Inqilab Logo

বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৬ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের করণীয়

মাওলানা মুহাম্মদ জহুরুল আনোয়ার | প্রকাশের সময় : ২৫ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৬ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর

ইসলামের কিছু কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় গুরুদায়িত্ব পালনের ধারণা করার সুযোগ নেই। যেমন কেউ কেউ ঈমান ও ‘আমলের মেহনতকে ইসলাম প্রতিষ্ঠা মনে করে থাকেন। কেউ শুধু মাদ্রাসা মসজিদ নির্মাণে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট অবদান মনে করেন। কেউ কেউ শুধু ওয়ায-বক্তৃতাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন হয়ে গেছে ধারণা পোষণ করেন। তবে এ কাজগুলো কোন না কোন পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সহায়ক কাজ, এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই বলে চূড়ান্তভাবে ইসলাম প্রতষ্ঠার রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখা হচ্ছে মনে করা সমীচিন নয়। তাই যারা ঈমান ও ‘আমলের মেহনতকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র কাজ মনে করেন, তারা মূলতঃ রাসূলুল্লাহ্ (দ.)-এর ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপকতা সম্পর্কে উপলদ্ধি করতে সমর্থ হননি।

এ অবস্থায় কিছু মুসলমান ‘ইসলাম’কে মানুষের পরিপূর্ণ ও একমাত্র জীবন বিধান বুঝে এবং মেনে নিয়ে তা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইসলামের সমাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি সর্বোপরী ইসলামী রাজনীতি চর্চা করে আসছেন। দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু মুসলমান কেবল ঈমান ‘আমল ও ধার্মিকতাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মনে করে তারা ইসলামী রাজনীতিবিমুখ। কিছু মুসলমানের ইসলামী রাজনীতির গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা সম্পর্কে জানা থাকলেও তারা ইসলামী রাজনীতির প্রতিপক্ষদের বিরাগভাজনের আশঙ্কায় নিজেদের শান্ত-শিষ্ট, নম্র-ভদ্র ও নিরপেক্ষ প্রমাণের জন্য চুপ থাকেন। কেউ কেউ পরোক্ষভাবে সমর্থন করলেও প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থাকাকে ভদ্রতা মনে করেন। অনেকে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা বশতঃ মুসলিমবিদ্বেষ ও ইসলামী রাজনীতির বিরুদ্ধবাদিতায় ঐকমত্য পোষণ করে ইসলামী রাজনীতির বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত। কেউ কেউ ইসলামী রাজনীতির মাধ্যমে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হলে তাদের অন্যায় ও অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদের মালিকানা হারানোর আশঙ্কা বা এর সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হওয়ার ভয়েও ইসলামী রাজনীতির বিরোধিতা করে আসছে। অথচ প্রকৃত মুসলমানকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বিরোধী ভূমিকা রাখা এবং নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। যে কোন অবস্থা-পরিস্থিতি ও যুক্তিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতাকে যারা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ মনে করতে চান না, তাদের উপলব্ধি করা উচিত, সংখ্যাগরিষ্ট যে মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী শাসনব্যবস্থা নেই, সেখানে সালাত আদায়, যাকাত প্রদান ও হজ পালনের সুযোগকে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ রয়েছে ধারণা করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ইসলামী শাসন ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের বিচার কার্য পরিচালনায় কুরআনের অনুশাসন মানা হয় না। শিক্ষানীতিতে ইসলামের আবহ নেই। ব্যবসায়নীতিতে ইসলামের কল্যাণকর নীতিমালার অনুসরণ নেই। যেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত থাকে না সেখানে কোনক্রমেই পরিপূর্ণভাবে ইসলাম পালনের সুযোগ থাকে না।

রাজনৈতিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকে মুসলামানদেরকে দূরে রাখার জন্য ঝবপঁষধৎরংরস বা ‘ধর্মনিরপেক্ষবাদ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ মতবাদকে প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতা বলে প্রচার করা হয়। ফলে অনেক সম্ভ্রান্ত এবং শিক্ষিতজনও ইসলামকে কেবল ধর্ম মনে করে থাকে। তারা নামায পড়েন, রোযা রাখেন, সামর্থ সাপেক্ষে যাকাত প্রদান এবং হজ পালন করেও ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় বিধিবিধান বিবর্জিত রাজনীতিতে ভূমিকা রেখে আসছেন। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা কার্যতঃ ধর্মহীনতারই শামিল। একইভাবে জাতীয়তাবাদও বিশ^ব্যাপৃত ইসলামের সাথে অসামঞ্জস্য। সমাজতন্ত্রসহ সকল মতবাদ মূলতঃ ইসলামের শাশ^ত আদর্শ ও বিধি-বিধানকে আড়াল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এসব মতবাদ মানবগড়া। আর ‘ইসলাম’ হল আল্লাহ্ প্রদত্ত শাশ^তবিধান। ইসলামের সামগ্রিক ও সার্বজনীনতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হলে এতে অন্য সব ধর্মাবলম্বীদেরও কল্যাণ থাকবে। সমাজবাসীকে এর নিগূঢ় তত্ত্ব ও তথ্য বুঝাবার দায়িত্ব যাদের, সেই ইসলামী শিক্ষা দীক্ষা অর্জনকারী অনেক ‘উলামা-মাশায়িখ নিজেও ইসলামী রাজনীতি করেন না। কেউ কেউ মনে করেন আউলিয়ায়ে কেরাম রাজনীতি করেন না। অথচ প্রকৃত অলী-বুযর্গরা ইসলামী শাসন, অনুশাসন ও বিধিবিধানে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করে থাকেন। তাই তাঁরা রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করেন মনোভাব পোষণ করা, তা তাঁদের বিরুদ্ধে অপবাদের শামিল। অনেকে ইসলামী রাজনীতিবিমুখ হলেও পার্থিব সুযোগ-সুবিধা অর্জনের জন্য ইসলামী রাজনীতির প্রতিপক্ষকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সমর্থন করেন এবং এতে ভূমিকা রাখেন। এ সুযোগে ইসলামবিদ্বেষী নীতিনির্ধারকরা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ^ব্যাপী তথ্য সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যারা ঝুঁকি নিয়ে ইসলামী রাজনীতির সাথে জড়িত, তাদেরকে কোণঠাসা ও প্রশ্নবিদ্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে নানা পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। তাদের বলা হয় মৌলবাদী, রক্ষণশীল, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, ইসলামী জঙ্গী ইত্যাদি। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা ইসলামের জিহাদী প্রেক্ষাপটকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন ও প্রয়োগের জন্য কিছু অজ্ঞ ও অদূরদর্শী মুসলমানকে অপ্রাসঙ্গিক ও বিকৃতভাবে চর্চায় নিয়োজিত করে তাদের দ্বারা ইসলামী চেতনা ও রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

এ অবস্থায় সুস্থ পন্থায় ইসলামী রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ্ (দ.)-এর যুগে মসজিদে নববী শরীফে বসবাসকারী আস্হাবে সুফ্ফাহ্র ন্যায় তাঁদের অনুসরণে বর্তমান মুসলিম সূফী সাধক ও সাজ্জাদানশীন ‘উলামা-মাশায়িখকে ইসলামী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ভূমিকা রাখতে হবে এবং মুরীদ ও অনুসারীদেরকে ত্বরীক্বতের ওয়াযীফাহ্-সবক্ব আদায়ের পাশাপাশি ইসলামী রাজনীতিতে উদ্ধুদ্ব করতে হবে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মু’মিনরা তোমরা ইসলামের মধ্যে পূর্ণভাবে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু’। সূরাহ্ বাক্বারাহ্, আয়াত ২০৮

সুতরাং মুলমানদেরকে কুরআন মাজীদ ও ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে। জীবন ও কর্মের সব বিষয়ে শয়তানের অনুসরণ ও ইসলামের নীতিবিরুদ্ধ পার্থিব চিন্তা চেতনা ত্যাগ করতে হবে। ইহ ও পরকালের সৌন্দর্যময় পরিবেশ সৃষ্টি এবং আল্লাহ্র কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য মুসলমানদের কুরআন মাজীদের কিছু মানা ও কিছু না মানার সুযোগ নেই। এতে ইসলামকে যথার্থভাবে মানা হয় না। তাই ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে মানতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এর বিধি-বিধান চালুকরণে সকল মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহ্র রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে (ঐক্যবদ্ধ হয়ে) ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। সূরাহ্ আল-ই ‘ইমরান, আয়াত ১০৩

আল্লাহ্ তা‘আলা তার সর্বশেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (দ.)-কে প্রেরণের মধ্য দিয়ে তার দীনের পূর্ণতা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন রূপে গ্রহণ করলাম। তবে কেউ পাপ করার প্রবণতা ব্যতীত ক্ষুধার তীব্রতায় (নিষিদ্ধ বস্তু খেতে) বাধ্য হলে আল্লাহ্ নিশ্চয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরাহ্ আল্ মায়িদাহ্–––, আয়াত ৩

ইসলামের শাশ^ত আদর্শ প্রতিফলনে ক্বিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী-রাসূল (আ.)-এর আবির্ভাব হবে না। তাই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নে ইসলামের সঠিক ঈমান-‘আক্বীদাহ্ পোষণ করে ‘ইবাদত-বন্দেগীর পাশাপশি পার্থিব মানবগড়া রাজনীতির পরিবর্তে ইসলামী রাজনীতিকে অর্থবহ করে তুলতে সকল মুসলমানকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : ইসলামী সাহিত্যিক ও মানবাধিকার গবেষক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

২৬ নভেম্বর, ২০২১

আরও
আরও পড়ুন