Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

দীনি দাওয়াতের মূলনীতি, শরয়ী বিধান ও পদ্ধতি

প্রকাশের সময় : ১৬ অক্টোবর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মাওলানা আবদুর রাজ্জাক

॥ দুই ॥
“আল্লাহ ও তার রাসূল যখন কোন বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়সালা দান করেন, তখন কোন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী নিজেদের বিষয়ে কোন ইখতেয়ার বাকি থাকেনা। যদি কেউ আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্যতা করে, সে তো সুস্পষ্ট গোমরাহীতে পতিত হল”(সূরা আহযাব-৩৬)
“হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তার রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা ইখতিয়ারধারী তাদেরও। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যদি কোন বিষয়ে বিরোধ দেখা দেয় তবে তোমরা আল্লাহ ও পরকালের সত্যিকারের বিশ্বাসী হয়ে থাকলে সে বিষয়কে আল্লাহ ও রাসূলের উপর ন্যস্ত কর। এটাই উৎকৃষ্টতর পন্থা, এর পরিণামও সর্বাপেক্ষা শুভ” (সূরা নিসা-৫৯)।
তৃতীয় রুকনের দাবি : ‘আমলে সালেহ’ এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যে আমল আল্লাহর পছন্দনীয়। আমলে সালেহ এর দু’টি মূল বিষয় (১) শরীআতে ইসলামীর অনুগত হওয়া। (২) একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হওয়া।
উক্ত দুই মূলনীতির যে কোন একটির পরিপন্থী হলে সে আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহ তাআ’লা বলেন “যে নিজ মালিকের সাথে মিলিত হওয়ার আশা রাখে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ মালিকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে” (সূরা কাহাফ-১১০)। আমলে সালেহ্ হলো, ঈমানের ফল। আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি সাক্ষ্য দেয়ার বাস্তব প্রমাণ।
দৃষ্টি আকর্ষণ : হাদীসে জিবরাঈল দ্বারা বুঝা যায় দীনের পূর্ণাঙ্গতা নির্ভরশীল ফিকাহ, আকাইদ এবং তাসাউফ এর উপর। এ হাদীসে ইসলামের দ্বারা ঈঙ্গিত করা হয়েছে, ফিকাহ’র দিকে। ঈমানের দ্বারা আকাইদের দিকে, আর ইহসানের দ্বারা তাসাউফের মূলের দিকে। আর এ বিষয়গুলো একটি অপরটির জন্য লাযেম তথা অপরিহার্য। দাওয়াতের আলোচ্য বিষয় হলো দীন। আর দীনের পূর্ণাঙ্গতা তিনটি বিষয়ের উপর। এ কারণে ফিকাহ, আকাইদ, তাসাউফ সবটিই দাওয়াতের আলোচ্য বিষয়। অর্থাৎ দীনি শিক্ষা, বিশুদ্ব আকিদা-বিশ্বাস এবং আমল ও আত্মশুদ্ধি সব বিষয়ের দিকে দাওয়াত দেয়াই দাওয়াতে দীনের আলোচ্য বিষয়। আবার কালিমার মাধ্যমে গাইরুল্লাহকে অস্বীকার করা হয়েছে। এজন্য আল্লাহ তাআ’লার মনোনীত দীন ইসলামের দিকে আহ্বান করাই দাওয়াতে দীনের আলোচ্য বিষয়। এবং মুহাম্মদ (সা.) কে রাসূল হিসাবে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে তার আদর্শকে গ্রহণ করা হয়েছে, এজন্য একমাত্র রাসূল (সা.)-এর আদর্শের দিকে দাওয়াত দেয়াই হলো দাওয়াতে দীনের আলোচ্য বিষয়। এ ছাড়া অন্য কারো মতবাদ ও মতাদর্শের দিকে দাওয়াত দেয়া আলোচ্য বিষয় হতে পারে না। বরং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর যে আদর্শ রয়েছে সবগুলোই দাওয়াতে দীনের আলোচ্য বিষয়। যেমন ব্যক্তিগত জীবনের আদর্শ, পরিবারনীতি, সমাজনীতি, ব্যবসানীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সবটিতে রাসূলের যে আদর্শ রয়েছে সবই দাওয়াতে দীনের আলোচ্য বিষয়।
দাওয়াতে দীনের দ্বিতীয় মূলনীতি ‘দা’ঈ তথা আহবানকারী’
শরীয়ত কর্তৃক দাওয়াতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলো দায়ী। দায়ী বিষয়ের আলোচনার তিনটি দিক রয়েছে।
(১) দায়ীর পরিচয় (২) দায়ীর প্রস্তুতি (৩) দায়ীর চরিত্র।
দায়ীর পরিচয় : আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইসলামের মত নিয়ামত দান করেছেন। আল্লাহর এ নিয়ামতের পথে সর্বপ্রথম আহ্বানকারী হলেন, নবী কারীম (সা.)। কোরআনে কারীমে রাসূল (সা.) কে বারবার সম্বোধন করা হয়েছে যাতে তিনি দাওয়াতের বিষয়ে অটল অবিচল থেকে সদা-সর্বদা সে দায়িত্ব পালন করে যান এবং দাওয়াতী কাজ থেকে বিমুখ না হন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন “তুমি নিজ প্রতিপালকের দিকে দাওয়াত দিয়ে থাক। নিশ্চয় তুমি সরল পথে আছ” (সূরা হজ্জ-৬৭)।
“তুমি নিজ প্রতিপালকের দিকে মানুষকে ডাকতে থাক এবং কিছুতেই মুশরিকদের অর্ন্তভুক্ত হইওনা” (সূরা কাসাস-৮৭)।
বাস্তবতা হলো, দাওয়াতের এ দায়িত্ব সকল নবী-রাসূলগণের উপর অর্পিত ছিল এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণ এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে ছিলেন। তারা স্ব-স্ব সম্প্রদায়কে আল্লাহর পথে আহ্বান করে ছিলেন। তাদের দাওয়াতে দীনের দায়িত্ব পালনের আলোচনা কোরআনে কারীমের বহু আয়াতে এসেছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেন “নিশ্চয় আমি প্রত্যেক উম্মতের ভেতর কোন না কোন রাসূল পাঠিয়েছি এ পথনির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর” (সূরা নাহল-৩৬)।
দাওয়াতের দায়িত্ব সকল উম্মতের উপর : যেসব আয়াতে রাসূল (সা.) কে দাওয়াতে দীনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, তাতে সকল মুসলিম উম্মাহও শরীক আছে। এ ছাড়াও সরাসরি উম্মতের উপর দাওয়াতে দীনের দায়িত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেন “(হে মুসলিমগণ) তোমরা সে শ্রেষ্ঠতম দল, মানুষের কল্যাণের জন্য যাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা পূণ্যের আদেশ ও অন্যায় কাজে বাধা দিতে থাক এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ” (সূরা আলে ইমরান-১১০)।
উক্ত আয়াতে দু’টি বিষয় বিবৃত হয়েছে, একটি হলো উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্টত্ব। কারণ পুণ্যের কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের বাধার প্রথম কথা হলো, আল্লাহর পথে আহ্বান ও সব ধরনের শিরক থেকে মুক্তির নির্দেশ। আর এ দাওয়াতই হল মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্য। আল্লাহ বলেন “মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী সকলই এক রকম। তারা মন্দ কাজের আদেশ করে, ভালো কাজে বাধা দেয় এবং তারা নিজেদের হাত বন্ধ করে রাখে” (সূরা তাওবা-৬৭)।
“মুমিন নর ও মুমিন নারী তারা পরস্পরে একে অন্যের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ করে ও অসৎকাজে বাধা দেয়”
(সূরা তাওবা-৭১)।
দাওয়াতে দীনের দায়িত্ব কী বিশেষ শ্রেণির উপর : দীনের দাওয়াত সকল উম্মতের উপর ফরজ, এতে কোন সন্দেহ নেই। সূরা আলে ইমরানে এ কথা বলা হয়েছে যে “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই, যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং মন্দকাজে বাধা দিবে”। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, দাওয়াতের দায়িত্ব বিশেষ কোন দলের উপর বরং প্রত্যেক মুসলমানের উপর স্বীয় ক্ষমতা অনুযায়ী সত্যের প্রচার-প্রসার ফরজ। তবে একটি বিশেষ দল এ কাজে লিপ্ত থাকা প্রয়োজন। ইবনে কাসীর (রহ.) এর অভিমত এটাই। অন্যায়-অশ্লীল কাজে হাত দিয়ে বাধা দেয়া, মুখ দিয়ে বাধা দেয়া ও অন্তরে ঘৃণা করার হাদীস দ্বারা এটাই প্রমাণিত। “তোমরা শ্রেষ্ট উম্মত তোমাদেরকে বের করা হয়েছে পূণ্যের আদেশ ও মন্দের বাধা দানের জন্য” এ আয়াতেরও দাবি এটা।
দাওয়াত হবে দায়ীর অবস্থা ও সামর্থের ভিত্তিতে : প্রতিটি মুসলমানের উপর দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করা ফরজ। তবে এটা দায়ীর অবস্থা ও সামর্থ্যরে উপর নির্ভরশীল। কেননা প্রত্যেক ফরজের ভিত্তি হলো শক্তির উপর। সামর্থ্যরে দুটি বিষয়, একটি হল ‘ইলম’ অপরটি হল ‘ক্ষমতা’। যারা ইলম গোপন করে তাদের উপর লা’নত করে। কোরআনে পাকে আল্লাহ তাআ’লা বলেন “নিশ্চই যে সকল লোক আমার নাযিলকৃত উজ্জ্বল নিদের্শনাবলী ও হিদায়েতকে গোপন করে, যদিও আমি কিতাবে তা মানুষের জন্য সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেছি, তাদের প্রতি আল্লাহও লানত করেন এবং অন্যান্য লা’নত বর্ষণকারীরাও লা’নত বর্ষণ করেন”(সূরা বাকারা-১৫৯)।
ক্ষমতাবানদের দাওয়াত দানের তাৎপর্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন “তারা এমন যে, আমি যদি দুনিয়ায় তাদেরকে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে। সব কাজের পরিণতি আল্লারই হাতে”(সূরা হজ্জ-১৫৯)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ