Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

ক্রিকেটার মোহাম্মদ শামিকে নিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক আচরণ

| প্রকাশের সময় : ২৭ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৪ এএম

আভ্যন্তরীন ভোটের রাজনীতি, আন্ত:দেশীয় সীমান্ত থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিড়াঙ্গণ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ সব সময়ই হাই-প্রোফাইল হিসেবে স্বীকৃত। দুবাইতে চলমান আইসিসি টু-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে তারা মুখোমুখী হয়েছিল। গত ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ম্যাচের ফলাফল এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এর প্রথম কারণ হচ্ছে, প্রথমবারের মত কোনো আইসিসি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের কাছে ভারতের অভাবনীয় পরাজয়। ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা, আন্তর্জাতিক যেকোনো টিম যেকোনো দলকে হারাতে পারে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তবে চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী পাকিস্তানের কাছে ১০ উইকেটের শোচনীয় পরাজয় ভারতীয় সমর্থকরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। পরাজয়ের এ কারণকে ভারতীয় অনেক উগ্র হিন্দুত্ববাদী দর্শক দলের পেস বোলার মোহাম্মদ শামির বোলিংকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে সাম্প্রদায়িকভাবে আক্রমণ করছে। মুসলমান বলে তাকে জঘন্য ভাষায় তিরস্কার করছে। অথচ ঐ ম্যাচে ভারতের বোলিং লাইনের অন্য সেরা পেসাররা ছিল। তারাও কোনো উইকেট পায়নি। তাদের প্রতি কোনো বিরূপ মন্তব্য না করে একমাত্র শামিকেই টার্গেট করে মুসলিম বিদ্বেষী মন্তব্য করছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, ১১ জনের টিমে একজন মোহামম্মদ শামি ফলাফল নির্ধারক নন। এর দায়-দায়িত্ব পুরো টিমের। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, শামি মুসলমান বলেই তাকে এককভাবে দায়ী করে আক্রমণ করা হচ্ছে। সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের প্রেসিডেন্ট আসাদউদ্দিন ওয়াইসি শামিকে আক্রমণকারীদের কার্যত মুসলিমবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে বিষয়টিকে মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, দলে ১১ জন ক্রিকেটার। সবাই মিলে হেরেছে। তারপরও শুধু শামিকেই কেন দোষারোপ করা হচ্ছে? মুসলিম বলে? এটা ¯পষ্ট মৌলবাদ। মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা থেকেই এমনটা করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, খেলায় আপনি জিততে পারেন, হারতেও পারেন। তাহলে হারের জন্য শুধু একজন মুসলিম ক্রিকেটারকে টার্গেট করা হচ্ছে কেন?
ভারত-পাকিস্তানের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব এবং ভারতে বিজেপি শাসনের চরম সাম্প্রদায়িক উগ্রতা এবার ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে পরিচিত ক্রিকেটে ছড়িয়ে দিয়েছে ভারতের উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ একটি গোষ্ঠী। তবে ভারতের ক্রিকেটে হারের পর দোষারোপ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর ইতিহাস এটাই প্রথম নয়। এর আগেও এমন ঘটনার নজির রয়েছে। এবার এমন এক সময়ে এটা ঘটেছে, যখন ভারতে মুসলমান বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে, এনআরসি’র নামে, গো-রক্ষার নামে মুসলমান হত্যা, নির্যাতন, নীপিড়ন ও সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এখন ক্রিকেট নিয়ে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সমর্থকদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিষয়টি পশ্চিমা গণমাধ্যমেও আলোচিত হচ্ছে। ক্রিকেটে পাকিস্তানের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর ভারতীয় সমর্থকরা মোহাম্মদ শামিকে পাকিস্তানের চর, কালো মুসলিম, ম্যাচ পাতানো ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, ভারতীয় ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে শামির পক্ষে জোরালো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। অথচ একই দিনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে লিটন দাসের দুইটি ক্যাচ ড্রপ বাংলাদেশের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলেও বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন মাহমুদুল্লাহ ও মুশফিকসহ ক্রিকেট বোর্ড লিটন দাসের পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মোহাম্মদ শামির উপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণের সময় বিরাট কোহলিসহ দলের অন্যদের নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। শামির ওপর উগ্রবাদীদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট এ নিয়ে প্রতিবেদনও করেছে। বলা বাহুল্য, লিটনদাস যেমন দীর্ঘদিন ধরে দেশের পক্ষে ভাল খেলা উপহার দিয়েছেন, তেমনি মোহাম্মদ শামিও বিভিন্ন সময়ে ভারতের জয়ে অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। এখানে যে দল যেদিন ভালো খেলে সে দলই জিতে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ভারতের দশ উইকেটে হার থেকে বুঝা যায়, দিনটি ভারতীয় ক্রিকেট টিমের জন্য অনুকূল ছিল না। এর দায় পুরো টিমের।
দুবাই ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের কাছে ভারতের রেকর্ড করা পরাজয় মোহাম্মদ শামির একার ব্যর্থতার ফল নয়। এটা পুরো দলেরই ব্যর্থতা। কিন্তু শামি মুসলমান হওয়ায় তাকে একা দায়ী করে ভারতীয় উগ্রবাদীরা ট্রল করা শুরু করেছে। এটা তাদের চরম সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ আচরণ ছাড়া কিছুই নয়। একইভাবে বলিউডের সুপারস্টার শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে কথিত মাদক মামলা নিয়ে মিডিয়া ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে সেখানে বিদ্যমান উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও মুসলমান বিদ্বেষ ন্যাক্কারজনকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কিংবদন্তি স্ক্রিপরাইটার জাভেদ আখতার বলেছেন, ক্রুজ জাহাজটিতে ১২শ’র বেশি যাত্রী থাকলেও মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের অভিযানে শুধুমাত্র আরিয়ান খান ও তার কয়েকজন সহযোগীকে আটক করেছে। এটা মুসলমান বিদ্বেষ থেকেই করা হয়েছে। আরিয়ান মুসলমান বলেই তাকে নানাভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে। ভারতে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মুসলিম বিদ্বেষ পুরো উপমহাদেশকে এক ধরনের অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতে মুসলমান হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হলে সেখানে এ নিয়ে কোনো কথা হয় না। অথচ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলে ভারতের শাসক গোষ্ঠীর গায়ে জ্বালা ধরে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে যর্থাথভাবেই ভারতকে আহবান জানিয়ে বলেছেন, সেখানে যাতে এমন কোনো ঘটনা না ঘটে যার প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে। তাদেরও সতর্ক এবং সচেতন থাকতে হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা হলে দেশের আলেম-ওলামা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ভারতে ঘটছে উল্টো ঘটনা। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশটিতে কিভাবে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে। এক ম্যাচে পুরো ভারতীয় দলের ব্যর্থতা না দেখে মোহাম্মদ শামির ব্যর্থতাকে বড় করে দেখা হচ্ছে শুধুমাত্র সে মুসলমান হওয়ায়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। আমরা মনে করি, খেলার হার-জিৎকে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক রূপ না দেয়া এবং এ নিয়ে রাজনীতি না করা সভ্য মানুষের পরিচয়। হার-জিৎ থাকবেই, তবে তা খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধতা রাখাই শ্রেয়।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন