Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫ পৌষ ১৪২৫, ১১ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

ব্যাংকের অসহযোগিতায় তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে না

প্রকাশের সময় : ৭ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

অর্র্থনৈতিক রিপোর্টার : মো: কাজিম উদ্দিন খন্দকার ২০০৪ সালে নটরডেম কলেজ থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে, অর্থনীতিবিদ হওয়া তার স্বপ্ন ছিল না। স্বপ্ন ছিল একজন তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার।
সেই লক্ষ্যে প্রথম বিভাগে অনার্স সম্পন্ন করলেও তিনি চাকরির জন্য আজ পর্যন্ত কোন আবেদনই করেননি। কাজিম জানান, অর্নাস লাইফে পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনির অর্থ জমিয়ে ২০১২ সালে রাজধানীর পলওয়েল সুপার মার্কেটে একটি কাপড়ের শো-রুম দেন। বৈধ ট্রেড লাইসেন্স এবং টিআইএন সার্টিফিকেটের মাধ্যমে সরকারকে ইতিমধ্যে ৭৬ হাজার টাকা আয়করও পরিশোধ করেছেন। তবে আরও বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন কাজিমের।
এজন্য তার প্রয়োজন ব্যাংক ঋণ। ২০১২ সাল থেকেই কাজিম লেনদেন করেন ব্যাংক এশিয়ার পল্টন কর্পোরেট শাখায়। শাখা-ব্যবস্থাপক তাকে ঋণ সহযোগিতার স্বপ্ন দেখালে তিনি আরও ৭ লাখ টাকা দিয়ে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে একটি শো-রুমের জন্য অগ্রিম করেন। এর মাঝেই শাখা ব্যবস্থাপকের পরিবর্তন হলে কাজিমের স্বপ্ন ভাঙে। নতুন ম্যানেজার তাকে কোন ঋণ দিবে না বলে জানিয়ে দেন। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। ভাঙে তার বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন।
এরপর তিনি মতিঝিলে আর একটি সরকারি ব্যাংকে চলতি হিসাব খুলে লেনদেন করতে থাকেন। কিন্তু এই ব্যাংকে জামানত ছাড়া কোন ঋণ দেওয়া হয় না জানতে পারেন ছয় মাস পর। ততদিনে কাজিমের পলওয়েলের ব্যবসাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কাজিমের দাবি, শুধুমাত্র ব্যাংকের অসহযোগিতায় তার স্বপ্ন আজ ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে। এবং এখন তিনি উদ্যোক্তা নন, ব্যক্তিগত ঋণের দায়ে রাস্তায় ঘুরছেন।
রাজধানীর ব্যাংকপাড়া খ্যাত মতিঝিলে এরকম হাজারো তরুণ উদ্যোক্তার দেখা পাওয়া যায়, যারা নতুন নতুন আইডিয়া এবং ব্যবসার প্লানিং বের করলেও ব্যাংকগুলোর সামান্য সহযোগিতার অভাবে স্বপ্ন পূরণ করতে পারছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এমবিএ করছেন ইরফান আহম্মেদ। রাজধানীর লেদার কলেজ থেকে ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দুবছর কাজ করেছেন বেঙ্গল ফুটওয়্যারে। তবে স্বপ্ন তার উদ্যোক্তা হওয়ার। তাই চাকুরী ছেড়ে দুবছর ধরে ঘুরছেন ব্যাংকের পিছনে। রুপালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে ৩০ কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল জমা দিয়ে ২০ কোটি ঋণ আবেদন করেছিলেন তিনি। বছর যায়, কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হয় না।
ইরফান বলেন, ’৮০ এর দশকে যখন চায়না গার্মেন্টস সেক্টর ছেড়ে ফুটওয়্যারে যায় তখন বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্প ঢোকে। আজ সেই সময়ের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা সারাদেশের ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ঠিক আজ থেকে একদশক পর ফুটওয়্যার ব্যবসায়ীরা দেশে নেতৃত্ব দেবে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চীন এখন ফুটওয়্যার ছেড়ে হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিতে ঝুঁকেছে। যার ফলে এখন  ঢাকার রাস্তা ঘাটেও ফুটওয়্যারের বিদেশি ক্রেতা মিলছে।
এই তরুণ উদ্যোক্তা আরো বলেন, এখন সারাদেশ মিলে রপ্তানীযোগ্য ফুটওয়্যার ইন্ডাট্রিজ আছে মাত্র ৪৫টি। আগামী পাঁচ বছরে তা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু সব কাগজ ঠিক থাকলেও কমিশনের সংস্কৃতির কারণে তিনি উদ্যোক্তা হতে পারছেন না। তবে যাদের কাগজপত্র কিছুই নেই তারা শুধু কমিশন দিয়ে হাজার কোটি টাকা লোপাট করছেন বলে অভিযোগ এই উদ্যোক্তার।
অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান সেন ট্রেডার্স। এর মালিক পলাশ কে. সেন ৩ মাস ধরে ঋণের জন্য ঘুরছেন শাখাটিতে। কিন্তু ফলাফল শূণ্য। কলকাতা থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা এই তরুণ উদ্যেক্তা বলেন, নতুন উদ্যোক্তাদের পাত্তাই দিতে চায় না দেশের ব্যাংকগুলো। আমরা ভাল কিছু করি এটা তারা চায় না। ঋণ নেওয়া তো দুরের কথা, একটি হিসাব খুলতে গেলেও তরুণ উদ্যোক্তাদের দিনের পর দিন ঘুরতে হয় ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, প্রত্যেক ব্যাংকারের উচিত একজন করে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরী করা। যদিও ব্যাংকগুলো এখন সিন্ডিকেটের কবলে বন্দী। কমিশন ছাড়া রাষ্ট্রয়ত্ব ব্যাংকে ঋণ মেলা ভার। ব্যাংকাররা যদি নিরাপদ থাকতে চায় তবে অবশ্যই শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা খুজে বের করে বিনিয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উদাসীন বিধায়, প্রত্যেক বছর জিডিপির গ্রোথ বাড়লেও তার সুফল প্রান্তিক জনগণ পাচ্ছেন না। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের খুব সহজে যেন ঋণ মেলে এবিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তিশালী নীতিমালা তৈরী করা উচিত। তবেই দেশের উৎপাদশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিষয়ে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। তারা ব্যাংক থেকে যেন দ্রুত সহজ শর্তে জামানত ছাড়া ঋণ পায় এরকম একটি নীতিমালা তৈরী করা হচ্ছে। চলতি মাসেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ