Inqilab Logo

বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৩ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

দখলবাজিতে সৌন্দর্যহানি

চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড ঘেঁষে দোকান-পাট বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ১২ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০১ এএম

সড়ক ঘেঁষেই গড়ে উঠছে দোকান-পাট, ঝুপড়ি ঘর। কয়েকটি এলাকায় সকাল-বিকাল বসছে মাছের বাজার। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই বেপরোয়া দখলবাজি চলছে চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডে। দখলবাজের থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন সড়কের আশপাশের এলাকা। সৌন্দর্যহানি হচ্ছে সাগর তীরের অন্যতম এই পর্যটন এলাকার।

পতেঙ্গা সৈকত এলাকায় ২৭শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক এখন অরক্ষিত। সড়ক ঘিরে বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। সড়কের পাশেই সাগরে অগণিত দেশি-বিদেশি জাহাজ। স্পর্শকাতর এমন এলাকায় গণহারে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। ব্যস্ততম এ সড়কে নেই কোন সড়কবাতি। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন যানবাহন চালকরা। পতেঙ্গা সৈকত পয়েন্ট থেকে কাট্টলী পর্যন্ত ১৫ দশমিক দুই কিলোমিটার রিং রোডটি নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ। প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ না হলেও নগরীতে যানবাহনের চাপ কমাতে সড়কটি এক বছর আগে খুলে দেয়া হয়। তবে তদারকির অভাবে অভিভাবকহীন সড়কটি ঘিরে বেপরোয়া দখলবাজি চলছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইনকিলাবে ‘উদ্বোধনের আগেই দখলবাজি’ শিরোনামে সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের পর পুলিশের তৎপরতায় সড়কটিতে অবৈধ পার্কিং বন্ধ হয়েছে। যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করে রাখা বন্ধে তৎপর রয়েছে নগর পুলিশের ট্রাফিক বন্দর ও পশ্চিম বিভাগ। তবে দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার কথা বললেও দখল ঠেকাতে সিডিএর দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই। ফলে দিনে দিনে দখলদারের থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা বেড়েই চলেছে। কয়েকটি অংশে রীতিমত বস্তির রূপ নিয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, পতেঙ্গা সৈকতের পর থেকে কাট্টলী পর্যন্ত বেশ কয়েকটি এলাকায় দোকান-পাট এমনকি বসতঘরও গড়ে উঠেছে। আগে যেসব ঝুপড়ি ঘর ছিল তার পাশেই এখন টিনের ঘর তৈরি হচ্ছে। কয়েকটি পয়েন্টে সড়ক ঘেঁষে বসেছে হোটেল-রেস্তোঁরা, খেলনার দোকান। পতেঙ্গা সৈকত এলাকার মার্কেটের আদলে এ সড়ক ঘেঁষেও মার্কেট গড়ে উঠছে। স্থানীয়রা জানান, গত এক মাসে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। কাটগড় জেলে পাড়ার অংশ এবং হালিশহর অংশে সড়কের উপরই সকাল-বিকাল মাছের বাজার বসছে। অসংখ্য ভ্যানগাড়িতে মাছ বিক্রি করছেন জেলেরা। অগণিত ক্রেতার ভিড় বাজারে। আছে যানবাহনের জটলা।
ভারী যানবাহনের পাশাপাশি বিমানবন্দরগামী যাত্রীবাহী ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ বেড়েছে সড়কে। অথচ নেই কোন সড়কবাতি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অংশ এ সড়কে দ্রুতগামী যানবাহন চলাচল করে। ব্যস্ততম এ সড়ককে ঘিরে পর্যটকের ভিড় বাড়ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে চলেছে। সড়কে শৃঙ্খলা আনা না গেলে এর সুফল মিলবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আউটার রিং রোডটি যুুক্ত হবে দেশের প্রথম টানেল কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু টানেলের সাথে। আগামী বছর টানেলের নির্মাণ কাজ শেষ হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের বাস্তবায়নাধীন সবচেয়ে বড় প্রকল্প বে-টার্মিনালের পাশ দিয়ে সড়কটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। খুব শিগগির চালু হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল-পিটিসি। আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী ভারী যানবাহন আউটার রিং রোড হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচল করছে। নগরীর লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও যুক্ত হবে রিং রোডের সাথে। ফেনীর সোনাগাজী ও মীরসরাইয়ের বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠা বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের পাশ থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত উপকূলীয় মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে। আউটার রিং রোডটি হবে তারই অংশ। সব মিলিয়ে এ রোডটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইতোমধ্যে সরকার কর্ণফুলী বঙ্গবন্ধু টানেলকে ঘিরে আশপাশের সড়কগুলোর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, টানেলের প্রবেশ ও বহির্গমন সড়কসমূহের যানবাহন ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে সার্বিক ট্রাফিক ব্যবস্থা সহজতর করতে একটি সুপারিশমালা তৈরি করা হচ্ছে। এ সুপারিশের ভিত্তিতে টানেল চালুর আগেই ওই এলাকার সার্বিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দেশের প্রথম এ টানেল এবং সেইসাথে আউটার রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যানবাহনের যে চাপ তৈরি হবে সেটি সহজে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কারণে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী পতেঙ্গা এলাকার গুরুত্ব বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে বিশেষ করে টানেল চালু হবে ওই এলাকাটি হবে অত্যন্ত ব্যস্ততম। ফলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
আউটার রিং রোড প্রকল্পের কাজও চলছে ধীরগতিতে। এতে প্রকল্প ব্যয়ও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কাজ শেষ না হওয়ায় সড়কটির রক্ষণাবেক্ষণও যথাযথ হচ্ছে না। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৫৬ কোটি টাকা। চার দফা ব্যয় বাড়িয়ে দুই হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা করা হয়। সর্বশেষ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আগামী বছরের জুন মাস পর্যন্ত। সড়কের মূল কাজ শেষ হলেও এখনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে।

সিএমপির উপ-কমিশনার (্ট্রাফিক-পশ্চিম) তারেক আহম্মদ বলেন, নগরীর প্রধান সড়কে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে। পোর্ট কানেকটিং রোডের সম্প্রসারণ কাজও শেষ হয়নি। এতে রিং রোডে যানবাহনের অস্বাভাবিক চাপ পড়েছে। গত এক বছর আগে সড়কটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। অথচ এখনো পর্যন্ত সড়কবাতি বসানো হয়নি। এতে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। সড়ক ঘেঁষে অবৈধ স্থাপনাও গড়ে উঠছে। তাতে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) শাকিলা সুলতানা বলেন, সড়কটি চালু হওয়ার পর থেকেই সেখানে ব্যাপকহারে অবৈধ পার্কিং ছিল। ট্রাফিক পুলিশের অভিযানে এখন সড়কটি অবৈধ পার্কিংমুক্ত হয়েছে। সড়কটি যানজটমুক্ত রাখতে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, আউটার রিং রোড সিডিএর পক্ষ থেকে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়নি। হস্তান্তর করা হলে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণে যাবতীয় কাজ শুরু হবে।

আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, সড়কের উপর কোন স্থাপনা হয়নি। তবে পাশঘেঁষে অস্থায়ী দোকান-পাট গড়ে উঠছে। আমরা সেখানে কোন অবৈধ স্থাপনা রাখব না। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। হাইওয়ের অংশ হওয়ায় কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান আউটার রিং রোডে সড়কবাতি রাখেনি জানিয়ে তিনি বলেন, এরপরও যেহেতু এটি শহরের অংশ সেহেতেু সেখানে বাতি লাগানো হবে। বিশেষ করে সড়কের মোড়গুলোতে সড়কবাতি থাকবে। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।



 

Show all comments
  • Mominul Hoque ১২ অক্টোবর, ২০২১, ৯:৫৭ এএম says : 0
    এগুলো একেবারেই মেনে নেয়া যায় না। সাগরের তীরবর্তী এলাকায় কোন দোকান বা স্টল করলে পর্যটকদের আনন্দের তৃপ্তির চরম বিঘ্ন ঘটায়। পর্যটকদের জন্য তীরবর্তী এলাকার বাহিরে দোকান বা স্টল করে এই রিংরোডকে আকর্ষনীয় করে তোলা যাবে বলে আমি মনে করি।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: চট্টগ্রাম

১৯ অক্টোবর, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ