Inqilab Logo

শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮, ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

মহাসড়কে তিন চাকার যান

তিন চাকার চার ধরনের যানবাহন সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে

একলাছ হক | প্রকাশের সময় : ৩০ নভেম্বর, ২০২১, ১২:০২ এএম

মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন চাকার চার ধরনের যানবাহন। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছেনা এসব নিষিদ্ধ যানবাহনের দৌরাত্ম্য। নসিমন, করিমন, আলমসাধু, ভটভটি, ইজিবাইক ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। হাইওয়ে সড়ক থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও গ্রামীণ সড়কেও রয়েছে এসব গাড়ির আধিপত্ত্ব। নছিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটির মতো যানবাহন স্থানীয়ভাবে তৈরি করা যানবাহন চলাচলের কারণে দিন দিন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। পঙ্গু হয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।

মহাসড়কে থ্রি হুইল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যানসহ অযান্ত্রিকযান চলাচল করায় মহাসড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়। কোন ধরনের নিবন্ধন ছাড়াই সড়ক-মহাসড়কে রাজত্ব করছে এসব নিষিদ্ধ যানবাহন। এসব যানবাহন নিষিদ্ধ থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে প্রতিনিয়তই চলাচল করছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপক হারে বেড়েছে এসব যানবাহনের ব্যবহার। স্থানীয় নির্বাচনে সরকার দলীয় প্রার্থীর প্রচারণাও এসব যানবাহনকে দেখা যায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহাসড়ক।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এখনো পর্যন্ত নছিমন, করিমন, আলমসাধু, ভটভটি, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন দেয়নি। এগুলোর চলাচলের ব্যাপারেও বিআরটিএরও কোনো অনুমোদন নেই। এসব বাহন বন্ধে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এসব যানবাহনে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেশি হওয়ার প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কে এসব যানবাহনসহ তিন চাকার পরিবহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত নছিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটির মতো দেশে তৈরি যানবাহন। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বা রিকশারও নেই অনুমোদন। এসব যানবাহনের কারিগরি মানোন্নয়নের শর্তে নির্দিষ্ট সংখ্যায় ও এলাকাভেদে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সিংহভাগই ছোট ছোট মোটরযানের যাত্রী। সার্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের যানবাহন মহাসড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত এসব যানকে কারিগরিভাবে ত্রুটিমুক্ত করে অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণে নির্মাণ করা হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন এবং মহাসড়ক বিভাগ থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় যানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে। তবে সড়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যানবাহন নিবন্ধন ও চলাচলের অনুমোদন দেয়া হলে সড়কে প্রাণহানি বাড়বে। থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় যানের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা-২০২১-এর খসড়ায় নিষিদ্ধ যানবাহনের বৈধতা দেয়ার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খসড়া নীতিমালার ওপর অংশীজনদের মতামত নেয়া হবে। এজন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে খসড়া নীতিমালা আপলোড করা হয়েছে।

গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমরা ২২টি জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু এনফোর্সমেন্টের দুর্বলতার কারণে এসব যানবাহন এখন জাতীয় মহাসড়কে চলাচল করছে। সড়কে দুর্ঘটনার হার কমলেও এসব যানবাহনের কারণে মৃত্যুহার বেশি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, অনুমোদিত মোটরযানের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অপ্রচলিত ঝুঁকিপূর্ণ থ্রি-হুইলারসহ ছোট আকারের সমজাতীয় যানবাহন ব্যাপকহারে, অপরিকল্পিতভাবে সড়ক পরিবহন সেক্টরে যুক্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ২০১৫ সাল থেকে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও সকল শ্রেণির অযান্ত্রিক বাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিআরটিএ-তে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধিত ছিল ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯০টি মোটরযান। তার মধ্যে ভাড়ায় চালিত বাস ৪৯ হাজার ১৩টি ও মিনিবাস ২৭ হাজার ৪৩৯টি। অপরদিকে, অটোরিকশা ও অটোটেম্পো ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৯টি, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

পাশাপাশি সারাদেশে নিবন্ধনহীন বহু অননুমোদিত থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ইত্যাদি ছোট যান চলাচল করছে। ছোট আকারের এসব অনিবন্ধিত ও অননুমোদিত যানবাহন কারিগরিভাবে সড়ক নিরাপত্তার জন্য উপযোগী নয়। এসব যানবাহনের নিরাপত্তা ইউনিট বিশেষ করে ব্রেক, বিয়ারিং সাসপেনশন মানসম্মত নয়। তাছাড়া ভারসাম্যহীন এ ধরনের যানবাহনের স্থায়ীত্বও কম। স্বল্প নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসম্পন্ন এসব ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে প্রায়শই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।

খসড়া নীতিমালার আরও বলা হয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ছাড়া অন্যান্য নির্দিষ্ট এলাকা/ রুটে রুট পারমিট নেয়া সাপেক্ষে অটোরিকশা, অটোটেম্পো চলাচল করতে পারবে। সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় শহরের ভেতর অটোরিকশা ও শহরের বাইরে এবং উপজেলার নির্ধারিত রুটে অটোরিকশা ও অটো টেম্পো চলাচলের রুট পারমিট দেয়া যাবে। আঞ্চলিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) নির্ধারিত সিলিং অনুসারে বিআরটিএ অটোরিকশা অটোটেম্পো নিবন্ধন দিতে পারবে। যাত্রী ও পরিবহন কমিটি সিলিং নির্ধারণ করবে। এ সিলিং অনুযায়ী, অটোরিকশা ও অটো টেম্পো বিক্রি করতে হবে। ইজিবাইক ও পাখি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় রুটে রুট পারমিট নিয়ে চলাচল করতে পারবে।

খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, বিআরটিএ-র অনুমোদনক্রমে সিলিং অনুযায়ী ইজিবাইক, পাখি ইত্যাদি প্রস্তুত ও বিপণন করতে হবে এবং বিআরটিএকে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বার্ষিকভিত্তিতে সরকারকে অবহিত করতে হবে। রুট পারমিট পাওয়া ইজিবাইক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করবে। ইজিবাইক বা এ জাতীয় যানে অবশ্যই মান সম্পন্ন ব্যাটারি ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগ অনুমোদিত ব্যাটারি চার্জিং নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। রুট পারমিটে উল্লেখিত রুটে স্টেইজ ক্যারিজ বা কন্ট্রাক্ট ক্যারিজ হিসেবে ইজিবাইক চলাচল করতে পারবে।

খসড়া নীতিমালায় নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ইত্যাদি মোটরযান ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্থানীয় রুটে রুট পারমিট গ্রহণ সাপেক্ষে নসিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ও এ জাতীয় বাহন চলাচল করতে পারবে। তবে উক্ত রুটের কোনো অংশ মহাসড়ক বা আঞ্চলিক মহাসড়কের অংশ হতে পারবে না। উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির মতামতের ভিত্তিতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি রুট নির্ধারণপূর্বক সে অনুযায়ী রুট পারমিট দেবে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) নির্ধারিত সিলিং অনুযায়ী বিআরটিএ নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ইত্যাদি বাহনের নিবন্ধন দেবে। এ ধরনের বাহনের সর্বজন গ্রাহ্য এবং যাত্রী সুরক্ষার ব্যবস্থা সম্বলিত অনুমোদিত ডিজাইন/ ড্রইং নির্ধারণ করতে হবে-যেকোনো সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ সাপেক্ষে বিআরটিএ কর্তৃক টাইপ অনুমোদিত হতে হবে। রুট পারমিট পাওয়া নসিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ইত্যাদি বাহন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করবে।

নসিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু ইত্যাদি বাহন রুট পারমিটে উল্লেখিত রুটে স্টেইজ ক্যারিজ বা কন্ট্রাক্ট ক্যারিজ হিসেবে চলাচল করতে পারবে। নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন সনদ, হালনাগাদ রুট পারমিট, ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন প্রয়োজন হবে। এ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় যানবাহন শুধু রুট পারমিটে উল্লেখিত এলাকায় চলাচল করতে পারবে। মহাসড়কে অপ্রচলিত ঝুঁকিপূর্ণ ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং এর কারিগরি মান উন্নয়নের মাধ্যমে স্থান বিশেষে চলাচলের বিষয়ে সুপারিশমালা প্রণয়নে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ইউছুব আলী মোল্লাকে আহ্বায়ক করে ২০১৯ সালের ২৩ জুন ১২ সদস্যের কমিটি করা হয়। গত ১০ জানুয়ারি ওই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বিআরটিএ এর চেয়ারম্যানকে প্রধান করে খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয় কমিটির সুপারিশমালার ভিত্তিতে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেশি ঘটছে অননুমোদিত যানবাহনে। এজন্য এসব বাহনের ডিজাইনের উন্নয়ন করতে হবে। তবে এসব যানবাহন গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নছিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটির মতো যানবাহন যানবাহন চলাচল করার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিষিদ্ধ যানবাহনকে বৈধতা দিতে হলে আগে সেগুলো নিরাপদ ও উপযুক্ত করে তুলতে হবে। তাতে সড়কে প্রাণহানি বাড়ার আশঙ্কা থাকবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: তিন চাকার চার ধরনের যানবাহন

৩০ নভেম্বর, ২০২১
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ