Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চাই শিক্ষকের মূল্যায়ন ও মর্যাদার উন্নয়ন

বিশ্ব শিক্ষক দিবস-’১৬

প্রকাশের সময় : ১০ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মো. শরীফুর রহমান আদিল

গত ৫ অক্টোবর ছিল বিশ্ব শিক্ষক দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিবসটি পালিত হলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণভাবে। এটি বিশ্বের ১০০টি দেশে পালন করা হয়। এই দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো- শিক্ষকদের উন্নয়নে বৈশ্বিক একটি শিক্ষক সংগঠন তৈরি করে বিশ্বের সকল দেশের শিক্ষকদের একই বেতন কাঠামো দাঁড় করিয়ে সমাজে এবং রাষ্ট্রে শিক্ষকের মর্যাদা, সক্ষমতা, উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরি করা। পূর্বে বিভিন্ন দেশ তাদের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদদের জন্ম বা, মৃত্যু দিবসকে সেদেশের শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কো ও আইএলও ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয় সেই থেকে এই দিনটিকে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশ এই দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। নিরাপদ শিক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত কর্মস্থল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, শিক্ষকদের উন্নত বেতন প্রভৃতির দিকে লক্ষ্য রেখে এই দিবসটি পালিত হয়। এবারের এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শিক্ষকের মূল্যায়ন, মর্যাদার উন্নয়ন। কিন্তু যে সনদসমূহ ইউনেস্কো ঘোষণা করা হয়েছিল তার অর্ধেকও বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হয়নি বরং এসব সনদের অন্যতম বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করার জন্য কান অর্থ্যাৎ পে-স্কেল, স্বতন্ত্র পে কমিশন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বাড়োনোর নিমিত্তে শিক্ষকেরা করা আন্দোলন যখন রাজপথে গড়ায়, তখন জাতিগড়ার এসব কারিগরদের সহ্য করতে হয়েছে পুলিশের ছোড়া পিপার স্প্রে, লাঠিপেটা আর বুটের আঘাত আবার গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের করা আন্দোলনের কারণে শিক্ষকদের কারাবরণ করতে হয়েছে।
শিক্ষকের কাছ থেকে শিখে আমরা আজ কথা বলতে পারি, পৃথিবীকে বুঝতে পারছি, জানতে পারছি সমাজকে, উপলব্ধি করতে পারি ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, উচিৎ-অনুচিৎ প্রভৃতি পরিশেষে শানিত করেছি আমাদের মেধা আর মননকে। সমাজকে আলোকিত করার, সমাজ থেকে যাবতীয় কু-সংস্কার, কু-প্রথা, অন্ধকার দূর করে এই মহান শিক্ষকেরা। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই মনে হয় এশিয়ার মিসাইল ম্যান খ্যাত সদ্য প্রয়াত ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেনÑ বাবা-মা আর শিক্ষক এই তিনজন সমাজে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। গত ৩০ আগস্ট ১৫ তারিখে শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর হামলা ও নির্যাতনের চিত্র এবং নারায়ণগঞ্জে এমপি কর্তৃক শিক্ষককে কানে উঠবস করানোর ঘটনা থেকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। দেশের সবর্ত্রই শিক্ষকদের উপর এ ধরনের নির্যাতন হরহামেশাই ঘটছে আর এইসব নির্যাতনের চিত্র কখনো গণমাধ্যমের সাহায্যে আমরা জানতে পারি, আবার কোনটি আমরা জানতে পারি না, গণমাধ্যমে আসলে তা হয় আলোচিত বা সমালোচিত, আর গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হলে তা হয় উক্ত শিক্ষকের কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি। আবার কোন কোনটি শিক্ষক নিজে চাকরিচ্যুত আর সম্মান হারানোর ভয়ে প্রকাশ করেন না কেননা শিক্ষক হওয়ায় সে খুবই অসহায়। আমাদের সমাজে শিক্ষকরা সমাজের মানুষের সহানুভূতি আর করুণার উপর চেয়ে থাকতে হয় এদের সামাজে বিশেষ কোন কতৃত্ব বা ক্ষমতা নেই। আবার কোন শিক্ষক প্রতিবাদ করলেও তা শিক্ষকসুলভ আচরণ নয় বলে তাকে শোকোজ করে আবার কখনো বহিষ্কার করার ঘটনাও ঘটে যা এখন নিত্যনতুন ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শিক্ষকতা পেশা হিসেবে মানমর্যাদায় থাকার কথা অনেক উপরে এবং সকল বিষয়ে সুরক্ষা পাওয়ার কথা বা এ সংক্রান্ত একটি আইন থাকার কথা কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষক সুরক্ষা আইন বলে কিছু নেই। বাংলাদেশের বিগত আইনগুলো দ্বারা শিক্ষককে তলোয়ার ছাড়া টিপু সুলতান বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে ছাত্রদের উপর কোন প্রকার শাস্তি দিলে উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে আর বাকিদেরকে শিক্ষকদের উপর খবরদারি করতে ইশ্বর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে আর শিক্ষা আইনের খসড়ায় এমন কোন ধারা নেই যা শিক্ষকদের পক্ষে। প্রত্যেকটি ধারার প্রথম কথাই হলো শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা, এমপিও বাতিল কিংবা চাকরিচ্যুত্যের হুংকার ফলে কোন কিছু হলেই এর দায় নিতে হবে শিক্ষকের।
পেশী শক্তি ব্যবহারই মনে হয় একমাত্র সমাধান যেহেতু একজন শিক্ষক নৈতিক ও আদর্শিক তাই তিনি শক্তি ব্যবহার করেতে পারেন না তাই তাকে অপমানিত আর লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে পথে পথে তা না হলে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যা ও অপহরণ করে মুক্তপণ দাবি, শাবির ও জাবিতে তাদের দাবি আদায়ের লক্ষে পরিচালিত আন্দোলনে হামলা আর নির্যাতন করা হবে কেন? সভ্যতার এই যুগে এ ধরনের অসভ্য কাজ পৃথিবীর অন্য কোন দেশে সংঘটিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ দেশজুড়ে প্রতিনিয়ত যেভাবে শিক্ষকদেও উপর অমানসিক, অমানবিক, নিষ্ঠুর, পৈশাচিক, অতিবর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে তাতে বাংলাদেশকে পৃথিবীতে শিক্ষকদের দমন পীড়নের গুয়ানতামাবো কারাগারের আধুনিক মডেল হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। আর এসব নির্যাতনকারী মানুষরূপী হায়েনাদের বলা যায় এই কারাগারের সর্বাধুনিক প্রশিক্ষক।
সুতারং বাংলাদেশর শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে এবং শিক্ষকদের উপর নির্যাতনের মাত্রা কমাতে হলে জাতি গড়ার এসব কারিগরদের জন্য সুরক্ষা আইন বর্তমান সময়ের প্রথম দাবি। আর দাবি উঠেছে বাংলাদেশের সমগ্র শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র পে-স্কেল গঠন করার। আবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৩২০০ কলেজের শিক্ষকদের উপর গভর্নিং বোর্ডের নির্যাতন আর স্কুল ম্যানেজিং কমিটের দৌরাত্ম্যে শিক্ষক সমাজ আজ বড়ই অসহায় আর নিরুপায় গভর্নিং বোর্ডের বা স্কুল ম্যানেজিং কমিটের কথা মনে হয় রিমান্ডের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কিম জন উন প্রতিদিন টেলিভিশনে আসতেন মানুষকে শিক্ষা আর বিনোদন দিতে আর আমদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের সদষ্যরা প্রতিদিন আসেন শিক্ষকদেও নিত্যনতুন নির্যাতন আর কারাভোগের ফন্দি নিয়ে! এদের কারণে আজ স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকরা সবচাইতে লাঞ্ছিত আর বঞ্ছিত। আবার রাজনৈতিক নেতাদের পাতি নেতারা ও এপেশার লোকদের চোখ রাঙ্গিয়ে আর বৃদ্ধা আঙ্গুলী প্রর্দশন করে হরহামেশাই করে যাচ্ছে অনৈতিক আর অসামাজিক কাজসমূহ। সেখানে এসব শিক্ষক মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া আর কোন গন্তব্য নেই। প্রাচীন এক প্রবাদ ছিলো- পিতা-মাতা আর শিক্ষকদের মানা প্রকুতির প্রথম নিয়ম আর এখন মনে হয় গভর্নিং বোর্ডের সদস্য, পুলিশ আর ছাত্রদের কথা মানাই হলো বাংলাদেশের প্রথম আইন।
সরকার গত কিছুদিন আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুরক্ষা আইন প্রর্বতন করেছেন কিন্তু সেখানে শিক্ষক সম্প্রদায়কে তার আওতাভুক্ত করা হয়নি যা শিক্ষক মর্যাদার ও শিক্ষক নিরাপত্তার জন্য প্রচ- হুমকি। সুতারং আর সাপ- লুডু খেলে সময় নষ্ট নয় এবার স্লোগান উঠেছে শিক্ষক সুরক্ষা আর শিক্ষক মর্যাদা প্রতিষ্ঠত করাসহ সকল স্তরের শিক্ষাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এসে শিক্ষকদের মান ও যোগ্যতা অনুযায়ী স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো তৈরি করার। আর সমাজে শিক্ষকের মানউন্নয়ন মর্যাদার ভিত্তি যেন শক্ত করে প্রোথিত থাকে এটাই হোক বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিশ্রুতি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।