Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

ক্রুসেড ও বর্তমান বাস্তবতা

ড. মো. কামরুজ্জামান | প্রকাশের সময় : ২২ অক্টোবর, ২০২১, ১২:১০ এএম

ষষ্ঠ শতকের সময়টাকে ঐতিহাসিকগণ মধ্যযুগ বলে অভিহিত করেছেন। এ শতকের শেষভাগে মহানবী (সা.) এর আগমন ঘটে। সপ্তম শতকের প্রথমভাগে তাঁর উপর আল কুরআন অবতীর্ণ হয়। এ শতকের প্রথম তিন দশকের মধ্যেই গোটা সৌদি আরব আল কুরআনের ছায়াতলে চলে আসে। আর এর সফল নেতৃত্ব দেন মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)। তাঁর তিরোধানের পর আরবের নেতৃত্বে সমাসীন হন আবুবকর (রা.)। এ সময় হতে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকে। দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসন। আরবের আকাশপ্রাচীর ভেদ করে ইসলাম পৌঁছে যায় আফ্রিকা ও ইউরোপে। মিশর বাইজেন্টাইন, ইরাক ও ইরান মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। আফগানিস্তান ও জেরুজালেমসহ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। সাম্রাজ্য বিস্তারের শুভ সূচনাকারী ছিলেন সাহাবী খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। হযরত উমর (রা.) তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁর আমলেই মিসর মদিনা রাষ্ট্রের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। রাজ্যের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে মুসলিম শাসকগণ নতুন নতুন অঞ্চল গড়ে তোলেন। আধুনিক কায়রোর নিকটবর্তী ফুসতাত নামক স্থানে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়। মিসর এ সময় উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসনের অধীনে পরিচালিত ছিল। ৯৬৯ সালে মিসরে প্রতিষ্ঠিত হয় ফাতেমীয় শাসন। তারা ফুসতাতের পরিবর্তে কায়রোকে নতুন রাজধানী ঘোষণা করেন। ১০০০ শতাব্দি পর্যন্ত মুসলমানদের এ বিজয় অভিযান অব্যাহত ছিল। এ সময় ইসলামী শাসন দিগন্ত জুড়ে প্রসারিত হয়। এশিয়ার আকাশ ভেদ করে এ বিজয় আছড়ে পড়ে সুদূর আফ্রিকা ও ইউরোপে। রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি মুসলিম শাসকগণ শিক্ষা বিস্তারেও মনোযোগী হন। তারা মধ্যপ্রাচ্যের ন্যায় বিজিত আফ্রিকা ও ইউরোপে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন। অন্ধকার আফ্রিকা ও ইউরোপ হয়ে ওঠে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত। কোরআন, হাদিস, আকাইদ ও ফিকহ চর্চা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়। সাহিত্য, কলা আর বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় আজকের আধুনিক ইউরোপ। ভূগোল, গণিত আর দর্শনের বিভিন্ন শাখারও প্রভূত উন্নতি সাধিত হয় এখানে। ফলে মুসলিমদের নেতৃত্বে ইউরোপ হয়ে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। সামরিক শক্তিতেও মুসলিমরা পিছিয়ে ছিল না। এ সময় আফ্রিকা ও ইউরোপে মুসলিম সামরিকবাহিনী অজেয় শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। রাজ্য জয়, রাজ্যশাসন ও সেনাবাহিনী গঠনে মুসলমানরা অসামান্য ভূমিকা প্রদর্শন করে। ইহুদি-খ্রিস্টানরা একে একে রাজ্য হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। অবশ্য অনেক ইহুদি এবং খ্রিস্টান ইসলাম গ্রহণ করে। আর যারা ইসলাম গ্রহণ করেনি, তারা কর প্রদানের মাধ্যমে মুসলিমদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। কিন্তু তাদের ভূমিতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ভিতরে ভিতরে তারা তিক্ত, বিরক্ত আর বিচলিত হয়ে পড়ে। হিংসা আর ক্রোধের আক্রোশে তারা বিস্ফোরন্মুখ হয়ে পড়ে। অন্তর্জ¦ালায় তারা দগ্ধিভূত হতে থাকে। ফলে গোটা ইউরোপ মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। এক্ষেত্রে তারা মুসলিম জাতিকে ইসলামী শিক্ষাবিমুখ করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল সমগ্র মুসলিমজাতিকে সেক্যুলার তথা ধর্মহীন বানানো। প্রথমত: তারা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার ও প্রোপাগান্ডা চালাতে শুরু করে। তারা সৃষ্টি করে শক্তিশালী এক গুপ্তচরবাহিনী। এ বাহিনীর নেটওয়ার্ক পুরো মুসলিমবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে ইসলামী দুনিয়াকে জালের মতো ছেয়ে ফেলে। তারা সেবার নামে মুসলিমদের ধর্মচ্যুতির এক মহা ফাঁদ আবিষ্কার করে। গরীব মুসলিমদেরকে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ করে দেয়। সেবার নামে তারা মুসলিম তরুণ-তরুণীদের কর্মের যোগান দেয়। নিজেদের দেশে মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও নাগরিকত্বের ব্যবস্থা করে দেয়। অবারিত সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মগজ ধোলাই করে। এভাবেই খ্রিস্টানরা মুসলিম জাতিসত্ত্বার মূলে ধর্মহীনতার তাজা বীজ বপন করে। তাদের সামনে তারা উন্নতি আর প্রগতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ছলে, কৌশলে ও বেনামে ইসলামের নেতিবাচক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। তাদের সৃষ্ট এ ধর্মহীনতা মুসলিম জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। ইসলামের মধ্যে তারা নকল ইসলাম তৈরি করে। কাদিয়ানিয়াহ, মাসুনিয়াহসহ ইসলামের মতো অসংখ্য নকল ধর্ম মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে দেয়। সৃষ্টি করে ইসলামের নামে ব্যক্তিপূজাসহ বিভিন্ন পূজার কারখানা। তারা ব্যাপকহারে মদ, জুয়া ও নারীর অবাধ অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। খ্রিস্টানগণ এ কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করে। অন্যদিকে তারা প্রকাশ্যে সামরিক ক্রুসেডেরও প্রস্তুতি নিতে থাকে। এ ক্রুসেডের ব্যাপ্তি ছিল সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী ও সর্বপ্লাবী। সশস্ত্র ক্রুসেডের পাশাপাশি তারা কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্রুসেডেরও আয়োজন করে। একদিকে তাদের সশস্ত্র হামলা, অন্যদিকে কুটিল সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এহেন ধ্বংসাত্মক মানবতাবিরোধী কর্মসূচী নিয়ে তারা নিরীহ মানবতার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেয়। এসময় খ্রিস্টানদের পোপ ছিল দ্বিতীয় আরবান। তিনি ১০৯৫ সালে ফ্রান্সে খ্রিস্টান রাজপরিবারদের নিয়ে এক সম্মেলন করেন। এ সম্মেলনে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খ্রিস্টান বিশ্বকে ক্ষেপিয়ে তোলেন। খ্রিস্টানগণ এ যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড বলে থাকে। ১০৯৯ সালে জেরুজালেম দখলের মধ্য মধ্য দিয়ে ক্রুসেড শুরু হয় এবং ১২৯১ সালে আক্রার পতনের মধ্য দিয়ে ক্রুসেডের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে।

১০৯৯ সালের ৭ জুন। জেরুজালেমের ইতিহাসে এক দুঃখের দিন। ক্রুসেডারগণ ৪০ দিন যাবত জেরুজালেম অবরোধ করে রাখে। এতদিনের অবরোধে ক্রুসেডারগণ রক্ত তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা সাধারণ মানুষের ওপর। হামলা চালায় তারা রাস্তায়, বাজারে, বাড়িতে ও পার্কে। যাকে সামনে পায় তাকেই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। মানবতাকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দেয়। জেরুজালেমে নৃশংসতার একজন প্রত্যক্ষদর্শীর নাম রেমন্ড দা এজিলেস। তিনি ক্রুসেডারদের নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন এভাবে ‘মসজিদের বারান্দায় মানুষের হাঁটু পরিমাণ রক্ত জমে গিয়েছিল। আর ঘোড়ার লাগাম পর্যন্ত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল’।

১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই। ক্রুসেডারদের হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস চূড়ান্ত পদানত হলো। খ্রিস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলো। তারা মসজিদকে গির্জায় পরিণত করলো। এভাবেই মুসলিম শাসনের গৌরবময় ৪৬২ বছরের পতন ঘটলো। এই যখন অবস্থা ঠিক তখন মুসলিম বিশ্বের খলিফারা বিলাসিতায় মত্ত ছিলো। তারা অন্তঃপুরে নারী আর মদ নিয়ে ফূর্তিতে ব্যস্ত সময় পার করছিল। জেরুজালেম রক্ষায় কোনো মুসলিমশাসক যখন এগিয়ে আসেনি। ঠিক এ সময় মুসলিম জাতিকে উদ্ধার করতে আগমন ঘটে এক মহাবীরের। নাম তার আবু-নাসির সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুবী (রহ.)। তার নেতৃত্বেই মুসলিমগণ বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধার করেছিলেন। আর জেরুজালেমকে মুক্ত ও স্বাধীন করেছিলেন।

১০৯৫ সাল থেকে ১৩৯৯। সুদীর্ঘ এই ৩০০ বছর যাবত চলতে থাকে খ্রিস্টানদের এই ক্রুসেড। ১০৯৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ক্রুসেড। দ্বিতীয় ক্রুসেড শুরু হয় ১১৪৫ সালে। আর শেষ হয় ১১৪৯ সালে। তৃতীয় ক্রুসেডের সময় ছিল (১১৮৯-১১৯২) সাল পর্যন্ত। চতুর্থ ক্রুসেডের সময়সীমা ছিল ১২০১ সাল থেকে ১২০৪ সাল পর্যন্ত। পঞ্চম ক্রুসেডের মিয়াদ ছিল ১২১৭ সাল থেকে ১২২১ সাল পর্যন্ত। ষষ্ঠ ক্রুসেড শুরু হয় ১২২৮ সালে। সপ্তম ক্রুসেড অনুষ্ঠিত হয় ১২৪৮ সালে আর শেষ হয় ১২৫৪ সালে। অষ্টম ক্রুসেড অনুষ্ঠিত হয় ১২৭০ সালে। নবম ক্রুসেড সংঘটিত হয় ১২৭১-১২৭২ সালে। দশম ক্রুসেড পরিচালিত হয় ১২৮১ সালে। আর শেষ হয় ১২৯১ সালে। প্রতিটি ক্রুসেডে খ্রিস্টানরা মুসলিম এবং ইহুদিদের উপর চালায় বেপরোয়া নিষ্পেষণ ও নিপীড়ন। চালায় মুসলিমদের উপর অকথ্য নির্যাতন এবং অত্যাচার। ক্রুসেডের ব্যয় নির্বাহ করতে তাদের প্রয়োজন হয় ব্যাপক অর্থের। এ অর্থ সংগ্রহে তারা ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারিত প্রপাগান্ডাকে বিনিয়োগ হিসেবে কাজে লাগায়। বোকা আর মগজ ধোলাইকৃত শিক্ষিত মুসলিমগণ এ বিনিয়োগের পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাথামোটা, লোভী আর বলদ মুসলিম শাসকেরা হয় তাদের বিনিয়োগের লাভজনক মার্কেট। ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিমবিশ্ব উইরোপীয়দের একনিষ্ঠ ভৃত্যে পরিণত হয়। খ্রিস্টানবিশ্ব পেয়ে যায় একনিষ্ঠ সহচর। অন্যদিকে উলামাখ্যাত কিছু ব্যক্তিবর্গ ব্যস্ত থাকেন ফতোয়াবাজি নিয়ে। আর কিছু অংশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন রাজনীতি হারাম শ্লোগান নিয়ে। অনেকে মগ্ন হয়ে পড়েন অতি অন্ধ আধ্যাত্মিকতার ধ্যানে। একটি শ্রেণী তাবিজ তুমারি পেশা বেশ জমিয়ে তোলেন। আলিমগণ একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়ে পড়েন। শত্রুতার এ ধারা মুসলিম দুনিয়ায় এখনও চলমান রয়েছে। এসকল আলিম শ্রেণি ইসলামের উন্নত জ্ঞান-গবেষণা থেকেও নিজেদেরকে গুটিয়ে নেন। জ্ঞান-গবেষণা আর আবিষ্কারের দায়িত্ব তারা দিয়ে দেন খ্রিস্টানদের হাতে। ফলে তারা গবেষণাবিমুখ পরনির্ভর জাতিতে পরিণত হয়।

১১৬৩ সালের কথা। মিসর তখন ফাতেমীয় শাসনের অধীনে পরিচালিত। সালাহউদ্দিনের জেনগি বংশীয় ঊর্ধতন এক শাসক ছিলেন নূরুদ্দিন জেনগি। তিনিই তাকে এক সামরিক অভিযানের দায়িত্ব দেন। মিসর থেকে বিতাড়িত মুসলিম শাসক ছিলেন খলিফা আল-আদিদের উজির শাওয়ার। তাকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে এ অভিযানটি পরিচালিত হয়। এটি ছিল সালাহউদ্দিন আয়ুবির সংগ্রামী জীবনের প্রথম অভিযান। প্রথম এ অভিযানে সালাহউদ্দিন অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেন। ক্রুসেডার ও তাদের দোসর বিলাসি মুসলিমশাসক জোটের সাথে এ যুদ্ধটি পরিচালিত হয়। যুদ্ধটি শুরু হয় নীল নদের পাড়ে। সালাহউদ্দিনের রণকৌশলের কাছে পরাজিত হয় ক্রুসেডার বাহিনী। ঐতিহাসিক ইবনে আছিরের মতে, এ বিজয়টি ছিল, ‘ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজয়’। ফলে মিসরে তিনি রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন হন। ১১৬৯ সালের ২৬ মার্চ। মিশরের উজির হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন সালাহউদ্দিন। তার নিয়োগদাতা ফাতেমীয় খলিফা ছিলেন আল আদিদ। তিনি ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। অথচ, সালাহউদ্দিন ছিলেন সুন্নী মুুসলিম। ১১৭৪ সালে নুরুদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তিনি মিসরিয় আমীর ও একদল সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। সালাহউদ্দিন ষড়যন্ত্রকারী মূলহোতাকে গ্রেফতার ও হত্যা করেন। এ হত্যার পরের দিন ফাতেমী বাহিনীর ৫০ হাজার কৃষ্ণবর্ণী সেনা সালাহউদ্দিনের বিরোধিতা করেন। এটা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করেন। এটাই ছিল মিসরবাসীর পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে শেষ বিদ্রোহ। তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আর কোনো বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেনি। এতদিনে তিনি মিসরে তাঁর অবস্থান মজবুত করতে সক্ষম হন। ১১৭৫ সালে তিনি সিরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর হিমস জয় করেন। ১১৭৭ সালে সালাহউদ্দিনের সেনারা জেরুজালেমে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তার সেনারা জেরুজালেমের শহর ভেদ করে গ্রামাঞ্চলে ঢুকে পড়েন। ক্রুসেডারদের জেরুজালেমের ফটক পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যান।

১১৭৮ সালে তিনি হোমস জয় করেন। অনেক শত্রুসেনাকে বন্দি করেন এবং অনেকের শিরোচ্ছেদ করেন। ১১৮২ সালে তিনি আলেপ্পো জয় করেন। আর এর মধ্য দিয়ে সিরিয়া বিজয় সমাপ্ত করেন। কিন্তু ইতোমধ্যে তার বংশীয় জেনগী শাসকেরা তার বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। আর তারা ছিল সিরিয়ার সরকারি শাসক। ফলে জেনগী সেনাবাহিনীর সাথে সালাউদ্দিনের যুদ্ধ শুরু হয়। সালাউদ্দিন আইয়ুবী জেনগী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। অতঃপর তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতাদি কর্তৃক মিশর ও সিরিয়ার সুলতান ঘোষিত হন। একই সাথে তিনি জর্ডান নদী পার হয়ে বাইসান আক্রমণ ও বিজয় করেন। ১১৪০ সালের শেষের দিকের ঘটনা। ক্রুসেডাররা মুসলিমদের সাথে এই মর্মে যুদ্ধবিরতিতে আসে যে, তারা মুসলমানদের হজ্ব সফরে কোনো প্রকার বাধা দেবে না। মুসলিমদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করবে না। ব্যবসায়ী কাফেলাকেও কোনো প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না। এই শর্ত দীর্ঘ চার যুগ যাবৎ বলবৎ ছিল। ১১৮৩ সালের ঘটনা। ক্রুসেডার নেতা রেনোল্ড শাটিলন তার কৃত এ চুক্তি ভঙ্গ করে। খ্রিস্টানবাহিনী লোহিত সাগরে মুসলিম বাণিজ্য ও হজ্জ্বযাত্রীদের উপর হামলা করে। ১১৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে খ্রিস্টান রাজা রেনোল্ড হজ্ব কাফেলায় আবারো আক্রমণ করে। তাদের মালামাল লুট করে এবং তাদেরকে জেলখানায় বন্দি করে। ইতিহাসে রেনোল্ড একজন রক্তপিপাসু ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ইতিপূর্বেও সে এজাতীয় কর্মকাণ্ড করেছে। নিজেকে সাম্প্রদায়িক ও অসহিষ্ণু ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করেছে। মূলত: যুদ্ধবিরতিতে মুসলিমগণ তাদের আদর্শ প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন। যুদ্ধবিরতির সুযোগে পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে মুসলিমরা একটি অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে মুসলিম শক্তি, ঐক্য ও প্রচার বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর তাতে রেনোল্ডের গাত্রদাহ শুরু হয়েছিল। মূলত আদর্শিক লড়াইয়ে তারা পরাজিত হয়ে সন্ত্রাসের মতো বাঁকা পথ তারা বেছে নিয়েছিল। আর ঐতিহাসিকভাবে এটাই সত্য যে, আদর্শের সংগ্রামে যারা পরাজিত; সন্ত্রাসই তাদের একমাত্র হাতিয়ার। রেনোল্ড তাই ইচ্ছা করেই মুসলিমদেরকে হয়রানি করছিল। মুসলিমদের বিরুদ্ধে সে এ হাতিয়ারই গ্রহণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সালাহউদ্দিনকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখা আর ইসলাম প্রচারে বিঘ্ন ঘটানো। আর সবশেষে স্বল্পসংখ্যক মুসলিমবাহিনীকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়া। আর এ লক্ষ্যেই নিরস্ত্র ও নিরীহ হজযাত্রীদের উপর রেনোল্ড হামলা করেছিল। এ হামলার জবাব দিতে এগিয়ে আসেন মুসলিম বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহ.)। ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন রেনোল্ড বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনা করেন। সালাহউদ্দিন রেনোল্ড নিয়ন্ত্রিত কেরাক অবরোধ করেন। ১১৮৭ সালের জুলাই মাসে এ বীর হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করেন। এ সময় জেরুজালেমের রাজা ছিলেন ‘গাই অব লুসিগনান’। এ সালের ৪ জুলাই এক যুদ্ধে রাজা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন। ক্রুসেডার সেনাবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। রাজা রেনোল্ড অব শাটিলনকে বন্দি ও হত্যা করা হয়। মহাবীর সালাহউদ্দিন ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রিত প্রায় সকল শহর জয় করেন। ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর। সালাহউদ্দিনের সেনাবাহিনী জেরুজালেম অবরোধ ও জয় করেন। সালাহউদ্দিন জেরুজালেমকে পুনরুদ্ধার করেন। তিনি রক্তপাতহীনভাবে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। মুসলিম বীরের বিজয়ে ইউরোপে কম্পন সৃষ্টি হয়। পোপ তৃতীয় আরবান হার্টঅ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন। জেরুজালেম জয়ের পরে সালাহউদ্দিন সেদেশে ইহুদিদের বসবাসের অনুমতি দেন। তিনি সামান্য পরিমাণ কর আরোপ করেন। আর যারা গরিব ছিল তাদের কর দেয়া থেকে অব্যাহতি দেন। মুসলিম সেনারা তাদের মুক্ত করে দেন।

এ বিজয়ের মাধ্যমে সালাউদ্দিন আইয়ুবী ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেন। বাইতুল মোকাদ্দাস ও জেরুজালেমে খ্রিস্টানদের মহা বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। স্থাপিত হয় মুসলিম শাসন। কিন্তু খ্রিস্টান শক্তি বসে থাকে না। পোপ দ্বিতীয় আরবানের নেতৃত্বে খ্রিস্টানরা পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়। খ্রিস্টানশক্তি আরবানের নেতৃত্বে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। এ সময় ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন রিচার্ড। ফ্রান্সের রাজা ছিলেন ফিলিপ অগাস্টাস। আর জার্মানের রাজা ছিলেন ফ্রেডরিক। বিশ্বের তিন খ্রিস্টীয় পরাশক্তি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। জেরুজালেমকে ধ্বংসলীলায় পরিণত করতে উদ্যত হয়। এ লক্ষ্যে তারা ৬ লক্ষ সৈন্যের সমাবেশ ঘটায়। অপরপক্ষে সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ২০ হাজার। ৬ লাখ সৈন্যের বিশাল খ্রিস্টানবাহিনী মুসলিমদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। ১১৮৯ সালের ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হয় এ অবরোধ। আর এ অবরোধ স্থায়ী হয় টানা তিন বছর। অর্থাৎ ১১৯২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে এই অবরোধ। সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (রহ.) স্বল্প রসদ আর অল্প সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আল্লাহর উপর অটুট বিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবল ছিল তার একমাত্র পাথেয়। এ পাথেয়কে বুকে ধারণ করে সফলভাবে মোকাবেলা করলেন দীর্ঘ এ অবরোধ। আল্লাহর সাহায্য নাযিল হয়। ফলে ৬ লাখ সৈন্যের এ বিশাল বাহিনী ক্রমাগত মনোবল হারিয়ে ফেলে। মানসিকভাবে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। ১১৯২ সালের ৯ অক্টোবর। খ্রিস্টানবাহিনী তাদের অবরোধ তুলে নেয়। অবশেষে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর শত শত বছর চেষ্টা করেও খ্রিস্টানরা আর জেরুজালেম দখল করতে সক্ষম হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ক্রুসেডের এখনও সমাপ্তি ঘটেনি। ক্রুসেডিয় চেতনা থেকে খ্রিস্টীয় ইউরোপ আজও ফিরে আসতে পারেনি। খ্রিস্টানবিশ্বের মগজ ও মানসিকতা ক্রুসেডীয় আচরণে এখনও পূর্ণ। তাদের কথা, কাজ, আচরণ ও যুদ্ধাংদেহী মনোভাব তারই প্রমাণ বহন করে।

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
[email protected]



 

Show all comments
  • নাহিদ কামাল। ২৪ অক্টোবর, ২০২১, ১২:১২ পিএম says : 0
    মা শা আল্লাহ্।???? প্রিয় স‍্যার।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন