Inqilab Logo

ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০২ পৌষ ১৪২৫, ৮ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ তার স্মৃতি

প্রকাশের সময় : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সুলতান আহমদ শহীদ
১৯৮৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাবা, কবি মনিরউদ্দীন ইউসুফ যখন ইন্তেকাল করেন, তখন আমার বয়স ছিল প্রায় চল্লিশ বছর। ছেলে হিসেবে তাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আমার এখনও মনে আছে। এর মাঝে দু-একটি উল্লেখ করছি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা, আমাদের অভিভাবক এবং সঠিক দিকনির্দেশক। ২৫ মার্চের পরদিন থেকেই তিনি একাধিক দিন আমাদেরকে বলেছেন, “পাকিস্তান আর টিকবে না, টিকতে পারে না। কারণ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বার বার বলেছেন, ‘সীমা লঙ্ঘন করো না; সীমা লঙ্ঘনকারীকে আমি ভালোবাসি না।’ এই পাকিস্তান যা করেছে তা চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন; সুতরাং পাকিস্তান আর টিকতে পারে না। আজ হোক, কাল হোক, আল্লাহর শাস্তি ওদের ওপর পড়বেই। তবে সেটা আমরা দেখে যেতে পারব কিনা, জানি না।”
আমাদের এক চাচা জাহিদ সিদ্দিকী ছিলেন বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ¯েœহধন্য। তিনি ছিলেন বাবার চেয়ে অন্তত সাত-আট বছরের ছোট; সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই অর্থাৎ তার বাড়িও ছিল বৌলাইয়ে। তার বাবা ছিলেন ইংরেজ আমলে অখ- ভারতের একজন প্রখ্যাত উর্দু কবি। নাম খালেদ বাঙালি। এই বাঙালি পদবিটি ভারতের দিল্লি, লক্ষেèৗর উর্দু কবিদের দেয়া। কারণ সে সময় তার বেশ কয়েকটি বই সেসব নগরীতে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পঠিত হতো।
শুধু খালিদ বাঙালির পরিবারই নয়, সে সময় বৌলাইয়ের অন্যান্য হিস্যার পরিবারও উর্দু, ফার্সি চর্চায় বিশেষ পারদর্শী ছিল। এর মধ্যে মনিরউদ্দীন ইউসুফের পরিবারও অন্যতম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কয়েক দিন আগে ৭ মার্চ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন, তাতে সাড়া দিয়ে জাহিদ সিদ্দিকী করাচির রাইটার্স গিল্ডের চাকরি থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তখন দুজনের মধ্যে অভিন্ন আলাপ-আলোচনার একটি কথা আজও মনে পড়ে। বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি এক মাসের ছুটি নিয়ে চলে এসেছো, এই দীর্ঘ দিনের ছুটি ওরা তোমায় দিল? এ সময় তার উত্তর এরকমÑ ‘না দিয়ে উপায় আছে? ওরা ছুটি না দিলে আমিই আপনাআপনি চলে আসতাম।’
ইতিমধ্যে জাহেদ চাচা অষ্টগ্রাম, বৌলাই ইত্যাদি স্থান ঘুরে অন্যান্য সময়ের মতো এবারও তিনি প্রায় প্রতিদিনই বাবার কাছে আসতেন। তখন তাদের দুজনের কথাবার্তা অন্তত কয়েক ঘণ্টা চলত। আমরা যারা তখন তরুণ তারাও সেসব কথাবার্তা শুনতাম। কখনো একই ঘরে বসে, কখনো বা খোলা দরজার ওপাশের ঘর থেকে। গুরুত্বপূর্ণ এসব কথার ফাঁকে ফাঁকে নানারকম কৌতুকর কথাবার্তা বলার অভ্যাস তার ছিল। এ ধরনের কথা আমাদের মতো তরুণদের খুব আকৃষ্ট করত তখন। বাবাও তার সেসব কথা শুনে হাসতেন এবং মজা পেতেন।
২৫ মার্চ রাতের হত্যাকা-ের পর দুই-তিন দিনের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচার শুরু হয়ে গেল। প্রথম দিকে ক্ষীণ শব্দ এলেও পরবর্তী মাসখানেকের মধ্যে তা বেশ ভালোভাবেই শোনা যেতে লাগল। যতটুকু মনে পড়ে প্রতি রাতে রাস্তার পাশের জানালা বন্ধ করে সবাই অত্যন্ত আগ্রহভরে শুনতাম। তখন এটিই ছিল সারা দিনের পরে রাতে আমাদের সবার আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। এর মধ্যে এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ সবার মর্ম স্পর্শ করল। ‘পাকিস্তানের খান সেনারা বাংলার মুক্তিসেনা বিচ্ছুগুলোর গাবুর মাইর খাইয়া এখন আর দিশা পাইতেছে না। সেই ভোমা ভোমা মুছুয়াগুলা এখন যেন পালাই করেও পালাবার পথ পাইতেছে না।’ এমনি ধরনের কথা আর টুকটাক রসালো বক্তব্য পরিবেশন করে ‘চরমপত্র’ তখন সবার মুখে মুখে। এ সময় একদিন জাহেদ চাচা এলেন। সেদিন কথা প্রসঙ্গে বাবা তাকে বললেন, ‘জাহেদ মিয়া! একটা কাজ করতে পার। কাজটা তোমার পছন্দ হবে। তুমি বরং কলিকাতা চলে যাও। যাবার ব্যবস্থা আমিই করে দেবো ইনশাআল্লাহ!’ কথাটা শুনে তিনি বললেন, ‘সেখানে গিয়ে আমি কী করবো।’ “হ্যাঁ বলছি, মন দিয়ে শোন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘চরমপত্র’ শুনে আমরা যেমনটা উজ্জীবিত হচ্ছি, পাক সেনারা কিন্তু তার কিছুই বুঝছে না। কারণ, এরা কেউই বাংলা বোঝে না। তাই ওদের মনোবল যাতে ভেঙে যায়; সে জন্য চরমপত্রের মতো একখানা উর্দু অনুষ্ঠান করতে হবে। এখন যে উর্দু অনুষ্ঠানটি চলছে, তা মোটেই মানসম্মত নয়। এই উর্দু অনুষ্ঠানটিকে মানসম্মত করতে হলে তোমার মতো উর্দু জানা এবং স্বাধীনচেতা একজন দরকার। আমি সৈয়দ নজরুলকে লিখে তোমার পরিচয়টা তাকে জানিয়ে দেব। আমার লেখা চিঠিটা তুমি তাকে দেবে। আশা করি, তিনিও রাজি হবেন। তবে মনে রাখবে, উর্দু অনুষ্ঠানটির মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এমন একটি কথিকা প্রচার করতে হবে যাতে পাক সেনাদের মনোবল ভেঙে যায়। স্বাধীনতার পক্ষে এটাই হবে আমাদের প্রধান কাজ। এ ছাড়া এখানে থেকে আমি মাঝে মাঝে লোক মারফত তোমার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি পাঠাবো।”
স্বাধীনতা যুদ্ধের নয়টি মাস আমরা ঢাকাতেই ছিলাম। ঢাকার বাইরে যেতে পারিনি। বাবার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা’ বইখানিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন কিছু বর্ণনা আছে। তা থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করা হলো :
‘দিনদশেক কি পনেরো দিন পরে। এক পশলা বৃষ্টি হলো। বললাম, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। এবার পাঞ্জাবিরা মজা দেখবে। বর্ষায় তো বাংলাদেশ ওদের জন্য ‘সমুদ্দুর’। তখন ওরা ‘কাঠওয়াচিৎ’-কচ্ছপ যেমন চিৎ হয়ে পড়লে বেকার হয়ে যায়, ওরাও তেমন হবে। ঢাকা শহরের অবস্থা তখন কেমন বলবো? লোক কাজকর্ম ঠিকই করছে, তবে তাদের মন মরে গেছে। রূপকথার রাজপুরীতে রাক্ষসের আগমনের পর থেকে কারো মনে নিরাপত্তার লেশমাত্র নেই। আজ একে রাক্ষসে খেয়েছে, কাল ওকে। কে যে কখন রাক্ষসের পেটে যায়, কেউ বলতে পারে না।’ (আমার জীবন আমার অভিজ্ঞতা-পৃষ্ঠা-১৮৬)।
অনেক দিন আগের কথা। আমার বয়স তখন এগারো কি বার। খুব সম্ভব ১৯৫৬ সালের কথা। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। সে সময় আমরা ময়মনসিংহ শহরে থাকি। আমাদের বাসায় ইত্তেফাক পত্রিকা পড়া হতো। সেই পত্রিকায় একদিন দেখলাম, ‘আগামী অমুক দিন ভারতসহ পার্শ্ববর্তী বিশাল এলাকা সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে। এই বন্যা থেকে বাঁচার জন্য ভারতের বেশ কিছু মানুষ লোটা কম্বল নিয়ে হিমালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।’ পত্রিকার খবর দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। বাবা তো আমাদের কাছে নেই। তিনি তখন ঢাকায়। সেদিনই তাকে চিঠি লিখলাম। তাতে যা লিখেছিলাম তার মূল কথা এই; ‘বাবা, পত্রিকায় দেখলাম ওমুক দিন সারা দেশ সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে। আমাদের জন্য সেদিন কেয়ামত হবে। তাই আপনি কালই চলে আসুন। মরবো তো একসাথেই মরি।’
দিন চারেক পর চিঠির উত্তর পেলাম। তিনি যা লিখেছিলেন, তার মূল কথা এই; ‘ভবিষ্যতে কী হবে এবং কেয়ামত কখন হবে, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন। মানুষ তা আগে থেকে বলতে পারে না। তাই অনর্থক দুশ্চিন্তা করো না। কাজ শেষ হলেই আমি চলে আসবো।’ বাবা যা বলেছিলেন তাই হলো। অর্থাৎ সেই দিন কিছুই হলো না। পৃথিবী যেমন চলছিল, তেমনই চলতে লাগল।
মফস্বল শহরের এক কিশোরের কাগজ ছাপার অক্ষরে লেখা খবরকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলাম। সেদিন থেকে বাবার প্রতি একটা গভীর প্রত্যয় আমার মতো এক কিশোরের মনে বদ্ধমূল হয়ে রইল।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।