Inqilab Logo

সোমবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২২, ০৩ মাঘ ১৪২৮, ১৩ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের মামলা তুলে নেয়া হবে

দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের তৃতীয় বর্ষ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সাখাওয়াত হোসেন, রামপাল (বাগেরহাট) থেকে | প্রকাশের সময় : ২ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০২ এএম

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সুন্দরবনে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের সব মামলা তুলে নেওয়া হবে। তবে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। গতকাল সোমবার দুপুরে বাগেরহাটের রামপালের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে মন্ত্রী আত্মসমর্পণকারী ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ জনকে ১০২টি ঘর, মুদি দোকান ৯০টি, জাল ও মাছ ধরার নৌকা ১২টি। এর মধ্যে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ৮টি ও ২২৮ টি গবাদিপশু জলদস্যু ও তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।

‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন দিবস তৃতীয় বর্ষপূর্তি ও আত্মসমর্পনকৃতদের পুনর্বাসন’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আরো বলেন, আত্মসমর্পন কারীদের মামলাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় আমরা দাপ্তরিক কাজকর্ম অব্যাহত রেখেছি। তারই অংশ হিসেবে আমি নিশ্চিত করতে পারি যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদের মামলাগুলো তুলে নেওয়া হবে। তারা যেন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন সেজন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে মাছ কিংবা মধু আহরণ করা হতো। তবে এগুলোকে টার্গেট করে গড়ে ওঠে জলদস্যু ও বনদস্যু বাহিনী। অবশ্য এসব দুষ্কৃতকারীদের বাধ্য করা হতো অপরাধে। যার পেছনে ইন্দন দাতারাও ছিল। তবে বর্তমানে সুন্দরবনের যে ধারা প্রবাহ অর্থাৎ জলদস্যুমুক্ত হয়েছে এটাকে ধরে রাখতে হবে। এ ধারা অব্যাহত এবং সুসংহত করতে একটি স্থায়ী ক্যাম্প করা হবে। এখানে আর ডাকাতি হতে দেবো না। সেটা নদী, উপকূল কিংবা বন হোক। সুন্দরবনে এখন শান্তি প্রবাহমান। অথচ এখানে আগে মাছ ধরা জেলে কিংবা মধু আহরণকারীদের আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করাসহ নানা ধরনের অপরাধ করে আসছিল। প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে তারই অংশ হিসেবে জলদস্যু কিংবা তার পরিবারের কথা চিন্তা করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা যেন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন সে জন্য নগদ অর্থ, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু এমনকি নৌকা ও জাল দেওয়া হয়েছে। যাতে করে তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এখানেই শেষ নয়। যাদেরকে এ ধরনের পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে তাদের বিষয়ে নিবিড় নজরদারিও থাকবে। তারা যদি পুনরায় একই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে কোন ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর যেসব জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন অথচ তাদের মামলা আছে এসব মামলাগুলো কিভাবে প্রত্যাহার করা যায় এ জন্য পাবলিক প্রসিকিউটর সহ (পিপি) সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বিভাগের সঙ্গে আমরা সমন্বয় করে যাচ্ছি। আশা করছি সেক্ষেত্রে সহসাই এসব মামলা তুলে নেওয়া বা প্রত্যাহার হয়ে যাবে।

অনুষ্ঠানে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ঐসব অসাধু সুবিধাভোগীরা বনদস্যুদের বাধ্য করতো সুন্দরবনে যেতে। টাকা কিংবা মুক্তিপণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানোর জন্য উংসাহ দিতো। তারা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা এক সময় পালিয়ে এ পেশাও বেছে নেয়। তবে তারপরও ওই সব সুবিধাভোগীরা বনদস্যুদের পিছু ছাড়েনি। তারা দস্যুদের কাছ থেকে মাস কিংবা বছরওয়ারী মোটা অংকের টাকাও আদায় করতো।

সুন্দরবনের এখন সুবাতাস বইছে উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও র‌্যাবে মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সুন্দরবনে এখন বাঘ, হরিণ বেড়েছে। বেড়েছে বোনের সৌন্দর্য। তবে এটি এত সহজ পথ ছিল না। অনেকে আহত ও মারা গেছেন। দস্যুরা বিভিন্ন সময় অভিযানে গেলে আমাদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আর যাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে তারা যদি সরকারের যেসব নির্দেশ আছে সেগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করেন তাহলে এখন তাদের ঘরের মেঝে পাকা হয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে থাকলে প্রয়োজনে তার বাড়ির দেওয়ালও পাকা করে দেওয়া হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। শুধু আত্মসমর্পণকারী নয়, তার পরিবার-পরিজন কিংবা ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতি সহ নানা বিষয়ে আগামীতে সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে যে পথ থেকে একবার ফিরে আসা হয়েছে সেখানে আর কোনভাবেই যাওয়া যাবে না। তারপরও কেউ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আবারও জড়িয়ে পড়েন সেক্ষেত্রে তাকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে দুই বছর আগে। আত্মসমর্পণ করে দস্যুরা ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু যাদের মাধ্যমে তারা দস্যুপনায় জড়িয়েছে তাদের নাম এখনো বলতে চান না। তারা এতই প্রভাবশালী যে তাদের নাম বলা হলে আত্মসমর্পণকারী না এলাকায় থাকতে পারবেন না। গতকাল তারা বর্ণনা করেছেন অন্ধকার জীবনের নানা কাহিনী। কিভাবে তারা দস্যুপনায় জড়িয়েছেন সে বিষয়েও বিস্তারিত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদের মূল দাবী হলো অতীতের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া। কিন্তু এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি সেসব মামলা। তাই সরকারের কাছ থেকে তারা যে অনুদান পাচ্ছেন সেই টাকা তারা সংসারের জন্য খরচ করতে পারছেন না। মামলা মোকাবিলাতেই চলে যাচ্ছে সেই টাকা। এমনকি ধার-দেনাও করতে হচ্ছে।

একে একে তিনটি দস্যুদলের সদস্য ছিলেন মাহমুদ হাসান (২৭)। তিনি বলেন, আমার বাড়ি মংলার আন্দারিয়া গ্রামে। মাস্টার বাহিনী সাগর বাহিনী এবং বড় ভাই বাহিনীর অধীনে তিনি দস্যুপনা করেছি। ২০১৪ সালে যোগ দিই মাস্টার বাহিনীতে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া মাহমুদ হাসান বলেন, আমার মাথায় লম্বা চুল ছিল। এ কারণে অনেকেই আমাকে ডাকাত বলে ডাকতো। একদিন আমার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোকে মানুষ ডাকাত বলে ডাকে কেন? তুই কী ঢাকাতে করিস? জবাবে আমি বলি, আমি ডাকাতি করি না। তবে মানুষ যেহেতু ডাকাত বলে ডাকে, তাহলে সুযোগ পেলে ডাকাতি করবো। পরে সে আমাকে বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবন এ নিয়ে যায়। তার মাধ্যমেই আমি ঢাকাতে পেশায় যোগ দিই। প্রথম দিকে ভয় লাগলেও পরে ভয় কেটে যায়। আমি যে দস্যুপনায় যোগ দিয়েছি তা বাড়ির কেউ জানত না। কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। ওই জীবন খুব কষ্টের ছিল। যখন বুঝতে পারি, স্বাভাবিক জীবনে সারা প্রয়োজন, তখন ২০১৭ বড় ভাইয়ের নেতৃত্বে তার বাহিনীর সবাই মিলে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করি।

তিনি বলেন, সুন্দরবন এলাকার এক একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো এক একটি বাহিনী। আমরা জেলে, বাওয়ালি- মাওয়ালিদের বছরে দুইবার কার্ড দিতাম। তারা আমাদেরকে মাসুরা দিত। যাদের কাছে কার্ড থাকতো না তাদেরকে আমরা অপহরণ করতাম। কেড়ে নিতাম সর্বস্ব। এভাবে মাসের ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু মনে কোনো শান্তি পেতাম না। এখন রেন্ট-এ-কার চালাই। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালো আছে। আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বেঁচে আছি। তিনি বলেন, আত্মসমর্পণ করার পর আমাদেরকে জেলে পাঠানো হয়। যেদিন জেল থেকে ছাড়া পায় সেদিনই (২০১৭ সালে) বিয়ে করি।

“বড় ভাই’ বাহিনীর প্রধান বড় ভাই বলেন, আত্মসমর্পণ এর আগে গত ২৫ বছর ধরে আমি সুন্দরবনের গহীন বনে ছিলাম। কখনো ডাঙায় আসতে পারতাম না। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব ব্যবসায়ীরা তাদেরকে আমরা জিম্মি করতাম। মাছ ব্যবসায়ীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতাম। তিনি বলেন, আমার নামে ১০টি মামলা ছিল। আশা করেছিলাম আত্মসমর্পণের পর সেই মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু একটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। পল্টু নতুন করে আমার বিরুদ্ধে আরও তিনটি মামলা হয়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে সহায় সম্পদ যা ছিল সবই বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। সরকারের কাছে আমার কোনো দাবি নাই। দাবি কেবল একটাই, মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হোক। কারণ মামলা প্রত্যাহার করার শর্তে আমরা সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলাম। তিনি বলেন আমি ২০১৬ সালে আত্মসমর্পণ করি। এরপর জেলে পাঠানো হয়েছিল। ২১দিন কারাভোগের পর জামিন পাই। পরে আরেকটি মামলায় আমাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের গ্রেফতার করা ওই মামলায় ছয় মাসের বেশি জেল খাটি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

২৯ ডিসেম্বর, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ