Inqilab Logo

শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের যুদ্ধ

২৭ বছরে মারা গেছে ৫৮ জন মানুষ : আহত ৫ শতাধিক ৩১টি হাতির মৃত্যু

এস. কে. সাত্তার, ঝিনাইগাতী (শেরপুর) থেকে | প্রকাশের সময় : ২৯ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০৩ এএম

দীর্ঘ ২৭ বছরেও সীমান্তবর্তী শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্য হাতি-মানুষের যুদ্ধের অবসান হয়নি। এ পর্যন্ত হাতির পায়ে পৃষ্ট হয়ে ৫৮ জন মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে ৫ শতাধিক। ৩১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
এ যুদ্ধ চলে আসছে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত। আর কতকাল চলবে যুদ্ধ আল্লাহই ভাল জানেন বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন পাহাড়ি লোকজন।
জানা যায়, দীর্ঘ ২৭ বছরে এক শ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ বন কর্মকর্তা-কর্মচারি ও বনখেকোদের যোগশাজসে বিস্তীর্ণ গারো পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে বসতি, বেদখল হয়ে গেছে বন বিভাগের বিপুল পরিমাণ বন ভূমি। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে গারো পাহাড়ে। বন্যহাতির বিচরণক্ষেত্র বা অভয়ারণ্য না থাকায় ভারত থেকে প্রতি বছর নেমে আসা বন্যহাতির পাল খাবারের সন্ধাণে পাহাড়ঘেঁষা লোকালয়ে নেমে এসে সাবাড় করছে কৃষকের কোটি কোটি টাকার আবাদি ফসলসহ গাছপালা ও ধ্বংস করছে বসতবাড়ি। এতে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে হাতি-মানুষের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে দীর্ঘ ২৭ বছরে ভারতীয় বণ্য হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে স্থানীয় মুসলমান, গারো, কোঁচ, হাজংসহ অন্তত ৫৮ জন। আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক নিড়িহ মানুষ। অন্যদিকে মানুষের আক্রমণ ও নানা ফাঁদে পড়ে ৩১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। গত ১০ দিনের ব্যবধানে শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী সীমান্তে ২টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
হুমকির সম্মুখীন পাহাড়ের জীববৈচিত্র ও প্রাণীকুল। এই ভয়াবহ অবস্থার দীর্ঘদিন পরও হাতি-মানুষের যুদ্ধ নিরসনে গ্রহণ করা হয়নি কোন উদ্যোগ। গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের যুদ্ধ নিরসন এবং বন্যহাতি হত্যার প্রতিবাদ, হাতির জন্য অভয়াশ্রম এবং বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সুরক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছে নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শেরপুরের গারো পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে মানুষ মারা গেছেন ৫৮জন। অন্যদিকে মানুষের হাতে ৩১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বেশির ভাগ মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদে, গুলিবিদ্ধ হয়ে বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। বক্তারা গারো পাহাড়ে ১০ দিনের ব্যবধানে দুইটি হাতি হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বনে অভয়ারণ্য গড়ে তুলে হাতি-মানুষের যুদ্ধ নিরসনের দাবি জানান। কিন্তু হাতি বাঁচাতে উদ্যোগ নেয়া হলেও মানুষ বাঁচাতে নেয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ, এমন আক্ষেপ করেন গারো পাহাড়ের গারো, কোঁচ, হাজং সম্প্রদায়ের লোকজন। তারা বলেন, গারো পাহাড়ে এমনি এমনিতেই গড়ে উঠেনি জনবসতি। বন বিভাগের এক শ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারি ও অবৈধ দখলকারীদের যোগশাজসে নগতনারায়ণের বিনিময়েই গড়ে উঠেছে জনবসতি।
জানা যায়, ভারতের সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ীর প্রায় ৩০/৩৫টি গ্রাম চারপাশ গারো পাহাড় ঘেরা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও প্রায় এক/দেড় মাস ধরে ভারত থেকে নেমে আসা শতাধিক বন্যহাতি কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ি ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত চষে বেড়াচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ আমন ধান খেতের ফসল খেয়ে ও পায়ে পিষে ধ্বংস করেছে। বন্য হাতির কবল থেকে ফসল ও জানমাল রক্ষার্থে পাহাড়ি জনপদের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এবং অসহায় জীবনযাপন করছে। বন্ধ হচ্ছে না হাতির তান্ডব। কথাগুলো কান্না জড়িত কন্ঠে বলেছেন পাহাড়ি এলাকার জনগণ।
শেরপুরের সহকারী বন সংরক্ষক মো. আবু ইউসুফ জানান, হাতি নিরীহ প্রাণী। চেষ্টা করছি যাতে হাতির কোন ক্ষতি না হয়। হাতি মেরে ফেললে কোন ছাড় দেব না। তবে মানুষের জানমালেরও যেন কোন ক্ষতি না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। কৃষি অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ব্যাপারটি দীর্ঘ দিনের। সুরাহা হওয়া দরকার। নির্বাহী অফিসার ফারুক আল মাসুদ জানান, দীর্ঘ দিনের এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক মো. মোমিনুর রশীদ জানান, সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। বন্যহাতির হামলায় নিহত, আহত ও ঘরবাড়িসহ ফসল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান, পাশাপাশি পাহাড়ে হাতিসহ প্রাণবৈচিত্র রক্ষায় চেষ্টা করছি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন