Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৪ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরী

মিয়ানমার থেকে আসছে অস্ত্র

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সক্রিয় একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ

জাকের উল্লাহ চকোরী, কক্সবাজার থেকে | প্রকাশের সময় : ২৮ অক্টোবর, ২০২১, ১২:০৪ এএম

কক্সবাজারের আলোচিত উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্র নিয়ে এখন আর কোনো রাখঢাক নেই। একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সেখানে সক্রিয়, তাদের সবার হাতেই রয়েছে আধুনিক অস্ত্র। সেই অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী আর প্রভাব বিস্তারের কাজে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এই অবৈধ অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের ডি ব্লকের আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের কার্যালয়ে শীর্ষ রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা এবং গত ২২ অক্টোবর রাতে বালুখালী ক্যাম্প-১৮-এর এইচ-৫২ ব্লকে দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল ইসলামিয়াহ মাদরাসায় হামলা চালিয়ে ছয় রোহিঙ্গা হত্যার ঘটনা একই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের পরিকল্পিত মিশন ছিল।

পুলিশ সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে যে পাঁচ অস্ত্রধারী ছিলেন, তারা সবাই ভারী আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার করেন। সবশেষ গত শুক্রবার ভোরে যে ছয়জনকে খুন করা হয়, সেখানে বিদেশি অস্ত্রের পাশাপাশি দেশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। আর এ পর্যন্ত যত অস্ত্র ধরা পড়েছে তার বেশিরভাগই বিদেশে তৈরি। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় অস্ত্র মামলা হয়েছিল ১৭টি ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৭টি। আর চলতি বছরের ৯ মাসে ১৫টি অস্ত্র মামলা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১৪টি দেশীয় পিস্তল, ৪৪টি এলজি, ৩টি বিদেশি পিস্তল, ৩০টি একনলা বন্দুক, ২৫টি দেশি বন্দুক, ৪টি পাইপগানসহ প্রচুর পরিমাণ ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সময়ের মধ্যে ১২৩টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সীমান্ত ও ক্যাম্প নিয়ে কাজ করেন এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার থেকে মাদক চালানের সঙ্গে অস্ত্র আসছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। মাদকের মূল হোতারা মাদক পাচারকালে ব্যবহারের জন্য তাদের বহনকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। আবার অনেকে মাদক বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গাদের। সেই সুবাদে ক্যাম্পে তারা যেকোনও কর্মকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে। এতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক এক সভায় বলেছেন, ক্যাম্পগুলোয় অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টায় মিয়ানমার থেকে অস্ত্র আসছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করছেন রোহিঙ্গারা। অস্ত্র তৈরির কাজে লাগাচ্ছেন মহেশখালীর অস্ত্রের কারিগরদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, মহেশখালীতে নৌদস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করা ৯৬ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরোনো ব্যবসায় ফিরে গেছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল হাই নিজেও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আগস্ট মাসে পাহাড়ে কারখানা থেকে পাঁচটি নতুন তৈরি অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ মাহমুদুল করিম নামের এক কারিগরকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছেন। র‌্যাব বলছে, গত বছরের ৫ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে তারা একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার খোঁজ পায়। সেখান থেকে অস্ত্র তৈরির দুই কারিগরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে গত ৪ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা কোন্দলে ১১৪ জন খুন হয়েছেন। সম্প্রতি মুহিবুল্লাহ ও ছয় খুনের তথ্য যোগ করে বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (বিপিও) এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিটি খুনের ঘটনায়ই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করেনি পুলিশ।

শুধু খুনোখুনি নয়, পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ৪ বছরে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধে ১ হাজার ৩৬৯টি মামলা হয়েছে। মাদক, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণের মামলায় আসামি করা হয় ২ হাজার ৩৮৫ জনকে। যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু তারপরও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ করছে। এদিকে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলোচিত এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই আতঙ্কে রয়েছে রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ক্যাম্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়েছে।
বালুখালী ক্যাম্পের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার এবং ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গ্রুপ আরসা বা আল ইয়াকিনের নামে একটি পক্ষ ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া। অন্যদিকে আরএসও এবং ইসলামী মাহাস নামে আরও দুটি সংগঠনও ক্যাম্পে তৎপরতা চালাচ্ছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে তাদের ধরতে মাঠে নেমেছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অস্ত্রধারীদের মধ্যে আব্দুল হাকিম, মো. আনাস, মাহাদ, মুন্না, হাফেজ, মো. ইউনুছ, শাহ আলম, পুতিয়া, মো. খালেক, রাশেদ, জকির আহমদ ওরফে জকির ডাকাত, হাসান ওরফে কামাল, খলিফা সেলিম, খায়রুল নবী, মোহাম্মদ রাজ্জাক, মোহাম্মদ রফিক, দোস মোহাম্মদ, নুরু মিয়া প্রকাশ ভুইল্ল্যা, মোহাম্মদ নুর, বনি আমিন, সালমান শাহ, রশিদ উল্লাহ, খায়রুল আমিন, মহিউদ্দিন ওরফে মাহিন, সাদ্দাম হোসেনসহ আরও অনেকে রয়েছে। তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। এসব বাহিনীর কাছে একাধিক দেশীয় তৈরি বন্দুকসহ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কক্সবাজার


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ