Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৪ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

সাম্প্রদায়িক সংঘাত সভ্যতাবিরোধী

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ৮ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৬ এএম

শোষক ও শোষিত, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর সংঘাত আজ পৃথিবীব্যাপী, কোথাও বেশি, কোথাও কম। অবশ্যই এ সংঘাত সভ্যতার পরিপন্থী। বাংলাদেশের সংবিধান সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর তারতম্য স্বীকার করে না। তারপরও যে কোনো ঘটনার পিছনের শিকড় না খুঁজে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে তিলকে তাল বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে আমরা প্রকৃত ঘটনাকে হারিয়ে ফেলি। ফলে দোষী ব্যক্তি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। যে কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর নির্দোষ ব্যক্তিদের বিচারের জন্য কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো হয়, নামের সাথে জড়িয়ে দেয়া হয় সাম্প্রদায়িকতার লেবাস এবং এ কারণেই প্রকৃত ঘটনা ও ইনভেসটিগেশনের সমন্বয় থাকে না। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারা মোতাবেক পুলিশ সাক্ষীর যে জবানবন্দী রেকর্ড করে তাতে অনেক সময় সত্যোর অপলাপ হয় এবং এগুলি হয়ে থাকে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। প্রভাবান্বিত চার্জশিট দেওয়ার জন্য যাদের সাক্ষী করা হয় তাদের পরবর্তীতে আর খুঁজে না পাওয়ার কারণেই বিচার বিলম্বিত হয়, কিন্তু দায়ভার চাপানো হয় এককভাবে বিচার বিভাগের উপর। বিচারে বিলম্বের জন্য বিচার বিভাগ এককভাবে দায়ী হতে পারে না। এর পিছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়াও অনেক পারিপার্শকতা জড়িত, যার ত্রুটি ফাইন্ড আউট করার জন্য গভীর অনুসন্ধান ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং কোনো কারণেই এ ঘটনাকে সমর্থন করা যায় না। তবে সব ঘটনার জন্য ওয়াজ মাহফিল ও মাদরাসার প্রতি কটাক্ষ করে যে সকল উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য প্রকাশ করা হয় সেগুলিও সমর্থন করা যায় না। উপমহাদেশ ৭০০ বছর মুসলমানরা শাসন করেছে। কিন্তু মুসলমান রাজত্বকালে অন্য ধর্মের কোনো উপাসনালয়ে হামলার কোনো নজির নাই। তথাপি ধর্মভিত্তিক কোনো ঘটনার জন্য ভারত থেকে তো বটেই বাংলাদেশের অতি প্রগতিশীল নাস্তিকেরা মুসলমানদের দায়ী করে থাকে। অথচ, সাম্প্রদায়িকতার স্বর্গরাজ্য পূর্বেও ছিল ভারত, এখনো ভারত। ভারতেই অকারণে মুসলিম নিধন বেশি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারত সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানি দেয়, বাংলাদেশ তার বিপরীত।

ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল রয়েছে। বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলির যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ফকির মজনু শাহ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ মর্মে অনেক ফকির-দরবেশ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তারপরও ধর্মভিত্তিক সংগঠন-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার জন্য নাস্তিকেরা উঠে পড়ে লেগেছে। অন্য ধর্মের সেন্টিমেন্টের উপর আঘাত করা একটি মানসিক রোগ। দায় এড়ানোর জন্য পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মাধ্যমে এ রোগ শেষ হবে না। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক মোটিভেশন। সরকার তাদের ব্যর্থতার দায়ভার বিরোধী দলের উপর চাপাতে যেয়ে নিজেই আস্থাহীনতায় পড়েছে। ফলে ঘটনার যবনিকা টানতে পারছে না। এখন সরকারি দল ভোট ব্যাংক নষ্ট ও ভারতের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিএনপি-জামায়াতের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে সাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়ী করছে। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ভোট ব্যাংক বানিয়ে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছে, নাকি ব্রাকেট বন্দী করা হয়েছে, বিবেচনার ভার সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের উপর।

ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মহীনতা এক কথা নয়। তবে মোট জনসংখ্যার ৯২% মুসলমানের বাংলাদেশকে ধর্মহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ইউনির্ফম, লেবাস ও চালচলনের আলাদা সংস্কৃতি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। কারাগারের একটি নিজস্ব নিয়মশৃঙ্খলা দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসছে। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময় আমি কারাবরণ করেছি। যতবার কারাগারে গিয়েছি ততবারই কারা কর্তৃপক্ষ অন্যান্য আসামির মতো আমার চুল ছেঁটে ছোট করে দিয়েছে। পত্রিকান্তরে দেখলাম, মাদরাসার ৬ ছাত্রের চুল কেটে দেয়ার অভিযোগে লক্ষীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তারেক আজিজ জেলাধীন রায়পুরের মাদরাসা শিক্ষক মঞ্জুরুল কবির মঞ্জুকে কারাগারে প্রেরণ করেছেন। মাদরাসার ছাত্রদের চুল কেটে দেয়ার ঘটনায় শিক্ষক গ্রেফতার দেশবাসীর নিকট কী ম্যাসেস প্রদান করে? বিজাতীয় স্টাইলে বা ভারতের ফ্লিমি স্টাইলের অনুকরণে মাদরাসার ছাত্ররা চুলের স্টাইল করলে মাদরাসা শিক্ষকরা কি তাদের প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগী হবে না? বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের বিভিন্ন স্তরে ঢুকে পড়েছে। এ সংস্কৃতির প্রভাব কি আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তি জীবনে কোনো প্রকার সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পেরেছে? তাছাড়া ছাত্রকে শাসন করার জন্য যদি শিক্ষককে আদালতের আদেশে কারাগারে যেতে হয় তবে ছাত্রদের অনুশাসন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষকরা কেন অগ্রণী ভূমিকা রাখবে? তখন শিক্ষকদের শুধুমাত্র দায়িত্ব হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাজিরা দেয়া ও মাস শেষে বেতন নেয়া। এমনিতেই শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রের বেয়াদবী পূর্বের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষক পিটানো, এমনকি পানিতে ফেলে শিক্ষক চুবানোর ঘটনাও সম্প্রতিকালে ঘটেছে। মাদরাসার শিক্ষককে কারাগারে পাঠিয়ে ছাত্রদের অনুশাসনের জন্য শিক্ষক সমাজকে মানসিকভাবে অসহায় করে দেয়া হয়েছে।

ছাত্রজীবনে পাঠ্য বইয়ের একটি কাহিনী মনে পড়েছে। ঘটনাটি হলো, মুঘল বাদশার পুত্র শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দেয়ার দৃশ্য বাদশা দেখে শিক্ষককে ভর্ৎসনা করেছিলেন এ কারণে যে, বাদশার পুত্র কেন শুধু মাত্র পায়ে পানি ঢেলে দিলো, হাত দিয়ে শিক্ষকের পা পরিষ্কার করে দিলো না কেন? অথচ, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা আজ কোথায় চলে গেছে? বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, যদি তাই হয় তবে শিক্ষকদের অবস্থান কোথায় থাকার কথা এবং এখন কোথায় আছে? শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা হারাচ্ছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে ‘নৈতিক’ শিক্ষা গ্রহণ থেকে।

একটি নাস্তিক গোষ্ঠি, যারা মুসলমান নামধারী, ইসলাম এবং মুসলমান সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলে নিজেদের প্রগতিশীল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সম্প্রতি কুমিল্লা, পীরগঞ্জের জেলেপাড়ায় অগ্নিসংযোগ, চাঁদপুর, নাটোর, চৌমুহনীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পূজামন্ডপে অনাকাক্সিক্ষত ও বর্বরোচিত হামলার জন্য ইসলাম ধর্মের প্রতি আঙ্গুলি দেখাচ্ছে বিভিন্ন মহল। কেউ কেউ মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ করার দাবি করে একই রাষ্ট্রে দু ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চলতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন। সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ বাদ দেয়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ। ভোটের রাজ্যে বাজিমাত করার জন্য ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে হিরো সাজার চেষ্টাও আছে কারো কারো। অথচ, তাদের জানা উচিৎ যে, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যেখানে এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর জীবনীতে সাম্প্রদায়িকতার লেশ মাত্র পাওয়া যায় না। বিনা রক্তপাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয় করেছেন। ঐ সময় তিনি বলেছেন, কাবা শরীফে, নিজ বাড়িতে, এমন কি ইসলামের চিরশত্রু আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণকারীদের নিরাপত্তা দেয়া হবে। কেউ ইসলাম ধর্মে সাম্প্রদায়িকতা খোঁজে অজ্ঞতার কারণে, আবার নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যও এ কাজটি করে থাকে। একজন প্রকৃত মুসলমান সাম্প্রদায়িক নয় এবং তা হতে পারে না। সাম্প্রদায়িক বনাম অসাম্প্রদায়িক বিষয়টি এখন রাজনৈতিক খেলায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট শিক্ষক হযরত মুহাম্মাদ (সা.) প্রদত্ত শিক্ষার চর্চাই মূলত মাদরাসাগুলিতে হয়ে থাকে। অথচ, নাস্তিকদের কারণে এই মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন হুমকির সম্মুখীন। ইতোপূর্বেও অনেক শাসকগোষ্ঠি মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ করার অনেক পদক্ষেপ নিয়ে সফল হতে পারে নাই। ফলে নাস্তিকদের এ উদ্ভট চিন্তা সুদূর পরাহত। ধর্মকে যেমন নির্যাতনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা অনুচিত, ঠিক তেমনি সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে ‘সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাদ’ বন্ধ হবে না, বরং বিষ উৎপাদিত হতেই থাকবে।

বাংলাদেশের মানুষ ও মাটি সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করে না বা সমর্থন দেয় না। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আদমজী মিলের বিহারীরা হামলা চালায়। এ হামলা যখন নারায়ণগঞ্জ জেলার আশেপাশের গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় তখন দেখেছি আমাদের বাড়ির মসজিদে (রূপসী খন্দকার বাড়ি জামে মসজিদ, রূপগঞ্জ) হিন্দুদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বন্দুক নিয়ে বাড়ির লোকজনসহ আমার চাচারা রাতভর মসজিদ পাহাড়া দিয়েছে। আমাদের গ্রামটি হিন্দু মুসলমান যৌথ (৫০%+৫০%) অবস্থান ছিল। বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক দলগুলিও সম্প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপরে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে সমর্থন বা উৎসাহিত করে নাই। তারপরও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করার জন্য দাবি করা হচ্ছে। ভারতের হিন্দু নেতার তো ইসলাম ধর্মকে সাম্প্রদায়িক বানানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছে, বাংলাদেশের নাস্তিক মুসলমানরাও এ মর্মে বসে নাই। যদিও নাস্তিকতা একটি মানসিক বিষয় এবং ধর্মীয় অজ্ঞতা ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন যে, ‘যে বিজ্ঞানকে অল্প জানবে সে নাস্তিক হবে, আর যে ভালোভাবে বিজ্ঞানকে জানবে সে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাসী হবে।’ ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করা তথাকথিত প্রগতিবাদীদের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উস্কানি বন্ধ করতে হলে এ জাতীয় ফ্যাশন বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত দোষী ব্যক্তিকে দায়ী করতে হবে, তা না করে অন্য ধর্মকে দায়ী করা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এতে সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাঠিত হবে না, বরং এর শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটবে।

লেখক: রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সাম্প্রদায়িক সংঘাত সভ্যতাবিরোধী
আরও পড়ুন