Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নারীর ফাস্টফুডে নির্ভরশীলতা

প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুহাম্মদ আলী হোসেন

বর্তমান সময়ে পুরুষদের সাথে মহিলারাও সমানভাবে জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু চার দেয়াল আর এর রান্নাঘর নয়, তারা নিয়োজিত রয়েছেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কোন অফিস-আদালতের কর্মী হিসেবে। নারী মুক্তি ও নারী জাগরণের ফলে প্রাচীন সংসার পদ্ধতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সকাল হতে গভীর রাত পর্যন্ত মহিলা সদস্যরা শুধু কুচবেন, কাটবেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রান্না ঘরে সময় কাটাবেন তা কিন্তু নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে নারী আজ একটি বিশাল দায়িত্ব নিয়ে রয়েছেন; সেই সঙ্গে খাবারের পরিবর্তনও কিন্তু কম নয়। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, ২৫-৩০ বছর আগে মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রায় আমরা যেমন একেবারে অভ্যস্ত ছিলাম বর্তমানে তেমন নেই।
আর এই প্রভাবটি সবচেয়ে বেশি আমাদের খাওয়া-দাওয়ার উপর। বাড়ির মেয়েরা রান্না করতেন। বাজার করার লোক ছিল অন্য। অথবা বলা যায়, রান্না করা বা বাজার করা দু’টোই কাজের লোক। রান্নার লোক এগিয়ে দিত। তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকতেন গিন্নী। তখনকার সময়ে জিনিসপত্রের দামও ছিল কম, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য শহরে। বলা যায় পাল্টে গেছে সব ব্যবস্থা। একান্নবর্তী পরিবার এখন বেশি চোখে পড়ে না। পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হয়ে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতা ফিরে আসায় গৃহিণীরা এখন ঘরের কাজের তোয়াক্কা না করে অফিস-আদালতে চাকরি করছে বিশেষ করে ছোট পরিবারের ক্ষেত্রে। সারাদিন অফিসের কাজ শেষ করে ঘরে এসে অনেক রকমের খাদ্য তালিকা তৈরি করা কতই না ঝামেলা। আবার দেখা যায়, কাজের লোকের প্রচ- অভাব। কোনোরকম একজন লোক দিয়ে বাসার কাজ করিয়ে নিতে হয়, সেখানে ভালো রাঁধুনী পাওয়াটাই যেন দুরূহ। সুতরাং বলা যায়, কোনরকম দায়সারাভাবে সম্পন্ন করা।
এই যেখানে অবস্থা, সেখানে বাড়ির কর্তা বা ছেলে-মেয়েরা কি সহজে মুখবুজে নিচ্ছে যে, মা যা খেতে দিচ্ছে তাই খাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মেনে নিলেও গৃহকর্তা এত সহজে বিষয়টি মেনে নিতে রাজি নয়। তখন কারও মনে প্রশ্ন জাগে, এত রোজগার করে লাভ কি? যদি খাবারটাই মনের মতো না হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাজের তাগিদে যাদের একা কোন স্থানে থাকতে হয়, এমন পরিস্থিতিতে কখনোবা বাড়ির রান্নাবান্না নিজে আবার কখনোবা নিজের ব্যবস্থা করেই শেষ। যারা অর্থনৈতিক দিক হতে সচ্ছল তারা শহরের কোন নামীদামি হোটেলে বা রেস্তোরাঁয় খাবারের কাজ শেষ করে থাকেন। কিন্তু যাদের অবস্থা এরকম নয় সেক্ষেত্রে তাদের একটু সমস্যায় পড়তে হয়। তাদের প্রয়োজন অল্প খরচে চটপটে যে রান্না করা যাবে বা সস্তায় যে খাবার পাওয়া যাবে। সামাজিক পরিবর্তনের এ যুগে সমস্ত বড় শহরেই তৈরি হচ্ছে প্যাকেজ ফুড এবং ফাস্টফুড। এখন আমাদের দেশের যে কারণে প্যাকেটের খাবার প্রচলিত হচ্ছে, সেই একই কারণে বিদেশের শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোতে প্যাকেজ ফুড একটি জনপ্রিয় বিষয়। আর এ ধরনের খাবার হলো এক ধরনের নিরুপায়ের উপায়। অনেকেই আবার বলে থাকেন আমি চাকরি করি, রান্না শিখতে পারব না। মাত্র কয়েকদিন আগে আমার বিয়ে হয়েছে। স্বামীর যদিও খুব ইচ্ছা আমি তাকে রান্না করে খাওয়াই, আমি তখন ফাস্টফুডের খাবার কিনে গরম করে বলি, আমি রান্না করেছি। তখন তার স্বামীও খুব তৃপ্তি করে খাবার খান। আবার কেউবা অনেকে লুকিয়ে অনেক কষ্টে রান্না শিখেছেন, তারপরেও বলে থাকে কেনইবা তুমি আমাকে প্যাকেটের খাবারগুলো দাও। তখন কি কোনকিছু বলার থাকে।
শুধু তাই নয়, নিরুপায় হয়েই শিল্পোন্নত দেশের শহরের মানুষ প্যাকেজ ফুডের ওপর আসক্ত হয়েছে সেটা বলাও একেবারে ঠিক হবে না। দেশে যদি যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য উৎপন্ন না হয় তাহলে এরকমের খাদ্য তৈরি করা সহজ হবে না। তবে উন্নয়নের সাথে সাথে এমন কিছু শিল্প গড়ে উঠেছে, সেখানে এই খাবারের চাহিদা আছে। কোন বড় হোটেল, বিমান পরিবহনে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রভৃতি জায়গাতেই প্যাকেজ খাবারের চাহিদা রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাস্থ্যের প্রতি সকলেরই নজর দিতে হয় বৈকি? এমন খাবার কেউ আশা করে না, যা খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। এখানেই সমস্যা শেষ নয়, তারপরও সমস্যা রয়ে যায়। সব মানুষের চাহিদাও এক নয়। কেউ আমিষভোগী আবার কেউ নিরামিষভোগী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে নারকেল তেলের খাবার ভালোবাসে, সে সরিষার তেলের খাবার ভালোবাসে না। তাই দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক রন্ধন প্রণালীর বৈশিষ্ট্য সমস্ত কিছু বজায় রেখে সব রসনাকে তৃপ্ত করে তোলা সহজ নয়। বলা চলে, কঠিন সমস্যা। তাই আজকাল অনেকেই ঝামেলায় না গিয়ে মিশ্র জাতীয় প্যাকেট খাবার তৈরি করে থাকেন। প্রয়োজনের তাগিদে আজ দেশে প্রচুর প্রসেস ফুড ইন্ডাস্ট্রি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। তেমনি ফাস্টফুডের চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই বলেন, এর অত প্রসার লাভের কারণ হলো একটা হুজুগ। এর জনপ্রিয়তা মূলত আমাদের দেশের শিক্ষিত অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েদের অত্যন্ত অনুকরণপ্রিয়তা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিগত দু’দশকে মার্কিন জিন্স্্ প্যান্টের প্রভাবে এদেশের যেন একটা নিয়ম হয়েছে যে, প্যান্ট মানেই জিন্স। আজকাল আবার অনেক মেয়েরাও জিন্স প্যান্ট পরে থাকে। ঢাকায় ফাস্টফুডের রেস্তোরাঁয় একবার লক্ষ্য করলে বিষয়টি বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়। সকাল হতে গভীর রাত পর্যন্ত ভোজনরসিকদের আনাগোনায় যেন বিন্দুমাত্র কমতি নেই। প্রায়শই আবার চোখে পড়ে লাইন দিয়ে অপেক্ষা কখন যে অন্য একটি টেবিল খালি হবে। মনে হয় যেন স্বপ্নপুরী প্রতিটি ফাস্টফুডে, গম গম শব্দ দিন-রাত সারাক্ষণ। নেই খাবারের বৈচিত্র্যের অভাব।
মানুষের জীবনের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে মানুষের জীবনধারায় যে পরিবর্তন আসে তাও অতিস্বাভাবিক। বাড়ির বাইরের খাবারের প্রতি প্রবণতা অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে দেখা যায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা বেশি টাকা হাতে পাচ্ছে। এ টাকার অনেকটা অংশই খরচ হয় এই খাতে। বলতে অবাক লাগে যে, যেসব দেশে তথা এলাকায় ফাস্টফুডের জন্ম দিয়েছে সেখানে আবার বিরুদ্ধ মতামত গড়ে উঠেছে। বলা হয়ে থাকে, এ খাদ্যে আছে কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাট অনেক বেশি। যেহেতু কদিন ধরে খাবার রেখে দিতে হয় সেজন্য খাদ্যে প্রিজারভেটিভের পরিমাণও বেশি থাকে। এতে এত বেশি কোলেস্টেরল থাকে যে, ভাবলেই মনে হয় এই খাবার খেলে অদূর ভবিষ্যতে মৃত্যু হাতছানি দিয়ে ডেকে যাবে। তদুপরি আমাদের দেশে শহরের পথেঘাটে, আনাচে-কানাচে, ফাস্টফুডের দোকান গড়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে আমাদের দেশে খাদ্য তালিকার পরিবর্তন ঘটে গেছে। সারাদেশের ফাস্টফুড দোকানে নিরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে, গড়ে একটি চিকেন বার্গার বা পিৎজার দাম পড়ছে ১৪ থেকে ২০ টাকা। তাই বলা যায়, বিত্তশালী না হলে বিদেশি ক্রেতাদের ফাস্টফুড বাংলাদেশীদের রোজকার খাবার নয়। আমাদের দেশে যদি একটি প্যাকেটের খাবার ৫-২৫ টাকার মধ্যে হয় তাহলে উচ্চবিত্তের পরিবার ছাড়া সেটা কেনার লোক খুবই কম হবে। তাই এক্ষেত্রে অনেকেই বলেন যে, বাজার হতে সবজি কিনে আনাই ভালো। প্যাকেজ খাবারের দাম এদেশে এত বেশি এর জন্য দাবি অত্যাধিক সরকারি ঘুষের আয়, মূল খাদ্যের দাম আর বিজ্ঞাপন তো রয়েছেই।
বাচ্চা মায়ের কাছে এসে যদি বলে, “মা আমার প্রচ- ক্ষিধে পেয়েছে, তাহলে মা বলবেন ৫ মিনিট অপেক্ষা কর। আমি খাবার তৈরি করে আনছি। আমাদের দেশের নারী সমাজ আজ বিশেষভাবে পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে সচ্ছল ও আধুনিক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।