Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৩ কার্তিক ১৪২৮, ১১ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

পানি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা

মো. কামরুল আহসান তালুকদার | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৫ এএম

পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি হলেও মিঠা পানির পরিমাণ খুবই কম। তাই পানি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা সারা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীতে প্রাপ্ত মিষ্টি পানির প্রায় ৭০ ভাগই ফসল উৎপাদনে কৃষকরা ব্যবহার করেন। শিল্প-কলকারখানা ব্যবহার করা হয় ২০ ভাগ এবং ১০ ভাগ ব্যবহার করা হয় গৃহস্থলীর কাজে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বয়ে চলেছে হাজারো ছোট-বড় নদী। কেউ বলে নদ-নদী বাংলাদেশের হৃদপিন্ড। কেউ বা বলে ফুসফুস। যে যাই বলুক, নদ-নদীর গুরুত্ব অনুধাবন করতে শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নাই। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ এই দেশ নদ-নদী বিধৌত পলিমাটি দিয়ে হয়েছে উর্বর, ফুল ফল আর ফসলে করেছে সমৃদ্ধ। নদী গ্রামীণ জনপদ কর্মচঞ্চল রাখতে একদিকে যেমন অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে, তেমনি গতিময় শহুরে জীবনকে আরও বেগবান করতে ভ‚মিকা রাখে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে অপরিশোধিত ও পয়ঃবর্জ্য ফেলে ভয়াবহ পানি দূষণ করা হচ্ছে। গত এক যুগে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হলেও প্রতি বছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছস প্রভৃতি কারণে দেশের স¤পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে পানি স¤পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরী। পানি সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ এবং বছরব্যাপী বহমানতা বজায় রাখতে পারলে খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণতা শুধু নয় বিপুল পরিমানের খাদ্য উৎপাদন উদ্বৃত্ত রাখা সম্ভব।

বাংলাদেশের পানি স¤পদ ব্যবস্থাপনার সাথে সরাসরি স¤পৃক্ত পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও নিষ্কাশন, নদী তীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, ব-দ্বীপ উন্নয়ন, ভ‚মি পুনরুদ্ধার প্রভৃতি বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যারেজ, রেগুলেটর, ¯øুইস, খাল, বেড়িবাঁধ, রাবার ড্যাম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উপক‚লীয় বাঁধ নির্মাণ ও খাল খনন-পুনঃখনন করে সেচ, জলাবদ্ধতা নিরসন, বন্যা প্রতিরোধ, নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, ভ‚মি পুনরুদ্ধার সেবাসমূহ প্রদান করে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রধান সংস্থা যা পানি স¤পদ উন্নয়নে নিরন্তর কাজ করে চলেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট অর্ডার নং ৫৯ তদানিন্তন ইপি ওয়াপদা ‘পানি উইং’ নিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নামে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৫ বছর মেয়াদী খসড়া পরিকল্পনায় স্বল্প মেয়াদী (৮ বছর) ২৪০টি, মধ্য মেয়াদি (১৫ বছর) ৮৮টি এবং দীর্ঘ মেয়াদী (২৫ বছর) ১৮ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নাধীন যোগ্য প্রকল্পের ৮০ ভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পানি স¤পদ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও সহিষ্ণু সমৃদ্ধশালী ব-দ্বীপ গড়ে তোলাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিবেচনায় সার্বিকভাবে কৃষি ও শিল্প, অর্থনীতি, মৎস্য, বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশকে সমন্বিত করে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের প্রথম শতবর্ষ মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ অনুমোদন করেন। ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ তে অঞ্চল ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে অঞ্চল ভিত্তিক পানি বিজ্ঞান এবং পানি স¤পদের সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রধান ভ‚মিকা পালন করছে। ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ সামগ্রিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারের ঐক্যমতের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পানি স¤পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ এবং তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নির্ম‚ল এবং মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া।

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। সেচধর্মী প্রতিটি প্রকল্পে সেচ স¤প্রসারণ, ফসল উৎপাদন, এরিয়া বৃদ্ধি এবং ফসল উৎপাদনের নিবিড়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। টেকসই ও নির্ভরযোগ্য ফসল উৎপাদনের জন্য আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সেচ। সেচের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে সেচের পানির প্রধান দুইটি উৎস হচ্ছে, ভুপৃষ্ঠস্থ পানি এবং ভ‚গর্ভস্থ পানি। ভুপৃষ্ঠস্থ ও ভ‚গর্ভস্থ পানির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লবণ ও রাসায়নিক দ্রব্য দ্রবীভ‚ত থাকে। এসব লবণ ও রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ বেশি হলে তা গাছের জন্য ক্ষতিকর। রাসায়নিক পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, কার্বনেট, বাই কার্বনেট, সালফেট ইত্যাদি। সোডিয়াম কার্বনেট যৌগ পানিতে বেশি পরিমাণ থাকলে ফসল তা সহ্য করতে পারে না। সেচের পানি ঘোলা হলে তা মাটির রন্ধ্র বন্ধ করে দিয়ে মাটি শক্ত করে ফেলে। সেচের পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক, ক্যালসিয়াম, সীসা ইত্যাদি থাকে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ষাটের দশক হতে বাস্তবায়িত ৮১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৩৯৯ টি প্রকল্প হল এফসিডি এবং এফসিডিআই প্রকল্প। অবশিষ্ট প্রকল্প গুলো হল নদীভাঙ্গন রোধ, শহর রক্ষা বাঁধ, ভ‚মি পুনরুদ্ধার এবং ড্রেজিংসহ বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প। কার্যকরী ও টেকসই করার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাপাউবো পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে ফসল উৎপাদনে অভ‚তপূর্ব সাফল্য এসেছে। সুনামগঞ্জে ৬১৯ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে ১,৬৫,৬৬৫ হেক্টর জমি, নেত্রকোনা জেলায় ১০১.৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের ফলে ৪০,৯৬০ হেক্টর জমি, কিশোরগঞ্জে ৬১.৩২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে ১,০২,০০০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। নদী ভাঙ্গন, জলাবদ্ধতা, বন্যা ও পরিবেশ বিপর্যয়থেকে রক্ষা পেতে ছোট-বড় নদী নালা খাল ডোবা ড্রেজিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পানিস¤পদ মন্ত্রণালয়থেকে ৪০৮৭ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ গৃহীত হওয়ার পর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন শীর্ষক এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন লাভের পর একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর সারাদেশে একযোগে এর কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ৪৪৮ টি ছোট নদী ও খালের ৪০৮৭ কিলোমিটার পুনঃখনন স¤পন্ন হবে। ফলে দেশের ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার নৌপথের নাব্যসংকট দূর হবে, পানির ধারণ ক্ষমতা ও নিষ্কাশন ক্ষমতাও বাড়বে। ফলে নৌ চলাচল ও যোগাযোগ সহজ হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি চাষাবাদ করা যাবে ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমি। যার ফলে প্রতিবছর কমপক্ষে ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন বাড়বে। গত ১০ বছরে ১৩৬৭ কিলোমিটার নদী খনন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা পাড়ের মানুষের দুর্দশা লাঘবে ৮২০০ কোটি টাকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তিস্তা রিভার কম্প্রিপ্রহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট নামে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় ব্যাপক খনন, স্থায়ী তীর রক্ষাসহ পৌনে ২শত বর্গ কিলোমিটার জমি উদ্ধার করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে তিস্তা পাড়ের মানুষের ভাগ্য। ফসল উৎপাদনে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এর তথ্য মতে, খাদ্যশস্য উৎপাদনে চীনের অবস্থান প্রথম আর বাংলাদেশের অবস্থান ১১তম। তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, চাঁদপুর সেচ প্রকল্প, জিকে সেচ প্রকল্প, মুহুরী সেচ প্রকল্প, বরিশাল সেচ প্রকল্প প্রভৃতি এ প্রকল্পের সুবিধা স¤প্রসারণ করে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ংস¤পূর্ণতাই নয়, ২ কোটি মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্য শস্য উৎপাদনে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করবে। পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের কৃষিবান্ধব কর্মসূচি, প্রকল্প বাস্তবায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষতা, মেধাবী একঝাঁক প্রকৌশলীর ক্লান্তিহীন কর্মযজ্ঞ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক ফসল উৎপাদনে সহায়ক ভুমিকা পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা, পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের পরামর্শ ও নিবিড় মনিটরিং ফসল উৎপাদনে পানি স¤পদ মন্ত্রণালয়ের ভ‚মিকাকে আরো দৃশ্যমান করবে। ৬৪ জেলা ছোট নদী, খাল ও জলাশয় খনন ও পুনঃখননের প্রকল্প (ফেজ-২) মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ৮ হাজার ৫ শত কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৬১২টি ছোট নদী, খাল ও জলাশয় খনন করা হবে। এর মধ্যে ২১২টি ছোট নদী, ২০০০টি খাল এবং ৪০০টি জলাশয় রয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
লেখকঃ উপ-মন্ত্রীর একান্ত সচিব, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পানি


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ