Inqilab Logo

শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

প্রশ্নফাঁস চার চক্রের ২৫ জনকে খুঁজছে গোয়েন্দারা

পাঁচ বছরে হাতিয়েছে অর্ধশত কোটি টাকা প্রশ্নফাঁসের পেছনে যারা দৌড়ায় তাদেরও ধরা হবে : ডিবি

সাখাওয়াত হোসেন | প্রকাশের সময় : ১৫ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০০ এএম

পাঁচ বছরে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস চারটি চক্রের ২৫জনকে খুঁজছে গোয়েন্দারা। ওই চক্রের হোতা এ সময়ে প্রশ্নফাঁস ও প্রতারণা করে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট্র গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গোয়েন্দা পুলিশ ও সিআইডির কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এ সব তথ্য জানা গেছে।

ডিএমপির গোয়েন্দা (ডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতার দুইজন আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা আক্তারের আদালত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। অপর দিকে এই মামলার আরও চার আসামিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাড্ডা থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ৬ আসামিকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করেন। এদের মধ্যে দুইজন স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অন্যদিকে, বাকি আসামিদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে দুই আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করে সব আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

জবানবন্দি দেয়া দুই আসামি হলেন- প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি টেকনিশিয়ান মুক্তারুজ্জামান রয়েল ও জনতা ব্যাংকের গুলশান শাখার কর্মকর্তা শামসুল হক শ্যামল। কারাগারে পাঠানো অপর চার আসামি হলেন-জনতা ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা এমদাদুল হক খোকন, সোহেল রানা, ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল জাবেদ জাহিদ ও পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মিলন। গত ১০ নভেম্বর আদালত মুক্তারুজ্জামান রয়েল, শামসুল হক শ্যামল ও মোস্তাফিজুর রহমান মিলনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরদিন এমদাদুল হক খোকন, সোহেল রানা ও আব্দুল্লাহ আল জাবেদ জাহিদের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস চক্রের একাধিক গ্রুপকে আমরা শনাক্ত করেছি। এদের মধ্যে অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে। জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে আমরা কাজ করছি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এসএসপি-এইচএসপি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস চারটি চক্রের ২৫জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মূলহোতাদের অনেকেই এখনও পলাতক। এদের গ্রেফতার এবং জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, এ চক্রের সদস্যরা এ সময়ে প্রশ্নফাঁস ও প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

ডিবি তেজগাঁও বিভাগের এডিসি শাহাদত হোসেন বলেন, ব্যাংকের প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত আরও ২০ জনের নাম পেয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি ১০০ থেকে ২০০ জনের কাছে ফাঁস করা প্রশ্ন পৌঁছেছে। তবে এই ২০০ জনের মাধ্যমে আরও প্রার্থীদের কাছে প্রশ্ন পৌঁছেছে কি না তা আমরা খতিয়ে দেখছি। গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সরকারি ব্যাংকের অফিসার (ক্যাশ) পদে সমন্বিত নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষার দায়িত্বে ছিল বেসরকারি আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। পরীক্ষার আগের রাত থেকে এবং পরীক্ষার পর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এরপর মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৬ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ডিবি।

গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে, গ্রেফতার হওয়া সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রশ্নপত্র প্রণয়নসহ নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইসিটি বিভাগ থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ পর্যন্ত চক্রটি প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁসের মাধ্যমে দুই শতাধিক চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

প্রশ্নফাঁসের পেছনে যারা দৌড়ায় তাদেরও ধরা হবে: ডিবি
গতকাল ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেসন্স সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের দুই গ্রুপের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- কালিমুল্লাহ, আল-রাফি ওরফে টুটুল ও আব্দুল্লাহ আল মারুফ ওরফে তপু। তাদের মধ্যে কালিমুল্লাহ টঙ্গী সরকারি কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, আল রাফি টুটুল মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজের মানবিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও আব্দুল্লাহ আল মারুফ হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ছাত্র ও অভিভাবকদের মধ্যে যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা করে এবং যারা প্রশ্নপত্র কেনার চেষ্টা করে তাদের সবাইকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

তিনি বলেন, প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার সময় কিছু অসাধু চক্র প্রশ্নফাঁস করার নামে প্রতারণার বিভিন্ন প্যাকেজ নিয়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও অন্যান্য ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যমগুলোতে প্রচারণা চালায়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সাইবার পেট্রলিং করে।

তিনি বলেন, চক্রটি মূলত বিভিন্নভাবে ভুয়া মেসেঞ্জার, ফেসবুক একাউন্ট খুলে মেসেঞ্জারে শতভাগ নিশ্চয়তা সহকারে বিভিন্ন বোর্ডের সকল বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস করার বিজ্ঞাপন দিত। প্রশ্ন ফাঁসের এই চক্রের কাছ থেকে সাহায্য নেয়ার জন্য পরীক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকদের প্রাথমিকভাবে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সদস্য হতে হতো। এরপর প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা হাতিয়ে নিতো। তারা সার্কুলেশন করত যে, ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্ন বহনকালে দায়িত্বশীলদের একজন কৌশলে একাধিক প্রশ্ন সরিয়ে রেখে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেবে। সেই ছবি তারা বিভিন্নজনকে মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাফে ও জিমেইলে সেন্ড করে দেবে। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা নগদ, বিকাশ, রকেটের মাধ্যমে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতারক চক্রের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপের ফলোয়ার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭০০ জন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: প্রশ্নফাঁস


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ