Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সক্রিয়

চলছে চাঁদাবাজি খুন দখলসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ড

প্রকাশের সময় : ১৫ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব রিপোর্ট : তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনও সক্রিয়। চাঁদাবাজি, জবর দখল, এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে সবকিছুই করছে তারা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশে পলাতক। বাকিরা কারাগারে অথবা জামিনে বেরিয়ে এখন ফেরারি। জামিনে মুক্তি পাওয়া এবং পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য নেই পুলিশের কাছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কারাগারে ও বিদেশে অবস্থানরত পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙ্গিয়ে এখনও চাঁদাবাজি, খুন, দখলসহ অপরাধমূলক কর্মকা- ঘটালেও প্রতিকার মিলছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাবন্দি ও ভারতে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে পুরান ঢাকা নিয়ন্ত্রণ করছে মূলত তিনজন। সদরঘাট থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ওমর ফারুক কচি, কোতয়ালী, সুত্রাপুর, গুলিস্তান ও নবাবপুর নিয়ন্ত্রণ করছে মুকু ও আলী আজগর বাবুল। জুরাইন-শ্যামপুর-কদমতলী এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সানাউল্লাহ ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড কৈতর মাসুম। এর মধ্যে কচি গ্রুপ শ্যামপুর আরসিন গেইট এলাকায় বেশি তৎপর। এখানকার মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে ফুটপাত দখলসহ সব ধরণের অপরাধ কর্মকা-ে কচি গ্রুপের সন্ত্রাসীরা তৎপর। কচির অনুমতি ছাড়া আরসিন গেইট এলাকায় কেউ নতুন বাড়ি করা এমনকি ফ্ল্যাট কেনারও সাহস করে না। এলাকার ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কচির হয়ে এখন তৎপর ইনছান, বড় মালেক, ছোট মালেক, সাজু, বিদ্যুৎ, আলীসহ বেশ কয়েকজন। এদের আবার পৃথক পৃথক বাহিনী রয়েছে। যে বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরসিন গেইট এলাকার এক ভুক্তভোগি জানান, ঈদুল ফিতরের একদিন পর গত ৯ জুলাই গভীর রাতে আরসিন গেইট এলাকায় খুন হয় শাহেদ নামে এক যুবক। মাদক ব্যবসায় বাধা দেয়ায় শাহেদকে খুন করে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যরা। যাদের পেছনে কচি গ্রুপের ইন্ধন রয়েছে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। শাহেদকে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতা পাপ্পু নামে এক যুবককে ধরে পুলিশে দেয়। ধরা পড়ে পাপ্পুর সহযোগি হাবু। পরে সে জামিনে বেরিয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত খুনিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ হত্যাকা-ের নেপথ্যে মালেক ও রহমান নামে দুই মাদক ব্যবসায়ী জড়িত থাকার পরেও শীর্ষ সন্ত্রাসীর সাথে যোগাযোগ থাকায় তারা অধরাই থেকে গেছে। মামলা থেকে মালেকের নাম বাদ দেয়ার জন্য শহীদ কমিশনারও বাদীপক্ষের উপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয়রা জানায়, মালেক ও রহমান প্রকাশ্যে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি করে। শাহেদ হত্যাকা-ের পর তারা আরও বেপরোয়া। রহমানের ছেলে তুষার ও মুন্না গেন্ডারিয়া রেল স্টেশনে ইয়াবা বিকি করলেও তাদেরকে বাধা দেয়ার মতো সাহস কারো নেই। শ্যামপুরের আরেক অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীর মদদপুষ্ট আরিফ, বিকি, মিঠু, রানা, সাঈদ, তারিকসহ বেশ কয়েকজন। এদের বেশিরভাগই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকার নিয়ন্ত্রণে আছে মাতুয়াইলের বকুল, কবরস্থানের আনোয়ার, তুহিন, সায়েদাবাদের বসন্ত শ্যামল, বিল্লাল, টুন্ডা আক্তার, টুন্ডা কাসেমসহ বেশ কিছু তালিকাভূক্ত সন্ত্রাসী। এর মধ্যে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালকেন্দ্রীক কিছু সন্ত্রাসী আছে যারা মালিকদের জিম্মি করে বিভিন্ন রুটের বাস থেকে চাঁদাবাজি করে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ রুটের হযরত আলীর বিরুদ্ধে ২০টির মতো মামলা রয়েছে। সূত্র জানায়, র‌্যাবের ক্রসফায়ারে ডাকাত শহীদ নিহত হওয়ার পর পুরানঢাকাসহ গোপীবাগ, স্বামীবাগ, ওয়ারী ও করাতিটোলাসহ যাত্রাবাড়ী এলাকাও নিয়ন্ত্রণ করছে তার বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুসারী। তাদের মধ্যে মামুন, কালা মামুন, মামা আকরাম, হানিফ, মেহের, জাবেদ, মামুন জোয়ার্দার, টুন্ডা মামুন, পাটা রাসেল, ফারুক, আমির, পলাশ, শুভ, কমল, সজীব, জাকির, আলো, মুক্তার, হিন্দু রনি, রানা, জুয়েল, পাভেল, সোহেল, দাদা লিটন, মগা লিটন, ডাকাত কাশেম, পাঞ্চিং সিরাজ, বুদ্ধু লিটন ও হানিফ অন্যতম। গোপীবাগে নাসির বাহিনীর দাপট এখন আছে। একজন ভুক্তভোগি জানান, ঢাকা উত্তরের ছাত্রলীগের নেতা নামধারী এক সন্ত্রাসী গোপীবাগ এলাকার ডিশ ব্যবসা দখল করে নিয়েছে। হারুন নামে এক ডিশ ব্যবসায়ী ছাত্রলীগ নেতা নামধারী ওই সন্ত্রাসীর ভয়ে বহুদিন যাবত এলাকাছাড়া। সুত্রাপুরের একাংশ, গুলিস্তান ও নবাবপুর নিয়ন্ত্রণ করছে মুকু ও আলী আজগর বাবুল। সূত্রাপুর ও গেন্ডারিয়ার একাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে শামসু, রানা, আমান, নাহিদ, বিদ্যুৎ, নওশাদ, মাদক সম্রাট বুদ্দিন, ফয়সাল, মনিরসহ বেশ কয়েকজন। এদের আবার পৃথক বাহিনী রয়েছে যারা মূলত ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত।
সূত্র জানায়, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া বিকাশ, কারাবন্দি কিলার আব্বাস ও আত্মগোপনে থাকা শাহাদাত গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে এখন মিরপুর-পল্লবী এলাকা। এলাকাবাসী জানায়, শাহাদতের হয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিছু সন্ত্রাসী কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে জামিল, নিয়াজ, মোরশেদ ও গাজী সুমন। কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, মিরপুরে শাহাদতের নামে এখন ভিন্ন স্টাইলে চাঁদাবাজি হয়। মোবাইলে মেসেজ আসে ভারতের কোনো নম্বর থেকে। মেসেজের মাধ্যমে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকী দেয়া হয়। তেজগাঁও-মহাখালী এলাকা এখনও মোল্লা মাসুদের দখলে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মোল্লা মাসুদ এখন ভারতের কারাগারে। রামপুরা, খিলগাঁও ও মগবাজার এলাকা জিসান ও আরমানের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে। শাজাহানপুরে মানিক বাহিনী রয়েছে তৎপর। স্থানীয় সূত্র জানায়, সরকারি সমর্থক দলের কতিপয় নেতা এখন মানিক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছে। এদের একটি অংশ রামপুরা ও বনশ্রী এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ধানমন্ডির একাংশ ও মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে নবী হোসেনের। তিনি নেপালে অবস্থান করে মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। মোহাম্মদপুরের হাউজিং ব্যবসাকে কেন্দ্র করে নবীবাহিনী প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ধানমন্ডির বৃহৎ অংশ এখনও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নিয়ন্ত্রণে। ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট ও কলাবাগান থানা এলাকার মাদক ব্যবসার একছত্র নিয়ন্ত্রণ ইমন বাহিনীর হাতে।
জানা গেছে, শাহাদাৎ, মুকুল, সুব্রত বাইন, জয়, বিকাশ, মানিক, জিসানসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশের বাইরে থেকে অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের অনুসারী সন্ত্রাসীদের দিয়ে বড় ধরনের দরপত্রসহ নিয়ন্ত্রণসহ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। র‌্যাব-পুলিশকে বিষয়টি জানাতেও অনেক ব্যবসায়ী ভয় পান। ভারতে পালিয়ে থাকা কিংবা কারাগারে থাকা এসব দাগী সন্ত্রাসী সেখানে বসেই বাংলাদেশের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু র‌্যাব ও ডিবির আতঙ্কে তারা সুবিধা করতে পারছে না। এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযোগ পাওয়া গেলেও দেশের বাইরে থাকায় তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ডিএমপির উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশের কাজই সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। সেই সন্ত্রাসী আন্ডারওয়ার্ল্ডের হোক বা বিদেশে অবস্থানকারী হোক। পুলিশ তাদের নেটওয়ার্ক নিয়ে সব সময় কাজ করছে। সন্ত্রাসী গ্রেফতারও হচ্ছে। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এজন্য পৃথক টিম কাজ করছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সক্রিয়
আরও পড়ুন