাচার ঘটনার দিক থেকে নেপালের পরই বাংলাদেশের স্থান। পাচারকারীরা বিভিন্ন পথে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে স্থল, পানি বা বিমান পথে। বাংলাদেশ থেকে পাচারের যে উদাহরণগুলো পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় বিমানযোগে কিছু পাচার হয়, তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমেই বেশিসংখ্যক নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এ দেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ২২২ আর মিয়ানমারের সঙ্গে ২৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর সীমানা দিয়েই পাচার হয় বেশি। যশোরের বেনাপোল, সাতক্ষীরার শাকারা, ভোমরা, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, কক্সবাজার, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুঁড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছয়টি রুটসহ অন্তত ১৮টি রুট দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে পাচার হচ্ছে নারী-শিশু। সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। সূত্রমতে, প্রতি বছরই ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি নারী-শিশু পাচার হচ্ছে ভারতে। যদিও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের তথ্যানুসারে, বছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত হয়ে বিভিন্ন দেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়। ভারতের প্রায় প্রতিটি যৌনপল্লীতে রয়েছে বাংলাদেশি নারী। পাচারের পর শুরু তাদের বন্দীজীবন। স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ। যৌনপল্লী ঘিরে সার্বক্ষণিক পাহারাদার। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাচারকারীরা চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত পার করে নিয়ে যায় ভারতে।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৩০ হাজার নারী ও শিশু দালালের হাতে পড়ে পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার এবং মেয়েশিশু ১০ হাজার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে ২০০ থেকে ৪০০ তরুণী ও শিশু পাচার হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানে। ভারতীয় সমাজকল্যাণ বোর্ডের সূত্রমতে, ভারতে মোট ৫ লাখ বিদেশি যৌনকর্মী রয়েছেন। এর শতকরা ১ ভাগ বাংলাদেশি এবং কলকাতায় এ সংখ্যা শতকরা ২.৭ ভাগ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখের বেশি নারী-শিশু পাচার হয়েছে ভারতে। তবে এনজিওগুলোর দাবি পাচারের সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। ইউনিসেফ ও সার্কের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এ দেশ থেকে কমপক্ষে ১০ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিনিয়ত বড় একটি সংখ্যায় নারী ও শিশু নিখোঁজ হচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন মাসে চাঁদপুর জেলা থেকে ৪১৩ জন নারী নিখোঁজ হয়। জেলার আট থানায় ছয় মাসের জিডি ও মামলা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়। এদের মধ্যে ৩৯৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯ জনকে উদ্ধার করা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এদের কেউ কেউ পাচারের শিকার হয়েছেন। এসব নারী ও কিশোরীর বেশির ভাগই ঘর ছেড়েছেন ফেসবুকসহ তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে।

একই সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার পাঁচটি থানায় ২১ নারী-শিশু অপহরণের মামলা হয়। যার মধ্যে পাঁচটি মামলার ভিকটিম উদ্ধার করা যায়নি। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গাইবান্ধায় অপহরণ ও নিখোঁজের মামলা হয়েছে ৮২টি। গাজীপুর জেলার পাঁচ থানায় ২৪৮ নারী ও শিশু নিখোঁজের মামলা হয়েছে। এ ছাড়া মানব পাচারের মামলা হয়েছে দুটি। মেহেরপুরের তিন থানায় ও নারী-শিশু অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে ৪২টি। একই সময় ময়মনসিংহ জেলায় ৪৭৪ নারী ও শিশু নিখোঁজের তথ্য জানিয়ে জিডি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে মোবাইল ফোনে প্রেম পরে তরুণীকে বিয়ে ও মোটা অংকের বিনিময়ে স্ত্রী এবং শ্যালিকাকে ভারতে পাচারের তথ্য উদঘাটন করে র‌্যাব। নারী পাচারকারীচক্র দেশের শত্রু। এদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে পাচার হয়ে যাওয়া তরুণীদের ফিরিয়ে আনার জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নারী পাচার


আরও
আরও পড়ুন