Inqilab Logo

শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

ফুলবাড়ীতে করোনাকালে আত্মহননের অস্বাভাবিক প্রবণতা

১০ মাসে ২৯ জনের আত্মহননের চেষ্টা

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি | প্রকাশের সময় : ২৩ নভেম্বর, ২০২১, ৩:৩৭ পিএম

করোনাকালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার গ্রামাঞ্চল গুলোতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের মধ্যে এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তবে আত্মহত্যার প্রবণতায় বয়স্করা যে কম তা বলার সুযোগ নেই।

চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে ২২নভেম্বর পর্যন্ত গত ১০ মাস ২২দিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ২৯টি আত্মহত্যা প্রচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশেষ করে করোনাকালে ঋণের বোঝা,অর্থনৈতিক সংকট,পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য কলহের কারণে এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে থানায় অপমৃত্যুর মামলা সুত্রে পাওয়া তথ্যের বাইরেও আরো অনেক আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে যা মামলা না হওয়ার কারনে পাওয়া যায়নি।
ফুলবাড়ী থানার মামলা সুত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ১০ মাস ২২দিনে মোট ২৯জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। এদের মধ্যে ১৬ জন গলায় ফাঁসি দিয়ে এবং বিষপানে ৬ জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন,যার অধিকাংশই নারী ও তরুন বয়সের। এর মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে ২২জন,৪০ থেকে ৪৫ বছরের উর্ধ্বে ৮জন। এতে বয়স্কদের চেয়ে তরুণ ও নারীদের মধ্যে এই প্রবনতা বেশি লক্ষ করা গেছে।

পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, অতিরিক্ত উচ্চাকাংক্ষা, মাদকাসক্ত, প্রেমে ব্যর্থতা, ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়া, পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা, ইভটিজিং ও দুরারোগ্য ব্যাধিসহ ছোটখাটো এমন অনেক বিষয়ে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এর কারণ হিসেবে নির্যাতন,যৌতুক,সভ্রমহানি,আর্থিক অক্ষমতা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবক্ষয়কে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফুলবাড়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আশ্রাফ ইসলাম বলেন, গত দশ মাসে ফুলবাড়ী থানায় ২৯টি আত্মহত্যাজনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। এর প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে । তবে অনেক ক্ষেত্রেই এধরনের মৃত্যুর খবর মৃতের স্বজনরা পুলিশকে জানাতে চায় না । তিনি বলেন,আইনি জটিলতার ভয়,মর্গে মরদেহ কাটাছেঁড়ার বিড়ম্বনা এড়াতে অনেকে এই খবর পুলিশকে জানাতে চায় না। ফলে আত্মহত্যার অনেক তথ্যই রেকর্ড করাও সম্ভব হয় না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.নূর ই-আলম খুশরোজ আহম্মেদ বলেন,অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে,আমরা সেটাকে আত্মহত্যা বলতে পারিনা। কারণ কেউ কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র চলে যায়। যেসব রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় শুধুমাত্র তাদের তথ্যই পুলিশকে দেয়া হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এধরণের কেউ মারা গেলে,তাদের তথ্যসূত্রে পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে।

ফুলবাড়ী মাদিলা হাট কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ তৌহিদুল আলম জানান, বিষন্নতা ও চিন্তাগ্রস্থ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। নিজের ও অন্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার কারণে এদের কারো কারো মধ্যে দেখা দেয় প্রবল নিরাশা। এ অবস্থায় মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার প্রয়াস চালাতে গিয়ে সাধারণত আত্মহননকারীদের কীটনাশক, অতিমাত্রায় নেশাজাতীয় দ্রব্য বা অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন ও গলায় ফাঁস নেয়ার মতো পন্থাগুলো বেছে নিতে দেখা যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো: মশিউর রহমান বলেন,এধরণের রোগীদের মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসার পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে। তবে সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে এদের কারো কারো প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়।

এবিষয়ে ফুলবাড়ী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আসাদুজ্জামান বলেন,করোনাকালে এধরনের মৃত্যু বেশী লক্ষ্য করা গেছে। পারিবারিক অশান্তি,দারিদ্রতা,মানসিক বিকার গ্রস্থতা থেকে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধি ও এনজিও কর্মীরা কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরী করে এধরনের ব্যক্তিদের হতাশা দূরীকরণে ভূমিকা নিতে পারে। এছাড়াও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে জীবনের মূল্যবোধ নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে পারলে অনেকটাই এই প্রবনতা কমে আনা সম্ভব। তিনি বলেন পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় এধরণের সামাজিক বিষয়ে উঠান বৈঠক করে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে তবে এতে মানুষের অংশগ্রহনের আগ্রহ খুব কম।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আত্মহত্যা


আরও
আরও পড়ুন