Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

পাকিস্তানের পরবর্তী সেনাপ্রধান নির্বাচন নওয়াজের প্রধান কৌশলগত কাজ

প্রকাশের সময় : ৮ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক সংকটজনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে এবং ছায়াগ্রুপগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলছে যে নয়া কোনো সমঝোতায় না পৌঁছনো পর্যন্ত উভয় পক্ষই সুযোগ সন্ধানে নিয়োজিত থাকায় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এ ধরনের মারাত্মক অবস্থা চলতে থাকে।
যখন তা শেষ হবে তখন কে গুলি ছুঁড়বে?
ভারতীয় পক্ষে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃঢ় নিয়ন্ত্রণেই সব কিছু আছে বলে মনে হয়। তিনি সশস্ত্র বাহিনী ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের পরামর্শ এবং প্রবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবি ও সোচ্চার মিডিয়া যন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছেন। সে তুলনায় পাকিস্তানের পরিস্থিতি অনেক বেশি তালগোল পাকানো। সেখানে নতুন করে গড়ে উঠছে বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক যার ফলাফল এখনো পর্যবেক্ষকদের কাছে অস্পষ্টতার আড়ালে ঢাকা।
এটা স্পষ্ট যে এর অনেকটাই নির্ভর করছে কী ধরনের ব্যক্তি পাকিস্তানের পরবর্তী সেনাপ্রধান (সিওএএস) হচ্ছেন। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল রাহেল শরিফ নভেম্বরে অবসরে যাচ্ছেন।
গত দু’ বছর ধরে পাকিস্তানের ক্ষমতার বিভক্তি দেখা গেছে এ রকম ঃ জেনারেল রাহেল শরিফের অধীনে সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের সকল জাতীয় নিরাপত্তা নীতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। পক্ষান্তরে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ সরকার অর্থনীতি, সরকারী দফতরসমূহ এবং সেনাবাহিনী যতটা ছাড়তে ইচ্ছুক ততটা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকগুলোর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত।
কথা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর পদটি কি পাকিস্তানে আদৌ কোনো বিষয়?
এ হচ্ছে যেন ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বিরাজ করা দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার নীরব প্রত্যাবর্তন যখন ব্রিটিশ রাজ স্বীকার করত যে কিছু গণতান্ত্রিক সম্মতির ব্যবস্থা ছাড়া শাসন পরিচালনা করা অসম্ভব। তারা একই সাথে বিশ^াস করত যে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের বিশ^াস করা যায় না।
স্বাধীনতার পর ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা বেসামরিক নেতৃত্ব ভারতীয় সামরিক বাহিনীর মধ্য থেকে এ ধরনের মনোভাব নির্মূল করে, অন্যদিকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শ্রেণির মধ্যকার ঠেলাঠেলি ও দ্বন্দ্ব সে দেশের অফিসার কোরের মধ্যে এ ধারণা আরো শক্তিশালী করে।
নওয়াজ শরীফের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর অবিশ^াস গভীর হয় ও পরিস্থিতির উপর তা সরাসরি প্রভাব ফেলে। ব্যাপক প্রচারিত ও দীর্ঘস্থায়ী দাবি যে চিনি ও ইস্পাত শিল্পে শরীফের পারিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থ (কোটি কোটি ডলার) আদর্শ বা জাতীয় স্বার্থ নয়, বরং ভারতের প্রতি তার সমঝোতার পরিচয় বহন করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ গুজব এত ক্ষতিকর যে তা অস্বীকারের জন্য নওয়াজের পুত্র পাকিস্তানের সর্বাধিক দর্শক দেখে একটি টিভি টকশোতে হাজির হন।
১৯৫০-এ দশক থেকেই পাকিস্তানে বোঝা হয়ে যায় যে কোনো পক্ষের ক্ষমতায় আসার জন্য নির্বাচনই একমাত্র পন্থা নয়। সে সময়ই ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে দেশে একটি বেকায়দা পরিস্থিতি তৈরি এবং সুন্দরভাবে ক্ষমতাসীন সরকারকে বিদায় করার কৌশল ব্যবহৃত হয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর নওয়াজ শরীফ সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান ও ও তার পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সূচিত এ ধরনের আন্দোলনের সম্মুখীন হন। ২০১৪ সালে পিটিআইর বিক্ষোভ এবং অভ্যুত্থান এড়াতে নওয়াজ শরীফ রাহেল শরিফের সাথে ভারতসহ তার পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বিনিময় করেন।
২০১৪ সালে এক রেশম কোমল অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে, পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী পদের কি কোনো গুরুত্ব আছে? সংক্ষিপ্ত জবাব হলÑ হ্যাঁ। ঔপনিবেশিক আমল বা এমনকি সামরিক স্বৈরাচারের সাথেও পার্থক্য এই যে বর্তমান ক্ষমতা ভাগাভাগির বিষয় কোনো আইনে লিখিত নেই। একজন সেনাপ্রধান ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতার তুলনায় অবশ্যই পাঞ্জাব প্রদেশে অধিকতর জনসমর্থন পাবেন যেটি কিনা পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল ও সম্পদশালী প্রদেশ। এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিণতি সেনাবাহিনীর শক্তি কর্তৃক পূর্বানুমানের অনেক বাইরে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর টেফলন সদৃশ ও কুখ্যাত দুর্নীতিবাজ স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানির চাপের মুখেও ২০০৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পুরো মেয়াদ দক্ষতার সাথে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন।
যদিও জারদারি কিছু নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারপরও তা ছিল পাকিস্তানে সামরিক কর্তৃত্বের এক নয়া প্রভাত। জারদারি নওয়াজ শরীফের চেয়ে ভালো করেছিলেন। তিনি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংহতি প্রতিষ্ঠায় দক্ষতার সাথে বিরোধীদের কাছে পৌঁছনো দ্বারা রাজনীতি ভালো খেলেছিলেন।
তবে তার বিপরীত পক্ষের মেধার সাথে এ ছিল এক বড় বিষয়। জেনারেল কায়ানি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপর হামলাকারীদের খুঁজে বের করার ব্যর্থতা, পাকিস্তানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া এবং আর্থিক স্বার্থের বিরোধ বিষয়ে বহু প্রশ্নের গুঞ্জনের সম্মুখীন হন যার সব কিছু এমন প্রতিধ্বনি তোলে যাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোশাররফের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সেনাবাহিনীরও জনপ্রিয়তা ক্ষুন্ন হয়।
তুলনায় জেনারেল রাহেল শরিফ নওয়াজ শরিফ বা তার পূর্ববর্তী সামরিক নেতাদের তুলনায় জনগণের মনোভাব পরিবর্তনের দিকে অনেক কম মনোযোগ দিয়েছেন। বিন লাদেনকে হত্যা বা সেনাবাহিনী পাবলিক স্কুলে গণহত্যার মত ঘটনায় ধাক্কা খাওয়ার পর উচ্চ পর্যায়ে অখ-তা ও দক্ষতার উপর জোর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিলীন হওয়ার ক্রমবর্ধমান ধারণা ও প্রধান শহরগুলোতে বাস্তব নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এ পরিস্থিতির অর্থ এই যে পাকিস্তানিরা ক্রমবর্ধমান ভাবে কোনো বিদেশী হাতের চেয়ে নিজেদের নেতৃত্বকে দায়ী করতেই আগ্রহী। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ না করেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে জেনারেল রাহেল শরিফের সাফল্য অথবা তার মেয়াদ বৃদ্ধি না করার ইচ্ছ তার ব্যক্তিগত সুনামই শুধু নয়, তার পদেরও ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।
পরবর্তী সেনাপ্রধান এই রাজনৈতিক পুঁজির উত্তরাধিকারি হবেন। কিন্তু তিনি যদি জনমতের পরিবর্তনশীলতা বা আগামীকাল যদি নির্বাচন হয় তাতে একজন প্রধানমন্ত্রীর জয় লাভের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেন তাহলে অতি দ্রুত তা তছনচ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে একটি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের কথা এখনো অর্থ বহন করে। তার আধা-নিরপেক্ষ অবস্থা সত্ত্বেও সবাই একমত যে রাহেল শরিফের উত্তরসূরি মনোনীত করায় এখনো তার ক্ষমতা রয়েছে।
এ পদটির যারা শীর্ষ প্রার্থী তাদের সম্পর্কে ও তাদের সম্ভাবনা বিষয়ে কিছু বিরণ আপনি প্রত্যাশা করতে পারেন। ইতোমধ্যেই সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয়েছে। তবে নওয়াজ শরীফের জন্য ডেকের মাঝখান থেকে ওয়াইল্ড কার্ড টেনে নেয়ার সব সময়ই সুযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রী, পদের প্রতিযোগীরা ও বর্তমান সেনাপ্রধান সবাই তা নিয়ে বড় রকমের জুয়া খেলায় নিয়োজিত। এ নিয়ে আসলে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। এমনকি পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা অভিজ্ঞ ও সুপরামর্শকৃত বেসামরিক নেতাদেরও তারা কী ধরনের ব্যক্তিকে সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ করতে যাচ্ছেন, তা অনুমান করার একাধারে সাফল্যের রেকর্ড নেই।
জুলফিকার আলি ভুট্টো ১৯৭১ সালে প্রথম ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধে ব্যর্থতার জন্য তার বিরুদ্ধে জুনিয়র অফিসারদের বিদ্রোহের সুযোগে। তিনি বেসামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরবর্তী সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করেন এবং জেনারেল টিক্কা খানকে (যিনি এখনো ‘বাংলাদেশের কসাই’ বলে পরিচিত) মনোনীত করেন। তিনি তার প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রকাশ করেন। ১৯৭৬ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ বৃদ্ধি না করে অথবা তার মনোনীত লোককে মনোনয়ন না দিয়ে অফিসার পুলের মধ্য থেকে অনুগত ও মেরুদ-হীনতার জন্য পরিচিত জিয়া-উল-হককে মনোনীত করেন।
এক বছর জিয়া ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত, গ্রেফতার ও শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝোলান। যদিও সহকর্মীদের তুলনায় জিয়ার পেশাগত সামরিক সুনাম নি¤œপর্যায়ের ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে দীর্ঘদিন শাসনের যথেষ্ট যোগ্যই শুধু ছিলেন না, তিনিই একমাত্র সেনা স্বৈরশাসক ছিলেন যাকে ক্রুদ্ধ জনতা কর্তৃক অসম্মানের শিকার হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়নি।
১৯৯৮-৯৯ সালে নওয়াজ শরীফও ভুট্টোর অবস্থায় পড়েন, কিন্তু তার ভাগ্য ভালো যে তিনি তার কথা বলার জন্য জীবিত রয়েছেন।
নির্বাচিত সরকারদের মাঝে প্রথম ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ২০১৩ সালের জুনে নওয়াজ শরীফ আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এ সময় নয়া সেনাপ্রধানের নিয়োগের সময় ছিল এবং রাহেল শরিফকে তার সেনাপ্রধান নির্বাচন করা কারো ভ্রু কুঞ্চিত করেনি। রাহেলকে তার পূর্বসূরি কায়ানির মত নয়, অনেকেই তাকে অরাজনৈতিক, সম্পূর্ণ পেশাদার বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি গুলি ছুঁড়তে শুরু করেন। এখন, ২০১৬ সালে তিনি পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত সেনাপ্রধান হিসেবে অবসরগ্রহণের পথে।
এ সব ঘটনা আমাদেরকে বর্তমান নাটকীয় পরিস্থিতিতে নিয়ে আসে। এটা স্পষ্ট যে পিটিআই বর্তমান মুহূর্তে সুযোগের গন্ধ পাচ্ছে এবং তারা ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থনের পরিবর্তে তাদের উপর চাপ বৃদ্ধি করবে। খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশে তাদের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন যে দুর্নীতিগ্রস্ত গণতন্ত্রের চেয়ে সামরিক শাসন ভালো।
নওয়াজ শরিফ কি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থাপনা করে বা ভারতের সাথে সংকট ঘনীভূত হওয়া অবস্থায় পরবর্তী সেনাপ্রধান নির্বাচন করে মেয়াদের বাকি দিনগুলো ক্ষমতায় থাকতে পারবেন?
যাকেই তিনি মনোনীত করুন না কেন, পরবর্তী সেনাপ্রধান নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন যে কীভাবে সরাসরি ও দৃশ্যমানভাবে তিনি দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন। সকল সম্ভাব্য দিক থেকে আসা ভারতীয় চাপ তিনি কীভাবে সামাল দেন তার উপরই নির্ভর করবে তিনি কতখানি ক্ষমতার অধিকারী হবেন। সূত্র : কোয়ার্টজ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ